প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামের শামুকখোলের দলের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
সকালের আলো ফুটতেই ডানা মেলে উড়ে যায় শত শত শামুকখোল পাখি। কেউ বেরিয়ে পড়ে খাবারের সন্ধানে, আবার কেউ ফিরে আসে বাসায়। দীঘির চারপাশের গাছগুলোতে চলে তাদের অবিরাম আনাগোনা। কোথাও মা পাখি ছানাদের খাবার খাওয়াচ্ছে, কোথাও ডালে বসে ডানা ঝাপটাচ্ছে অন্যরা। পাখির ডাক আর কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
এমন দৃশ্য এখন নিয়মিত দেখা যায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামে। শত শত শামুকখোলসহ নানা প্রজাতির পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হয়ে ওঠায় স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে ‘পাখির গ্রাম’ নামে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সেখানে পাখি দেখতে আসছেন।
পাখিদের এই আবাসস্থল সংরক্ষণে উলিপুরকে অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

শামুকখোলের পাশাপাশি গ্রামটিতে দেখা মেলে ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির, কোড়া, লালশির, বড় সরালি ও ছোট সরালিসহ নানা প্রজাতির পাখির।
তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে চলনবিলের পূর্ব পাশে উলিপুর গ্রামের অবস্থান। স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের একটি দীঘিকে কেন্দ্র করে গ্রামটির প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠেছে।
দীঘির চারপাশে থাকা বটগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির উঁচু গাছে গত কয়েক বছর ধরে বাসা বাঁধছে শামুকখোল পাখি। উপযুক্ত পরিবেশ ও পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ায় সেখানে তাদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
শুধু শামুকখোল নয়, উলিপুরে দেখা যায় ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির, কোড়া, লালশির, বড় সরালি ও ছোট সরালিসহ নানা প্রজাতির পাখি।
এ ছাড়া গ্রামের মাঠ ও জলাশয়ের আশপাশে ডাহুক, গাঙচিল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, চখাচখি, কাদাখোঁচা, মাছরাঙা ও সারসের বিচরণ রয়েছে। পরিচিত এসব প্রজাতির বাইরেও নানা ধরনের পাখির উপস্থিতি দেখা যায়।
দীঘিপাড়ের গাছগুলোতে এখন অসংখ্য শামুকখোলের বাসা। কোনো পাখি কচি পাতায় ঠোকর দিচ্ছে, কোনোটি ছানাদের আগলে রাখছে। আবার কোনোটি খাবার নিয়ে বাসায় ফিরছে কিংবা এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে বেড়াচ্ছে।
গাছের নিচে দাঁড়ালেই মাথার ওপর দিয়ে একের পর এক পাখি উড়ে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে।
কয়েক বছরে বেড়েছে পাখির সংখ্যা
উলিপুরের বাসিন্দা তফিজ উদ্দিন জানান, তিন থেকে চার বছর আগে অল্পসংখ্যক শামুকখোল পাখি প্রথম এখানে এসে বাসা বাঁধতে শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে নিয়মিত ডিম পাড়া ও বাচ্চা জন্মানোর ফলে পাখির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে।
তার ভাষায়, ‘তিন-চার বছর আগে অল্প কিছু শামুকখোল এখানে এসে বাসা বাঁধে। প্রতি বছর ডিম ফুটে বাচ্চা জন্ম নেওয়ায় এখন পাখির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ পাখি দেখতে আসেন।’

পাখিদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
গ্রামের যুবক রাঙ্গা সরকার জানান, এলাকার মানুষ সাধারণত পাখিদের বিরক্ত করেন না কিংবা শিকার করেন না। পাখিদের নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও গ্রামবাসীকে সতর্ক করা হয়েছে।
একই গ্রামের বাসিন্দা সজীব সরকারের ভাষ্য, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশের গাছেই পাখিদের বিচরণ রয়েছে। দিন-রাত তাদের চলাফেরা ও কলকাকলি দেখতে ভালো লাগে।
তিনি জানান, দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা পাখিদের ছবি তোলেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। পাখিদের আবাসস্থল আরও নিরাপদ করতে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
পাখিদের প্রতি স্থানীয় মানুষের ভালোবাসার আরেকটি উদাহরণ ভূমি অফিসের কর্মচারী আবুল কালাম।
তিনি জানান, প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার পথে পাখিদের দেখতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় কাটান।
তার মতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে পাখিদের প্রতি সবার যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন।
উলিপুরের পাখির সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদেরও।
পাখি দেখতে আসা ফরহাদ হোসেন জানান, একসঙ্গে এত শামুকখোল আগে কখনো দেখেননি তিনি। পাখিদের অবাধ বিচরণ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। ছবি ও ভিডিও ধারণ করেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার ইচ্ছা রয়েছে তার।
সংরক্ষিত প্রজাতির শামুকখোল, আবাসস্থল রক্ষার তাগিদ
পাখি সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন দ্য বার্ড সেফটি হাউসের চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস জানান, উলিপুরে বসবাস করা পাখিগুলো এশীয় শামুকখোল প্রজাতির। এই প্রজাতি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণীর তালিকাভুক্ত।
তার মতে, পর্যাপ্ত খাবার, নিরাপদ পরিবেশ ও উপযুক্ত গাছপালা থাকায় পাখিগুলো সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের পাশাপাশি বংশবিস্তার করছে।
বিশেষ করে দীঘির আশপাশের উঁচু গাছগুলো তাদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করছে।
এ কারণে পাখিদের আবাসস্থল অক্ষত রাখতে এসব গাছ কাটা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, শামুকখোল পাখির প্রধান খাবারের মধ্যে রয়েছে মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী।
বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই প্রজাতির পাখির দেখা পাওয়া যায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত আবহাওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হলে শামুকখোল সাধারণত একই এলাকায় অবস্থান করে।
চলনবিল অঞ্চলে পর্যাপ্ত জলজপ্রাণী ও খাবারের উৎস থাকায় উলিপুর পাখিগুলোর জন্য উপযোগী আবাসস্থল হয়ে উঠেছে।
ফলে সেখানে শুধু পাখির উপস্থিতিই বাড়ছে না, নিয়মিত বংশবিস্তারও হচ্ছে।
পাখির অভয়ারণ্য গড়ার পরিকল্পনা প্রশাসনের
শত শত শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতি উলিপুরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থলে পরিণত করেছে।
এই পরিবেশ সংরক্ষণে জায়গাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে উপজেলা প্রশাসন।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানিয়েছেন, উলিপুরে বিপুলসংখ্যক পাখির উপস্থিতি স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
তিনি বলেন, ‘জায়গাটিকে কীভাবে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।’
একই সঙ্গে পাখি শিকার ও নিধন প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কবে নাগাদ এটি বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি জানানো হয়নি।
উলিপুরের বাসিন্দারা আশা করছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই গ্রামটি আরও বেশি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠবে।

শত শত শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতি
