Logo
Logo
×
মনতে ভার্দে: ১৪,৫০০ বছরের দাবিতেই সায় বিজ্ঞানীদের

ছবি: বাংলাবাজার গ্রাফিক্স

লাইফস্কেপ ।  সভ্যতা-সংস্কৃতি

মনতে ভার্দে: ১৪,৫০০ বছরের দাবিতেই সায় বিজ্ঞানীদের

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৬:০৬ পিএম

দক্ষিণ চিলির প্রত্নস্থল মনতে ভার্দেতে মানুষের বসতির বয়স নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা স্থানটির বয়স কম দাবি করলেও দুটি নতুন বিশ্লেষণ পুরোনো ১৪ হাজার ৫০০ বছরের হিসাবের পক্ষেই যুক্তি দিয়েছে।

দক্ষিণ চিলির ঐতিহাসিক প্রত্নস্থল মনতে ভার্দেতে মানুষ কবে প্রথম বসতি গড়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে প্রত্নস্থলটিকে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ বছর পুরোনো বলে ধরা হলেও চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দাবি করা হয়, এর বয়স আসলে অনেক কম—৪ হাজার ২০০ থেকে ৮ হাজার ২০০ বছরের মধ্যে।

এবার বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘প্যালিওআমেরিকা’-তে প্রকাশিত দুটি পৃথক বিশ্লেষণে দুই গবেষক দল সেই নতুন দাবির সমালোচনা করেছে। তাদের বক্তব্য, মনতে ভার্দের বয়স কমিয়ে দেখানো গবেষণায় মৌলিক ও গুরুতর কিছু ত্রুটি রয়েছে।

১৯৭০-এর দশকে আবিষ্কার

মনতে ভার্দে দক্ষিণ চিলির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে প্রায় ৫৮ কিলোমিটার দূরের একটি নদী উপত্যকায় অবস্থিত।

প্রত্নস্থলটি আবিষ্কৃত হয় ১৯৭০-এর দশকে। পরে ১৯৯৭ সালে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে ঘোষণা করা হয়, প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ বছর আগে সেখানে মানুষের বসবাস ছিল।

এই আবিষ্কার আমেরিকা মহাদেশে মানুষের প্রথম আগমনের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল বিজ্ঞানীদের।

কারণ, মনতে ভার্দের বয়স সত্যিই ১৪ হাজার ৫০০ বছর হলে এটি উত্তর আমেরিকার বরফঢাকা অঞ্চলগুলোর দক্ষিণে পাওয়া অন্যান্য প্রাচীন বসতির তুলনায় অন্তত দেড় হাজার বছর পুরোনো।

নতুন গবেষণায় বয়স কমানোর দাবি

চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত গবেষণায় মনতে ভার্দের বয়স ৪ হাজার ২০০ থেকে ৮ হাজার ২০০ বছরের মধ্যে বলে দাবি করা হয়।

এই গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিংয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক টড সুরোভেল এখনো নিজের গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফলের ওপর আস্থা রাখছেন।

তার বক্তব্য, তাদের গবেষণার পদ্ধতি ও উপাত্ত এখন ব্যাপক পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবির ক্ষেত্রে এ ধরনের যাচাই স্বাভাবিক।

সুরোভেলের মতে, তাদের পদ্ধতি, তথ্য বা যুক্তিতে বড় ধরনের কোনো ভুল থাকলে এই পর্যালোচনাতেই তা বেরিয়ে আসার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো সমালোচনা তিনি দেখেননি, যা তাদের মূল সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করে।

পুরোনো বয়সের পক্ষেও জোরালো অবস্থান

অন্যদিকে, ১৯৭০-এর দশক থেকে মনতে ভার্দে নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানী টম ডিলেহে নতুন গবেষণার সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ।

তার বক্তব্য, মনতে ভার্দে সম্পর্কে আগে যে ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল, সেটি ভুল—এমন প্রমাণ নতুন গবেষকেরা দেখাতে পারেননি।

‘প্যালিওআমেরিকা’-তে প্রকাশিত নতুন দুটি বিশ্লেষণেও একই ধরনের প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, মনতে ভার্দেকে অপেক্ষাকৃত নতুন প্রত্নস্থল হিসেবে দেখানো গবেষণায় বেশ কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে।

আমেরিকায় মানুষের আগমনের ইতিহাসে কেন গুরুত্বপূর্ণ

মনতে ভার্দের বয়স নিয়ে বিতর্কের গুরুত্ব শুধু একটি প্রত্নস্থলের তারিখ নির্ধারণে সীমিত নয়।

প্রত্নস্থলটি ১৪ হাজার ৫০০ বছর পুরোনো হলে তা উত্তর আমেরিকার ‘ক্লোভিস সংস্কৃতি’র সঙ্গে সম্পর্কিত বসতিগুলোর চেয়ে অনেক আগের।

‘ক্লোভিস সংস্কৃতি’ নামটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর একটি এলাকার নাম থেকে। দীর্ঘদিন ধরে এই সংস্কৃতির মানুষদের আমেরিকার প্রাচীনতম মানবগোষ্ঠীগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

কিন্তু মনতে ভার্দে ক্লোভিস অঞ্চলের তুলনায় বহু হাজার মাইল দক্ষিণে এবং আরও পুরোনো হওয়ায় ধারণা তৈরি হয়, ইউরেশিয়া থেকে মানুষ ক্লোভিস সংস্কৃতিরও আগে আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করেছিল।

সুরোভেলের নতুন বয়স নির্ধারণ সঠিক হলে এই ইতিহাসে মনতে ভার্দের গুরুত্ব অনেকটাই কমে যাবে।

কাঠ, উদ্ভিদ ও প্রাচীন জীবনের নানা চিহ্ন

মনতে ভার্দের বিশেষত্ব শুধু এর সম্ভাব্য বয়স নয়, সেখানে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানও।

টম ডিলেহের মতে, স্থানটি অস্বাভাবিকভাবে ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত থাকায় এমন অনেক জৈব উপাদান পাওয়া গেছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে সচরাচর টিকে থাকে না।

এর মধ্যে রয়েছে খোদাই করা কাঠ, কাঠামোর অবশিষ্টাংশ, বিভিন্ন উদ্ভিদ, সামুদ্রিক শৈবাল ও অন্যান্য জৈব পদার্থ।

এসব উপাদান থেকে শেষ বরফযুগ বা লেট প্লায়োস্টোসিন যুগে দক্ষিণ চিলিতে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাপন, প্রযুক্তি ও পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

পায়ের ছাপ থেকে আলু পর্যন্ত

মনতে ভার্দে প্রত্নস্থলে অগ্নিকুণ্ডের পাশে প্রাচীন মানুষের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া পাওয়া গেছে আগুনের অবশিষ্টাংশ, কাঠের তৈরি হাতিয়ার ও খুঁটি, আলু, পশুর হাড় এবং মাংসের অবশিষ্টাংশ।

ডিলেহের মতে, এলাকাটি দীর্ঘদিন অক্সিজেনস্বল্প বা প্রায় বাতাসহীন স্তরের নিচে চাপা পড়ে থাকায় বিভিন্ন জৈব উপাদান নষ্ট হয়নি।

ফলে তখনকার মানুষের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে তুলনামূলক বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

প্রাপ্ত উপাদানগুলো থেকে বোঝা যায়, সেখানকার মানুষ খাবারের জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী—দুই ধরনের উৎসের ওপর নির্ভর করত। তারা প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে আন্দিজ পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় চলাচল করত বলেও গবেষকেরা মনে করেন।

আরও গবেষণার অপেক্ষা

মনতে ভার্দের বয়স ও ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে চলমান বিতর্ককে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন টড সুরোভেল।

তার মতে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গবেষকদের আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষাই শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর দিতে পারে।

অন্যদিকে পুরোনো গবেষণা দল মনে করছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া নতুন তথ্য ১৪ হাজার ৫০০ বছরের হিসাব বাতিল করার মতো শক্ত প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।

ফলে আমেরিকা মহাদেশে মানুষের প্রথম বসতি স্থাপনের ইতিহাসে মনতে ভার্দের অবস্থান নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে