প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ এএম
আইএমএফের ঋণে শর্ত থাকবে, আগের অবস্থান বদলে জানালেন অর্থমন্ত্রী
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬। ০৪:১২ পিএম
আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬। ১৬:১৮ পিএম
- শেয়ার
- Messenger
- Telegram
- Threads
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়ে আগের ঋণ কর্মসূচি বাতিল করেছিল বিএনপি সরকার। তবে নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনায় শর্ত থাকার বিষয়টি এবার স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচিতে শর্ত থাকবে এবং সেগুলো পূরণ করা হবে। কিছু বিষয়ে দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
এর মাত্র ১১ দিন আগে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, আইএমএফের শর্ত মেনে অর্থায়নের ওপর সরকার নির্ভর করতে চায় না। এমনকি সংস্থাটির আর কোনো শর্ত বাংলাদেশ মানবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও সংস্কার শর্ত নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
ঋণ কর্মসূচির আওতায় সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে, জানতে চাইলে আমির খসরু বলেন, ‘শর্ত তো থাকবে। শর্ত পূরণ হবে। আবার কিছু কিছু দুই পক্ষ থেকে আমরা সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। সেগুলো কোনো সমস্যা না।’
আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব অব্যাহত থাকবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘সো ফার আমাদের যে পার্টনারশিপ, শুধু আইএমএফ না, আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ সব মাল্টিল্যাটারাল বডির সাথে যে পার্টনারশিপ, আমরা সবাই একসাথে কাজ করব। পার্টনারশিপের মাধ্যমে কাজ করব এবং এটা ভালোভাবে এগিয়ে যাবে।’
ব্যাংকিং খাত ও কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাত নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত এবং কর-জিডিপি অনুপাতের বিষয়ে সংস্থাটি কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছে।
আমির খসরুর ভাষ্য অনুযায়ী, আইএমএফের অধিকাংশ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সরকার একমত। এরই মধ্যে বেশ কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলবে।
তিনি বলেন, ‘ওদের কিছু অবজারভেশন আছে কিছু কিছু বিষয়ে। তো সেই অবজারভেশনের ম্যাক্সিমামের সঙ্গে আমরা একমত। অনেকগুলো আছে ব্যাংকিংয়ের উপর, ট্যাক্স জিডিপির উপর আছে।’
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক বিষয়। শুধু আইএমএফ নয়, সরকারের নিজস্ব পর্যবেক্ষণও রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং অবশিষ্ট বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কারের শর্ত যুক্ত থাকে। এসবের মধ্যে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো এবং কর অব্যাহতির সুযোগ পুনর্বিবেচনার মতো বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া নতুন কর আরোপ এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়েও সংস্থাটির প্রশ্ন ছিল।
এসব শর্তের কিছু বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি থাকায় আগের ঋণ কর্মসূচি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
১১ দিন আগেই আইএমএফের শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছিলেন অর্থমন্ত্রী
গত ৪ অক্টোবর ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন নিয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আইএমএফ টাকা দেবে, বিশ্ব ব্যাংক টাকা দেবে—এটা ভুলে যান। আমি আইএমএফের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিয়েছি, আপনারা দেখেছেন। তাদের শর্ত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
ওই অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আরও জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ আইএমএফের আর কোনো শর্ত মানবে না।
আইএমএফের ঋণ চুক্তি বাতিল করে সরকার অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।
তার বক্তব্য ছিল, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা ছাড়াই ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ট্রিলিয়ন ডলারের আকারে পৌঁছাবে।
তবে সেই ঘোষণার ১১ দিনের মাথায় ব্যাংককে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনায় শর্ত মেনে নেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
এবার তিনি বলছেন, ঋণের শর্ত থাকবে, সেগুলো পূরণ করা হবে এবং কিছু বিষয়ে সমঝোতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফলে আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরকারের সরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদিও নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলো কী হবে এবং কোন বিষয়ে সমঝোতা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলবে আরও কয়েক মাস
থাইল্যান্ডে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা এখনো প্রাথমিক ও চলমান প্রক্রিয়ার অংশ বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সংস্কার, অর্থনৈতিক নীতি এবং ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে আলোচনা আরও কয়েক মাস চলতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটা তো একটা প্রসেস। সুতরাং এই আলোচনার মাধ্যমে সেটা সমাধান করা হবে।’
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বহুপক্ষীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের কার্যক্রম সঠিক পথে এগোবে বলেও আশা প্রকাশ করেন আমির খসরু।
অর্থমন্ত্রী জানান, পারস্পরিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতেই এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকার কাজ করতে চায়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট, দাবি অর্থমন্ত্রীর
বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ সন্তুষ্ট বলে দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরুর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছিল, তার সঙ্গে বৈশ্বিক সংকট যুক্ত হওয়ার পরও বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, ‘তারা মনে করে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভালোই হয়েছে। এবং বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে, আমরা যে ইনহেরিট করেছি যে অর্থনীতি এবং বর্তমান বিশ্বেও যে ওয়ার, মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ চলছে, সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের এই পর্যন্ত প্রগ্রেস কার্যক্রম সম্বন্ধে তারা সন্তুষ্ট আছে।’
তবে বাংলাদেশের সংস্কার বাস্তবায়নের কৌশল কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে আইএমএফের আগে প্রশ্ন ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা বিশ্বাসযোগ্য বলেই আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এত দূর এগিয়েছে।
তার ভাষায়, ‘ক্রেডিবল স্ট্র্যাটেজি না থাকলে তো আর আলোচনা এত দূর আসত না। ক্রেডিবল স্ট্র্যাটেজি আছে বলেই তো আলোচনা এতটুকু এগোচ্ছে।’
ভবিষ্যতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে বলেও দাবি করেন অর্থমন্ত্রী।
তবে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে কোন সংস্কার শর্ত যুক্ত হবে, বাংলাদেশ কোন শর্ত গ্রহণ করবে এবং কোন বিষয়ে সমঝোতা হবে, তা নির্ধারণে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
