প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
ডায়ানার শেষ রাতে কী ঘটেছিল
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬। ০১:২০ পিএম
আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬। ১৬:৩৯ পিএম
১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ৩৬ বছর বয়সে প্রাণ হারান ব্রিটিশ রাজপরিবারের সবচেয়ে আলোচিত সদস্যদের একজন প্রিন্সেস ডায়ানা। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই শোকের ছায়া নেমে আসে বিশ্বজুড়ে।
আজও ডায়ানার মৃত্যু ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে তাঁর জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টায় ঠিক কী ঘটেছিল, কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল এবং কেন এত বছর পরও তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে এসব বিষয় বারবার আলোচনায় আসে।
অসুখী শৈশব থেকে রাজপরিবারে
১৯৬১ সালের ১ জুলাই ব্রিটেনের নরফোকের স্যান্ড্রিংহামের পার্ক হাউসে অভিজাত স্পেন্সার পরিবারে জন্ম নেন ডায়ানা ফ্রান্সিস স্পেন্সার। সাত বছর বয়সে তাঁর মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। পরবর্তী সময়ে বাবা-মায়ের দ্বিতীয় বিয়েসহ পারিবারিক নানা ঘটনায় তাঁর শৈশব অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
১৯৭৫ সালে দাদা অ্যালবার্ট স্পেন্সারের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা জন স্পেন্সার অষ্টম আর্ল স্পেন্সার হন। তখন ডায়ানার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘লেডি’ উপাধি।
পড়াশোনায় খুব উজ্জ্বল না হলেও সংগীত, নাচ ও গার্হস্থ্যবিজ্ঞানে তাঁর আগ্রহ ছিল। ১৯৭৯ সালে লন্ডনে ফিরে বিভিন্ন ছোটখাটো চাকরি করেন তিনি। কিছুদিন শিশুর দেখাশোনা এবং কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন।
চার্লসের সঙ্গে পরিচয় ও বিয়ে
চার্লসের সঙ্গে ডায়ানার প্রথম দেখা হয় ১৯৭৭ সালে। তখন ডায়ানার বয়স ১৬ এবং চার্লসের ২৯। সে সময় চার্লস ডায়ানার বড় বোন লেডি সারার সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন।
১৯৮০ সালে তাঁদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। পরের বছর চার্লস ডায়ানাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই লন্ডনের সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালে তাঁদের বিয়ে হয়।
বিয়ের অনুষ্ঠানটি ছিল বিশ্বজুড়ে অন্যতম আলোচিত রাজকীয় আয়োজন। আনুমানিক ১০০ কোটি মানুষ টেলিভিশন ও রেডিওতে অনুষ্ঠানটি দেখেন বা শোনেন বলে ধারণা করা হয়।
বিয়ের পর ডায়ানা পান ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ উপাধি। দ্রুতই তিনি রাজপরিবারের অন্যতম জনপ্রিয় সদস্যে পরিণত হন।

বিয়ের দিন চার্লস ও ডায়ানা। ছবি: এএফপি
‘জনতার রাজকুমারী’
দাতব্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ডায়ানা বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন। গৃহহীন মানুষ, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি।
পরবর্তী সময়ে স্থলমাইনবিরোধী প্রচারেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব, পোশাক, জনসম্পৃক্ততা ও মানবিক কর্মকাণ্ড তাঁকে আন্তর্জাতিক আইকনে পরিণত করে।

চার্লস ও ডায়ানার দুই সন্তান প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারি। ছবি: সংগৃহীত
ভেঙে যায় দাম্পত্য
রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিকতা ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন ধীরে ধীরে তাঁদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ঘোষণা করা হয়, চার্লস ও ডায়ানা আলাদা থাকবেন।
১৯৯৫ সালে একটি বহুল আলোচিত টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ডায়ানা তাঁর দাম্পত্যজীবনের নানা সমস্যা ও জনজীবনের চাপ নিয়ে কথা বলেন।
শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ২৮ আগস্ট তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। তবে সন্তানদের দেখাশোনায় দুজনই সক্রিয় ছিলেন।
মৃত্যুর আগে নতুন সম্পর্ক
বিবাহবিচ্ছেদের পর ডায়ানার ব্যক্তিগত জীবন আবারও সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় আসে। ব্রিটিশ-পাকিস্তানি হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ হাসনাত খানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়।
১৯৯৭ সালের গ্রীষ্মে মিসরীয় ধনকুবের মোহাম্মদ আল-ফায়েদের ছেলে দোদি আল-ফায়েদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ফ্রান্সের সেন্ট ট্রোপেজে আল-ফায়েদ পরিবারের প্রমোদতরিতে তাঁদের একসঙ্গে সময় কাটানোর ছবি পাপারাজ্জিদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
এরপর থেকেই ডায়ানা ও দোদির গতিবিধি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

লন্ডনের ক্রিস্টিজে ‘ড্রেসেস অকশন’-এর গালা সংবর্ধনা ও প্রদর্শনীতে প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডায়ানা। পাশে দোদি আল-ফায়েদ। ছবি: অ্যান্টনি জোন্স/গেটি
যে রাতে ঘটে দুর্ঘটনা
১৯৯৭ সালের ৩০ আগস্ট সার্ডিনিয়া থেকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে প্যারিসে আসেন ডায়ানা ও দোদি। স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ল্য বুর্জে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই তাঁদের অনুসরণ করতে থাকেন পাপারাজ্জিরা।
প্রথমে তাঁরা যান আল-ফায়েদের ভিলা উইন্ডসরে। পরে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রিটজ হোটেলে ফিরে ইম্পেরিয়াল স্যুটে ওঠেন।
সন্ধ্যার পর তাঁরা দোদির একটি অ্যাপার্টমেন্টে যান। সেখান থেকে রাত সাড়ে নয়টার দিকে বের হওয়ার পরও পাপারাজ্জিরা তাঁদের অনুসরণ করছিলেন।
রাতের খাবার বাইরে খাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পাপারাজ্জিদের কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁরা রিটজ হোটেলের ইম্পেরিয়াল স্যুটে খাবার খান।
মাত্র তিন মিনিটেই সব শেষ
দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে ডায়ানা ও দোদি হোটেলের পেছনের পথ দিয়ে একটি কালো মার্সিডিজ গাড়িতে বের হন। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন রিটজ হোটেলের নিরাপত্তা বিভাগের উপপ্রধান অঁরি পল। সামনের যাত্রীর আসনে ছিলেন দোদির দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্স।
ডায়ানা ও দোদি ছিলেন পেছনের আসনে।
পাপারাজ্জিদের পিছু ধাওয়া এড়াতে গাড়িটি দ্রুতগতিতে চলছিল। হোটেল থেকে বের হওয়ার প্রায় তিন মিনিট পর প্যারিসের পঁ দ্য ল’আলমা আন্ডারপাসে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি কংক্রিটের পিলারে সজোরে ধাক্কা খায়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন দোদি আল-ফায়েদ ও চালক অঁরি পল। গুরুতর আহত হন ডায়ানা ও তাঁর দেহরক্ষী ট্রেভর।

দুর্ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ি। ছবি: রয়টার্স
শেষ মুহূর্তে বাঁচানোর চেষ্টা
উদ্ধারকারী দলের সদস্য জাভিয়ের গুরমেলোঁ পরে জানান, গাড়ির কাছে পৌঁছে তিনি ডায়ানাকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি নড়াচড়া করছিলেন এবং কথা বলছিলেন।
উদ্ধারকর্মীরা তাঁকে গাড়ি থেকে বের করার চেষ্টা করেন। এ সময় ডায়ানার হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে তাঁকে সিপিআর দেওয়া হয় এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
পরে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে পিতিয়ে-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হলেও গুরুতর অভ্যন্তরীণ আঘাতের কারণে তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সময় ভোর ৪টার দিকে চিকিৎসকেরা ডায়ানাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্তে কী উঠে এসেছিল?
ডায়ানার মৃত্যুর পর থেকেই দুর্ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। দোদির বাবা মোহাম্মদ আল-ফায়েদ প্রকাশ্যে দাবি করেন, তাঁর ছেলে ও ডায়ানার মৃত্যু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
তবে তদন্তে এমন দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
১৯৯৯ সালের ফরাসি বিচারিক তদন্তে বলা হয়, গাড়িচালক অঁরি পল মদ্যপ ছিলেন এবং তাঁর ওপর কিছু ওষুধের প্রভাবও ছিল। উচ্চ গতিতে গাড়ি চালানোর সময় তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন।
যুক্তরাজ্যে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক তদন্তেও ২০০৮ সালে জুরি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে অঁরি পলের চরম অবহেলা এবং পাপারাজ্জিদের বেপরোয়া অনুসরণ দুর্ঘটনাটির পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।
তবু তদন্তের ফলাফল প্রকাশের পরও ডায়ানার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব পুরোপুরি থামেনি। প্রায় তিন দশক পরও সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়।
শেষযাত্রায় লাখো মানুষের ঢল
ডায়ানার মরদেহ ৩১ আগস্ট ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়। ৬ সেপ্টেম্বর কেনসিংটন প্যালেস থেকে শুরু হয় তাঁর শেষযাত্রা।

ডায়ানার শেষযাত্রা। ছবি: রয়টার্স
মা ডায়ানার কফিনের পেছনে হাঁটেন দুই ছেলে উইলিয়াম ও হ্যারি। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন চার্লস এবং রাজপরিবার ও স্পেন্সার পরিবারের সদস্যরা।
লন্ডনের রাস্তায় শেষযাত্রা দেখতে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। পরে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।
শেষকৃত্যের পর ডায়ানার মরদেহ নর্থ্যাম্পটনশায়ারের অলথ্রপে স্পেন্সার পরিবারের এস্টেটের একটি ছোট দ্বীপে সমাহিত করা হয়।
আজও প্রিন্সেস ডায়ানা বিশ্বজুড়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর মানবিক কাজ, রাজকীয় জীবনের বাইরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে গভীর সংযোগ এবং আকস্মিক মৃত্যুর কারণে। তাঁর মৃত্যুর ২৯ বছর পরও সেই শেষ রাতের প্রশ্ন 'ঠিক কী ঘটেছিল?' মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়ে গেছে।
