Logo
Logo
×

লাইফস্কেপ ।  সাহিত্য

ফুকো: ক্ষমতার নয়, কর্তাসত্তার রাজনীতি

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৪:৫২ পিএম

ফুকো: ক্ষমতার নয়, কর্তাসত্তার রাজনীতি

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর চিন্তাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা হলো, তাঁর দর্শনের প্রধান বিষয় ‘ক্ষমতা’। কিন্তু ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হুবার্ট এল ড্রেফুস ও পল রাবিনোর ‘মিশেল ফুকো: বিয়ন্ড স্ট্রাকচারালিজম অ্যান্ড হারমেনিউটিকস’ বইয়ের উপসংহার হিসেবে লেখা দীর্ঘ প্রবন্ধে ফুকো নিজেই এই ধারণাকে ভেঙে দেন। তাঁর মতে, তাঁর কাজের কেন্দ্রে ক্ষমতা নয়, বরং ‘কর্তা’ বা মানুষের কর্তাসত্তায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া।

ফুকোর মূল প্রশ্ন ছিল একজন সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ কীভাবে সমাজের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের অধিকারী হয়ে ওঠে? রাষ্ট্র, ধর্ম, প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান এবং ব্যক্তিমানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে এই পরিচয় নির্মাণ করে? তাঁর আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মূলত এই প্রশ্নগুলোর ঐতিহাসিক অনুসন্ধান।

ক্ষমতার তত্ত্ব নয়, কর্তাসত্তার ইতিহাস

ফুকো স্পষ্ট করে বলেন, ক্ষমতার কোনো সর্বজনীন, গাণিতিক বা চূড়ান্ত তত্ত্ব তৈরি করা তাঁর দার্শনিক কাজের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং পশ্চিমা সংস্কৃতিতে মানুষ কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ‘কর্তা’য় পরিণত হয়েছে, সেই রূপান্তরের ধারাবাহিক ইতিহাস অনুসন্ধান করাই ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

ফুকোর কাছে ‘কর্তা’ শব্দটির অর্থও সরল নয়। সমাজের নিয়মনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, শৃঙ্খলা, আইন এবং বিভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একজন মানুষকে নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ মানুষ জন্ম থেকেই একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিচয় নিয়ে আসে না; বরং বিভিন্ন জ্ঞান ও ক্ষমতার কাঠামো তাকে সেই পরিচয়ে রূপান্তরিত করে।

এই রূপান্তরকে ফুকো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন।

জ্ঞান কীভাবে মানুষকে বস্তুতে পরিণত করে

প্রথম পদ্ধতিটি বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক জ্ঞানব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ভাষাবিজ্ঞান, সাধারণ ব্যাকরণ কিংবা ফিলোলজির মতো বিদ্যা যখন মানুষের ভাষা ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করে, তখন মানুষকে একটি ‘কথা বলা কর্তা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। একইভাবে অর্থনীতি মানুষের শ্রম, উৎপাদন ও সম্পদের সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাকে শ্রমিক, উৎপাদক বা ভোক্তা হিসেবে চিহ্নিত করে।

প্রাকৃতিক ইতিহাস, চিকিৎসা ও জীববিদ্যাও মানুষকে তার দেহ, কোষ ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে। ফলে মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বকে একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়।

ফুকোর বিশ্লেষণে বিজ্ঞান তাই পুরোপুরি নিরপেক্ষ কোনো ব্যবস্থা নয়। মানুষকে সংজ্ঞায়িত করার মধ্য দিয়েই জ্ঞানব্যবস্থা তাকে নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে স্থাপন করে এবং সেই পরিচয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে।

বিভাজনের মাধ্যমে পরিচয় নির্মাণ

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো ‘বিভাজন’। সমাজ মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণি ও পরিচয়ে ভাগ করে। এই বিভাজন কখনো মানসিকভাবে, কখনো সামাজিকভাবে এবং কখনো সরাসরি শারীরিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে কার্যকর হয়।

সুস্থ ও অসুস্থ, পাগল ও স্বাভাবিক, অপরাধী ও আইনমান্যকারী এ ধরনের বিভাজন সমাজে নির্দিষ্ট পরিচয় তৈরি করে। মানসিক হাসপাতাল বা অ্যাসাইলামে যাদের ‘পাগল’ হিসেবে আলাদা করে রাখা হয়, তাদের অস্তিত্বের বিপরীতে সমাজের অন্যরা নিজেদের ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

একইভাবে কারাগার অপরাধীদের সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে। ফলে জেলের বাইরে থাকা মানুষ নিজেদের নৈতিক, ভালো কিংবা আইনমান্য নাগরিক হিসেবে দেখতে পারে।

অর্থাৎ বিভাজনের মাধ্যমে মানুষকে নির্দিষ্ট লেবেল দেওয়া হয় এবং সেই পরিচয়কে স্থায়ী করে তোলা হয়। সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এই বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মানুষ নিজেই যখন নিজের পরিচয় তৈরি করে

তৃতীয় পদ্ধতিটি আরও সূক্ষ্ম। এখানে বাইরের কোনো দৃশ্যমান জবরদস্তি ছাড়াই মানুষ নিজেই নিজেকে একটি নির্দিষ্ট কর্তাসত্তার মধ্যে স্থাপন করে।

যৌনতার প্রসঙ্গ দিয়ে ফুকো এই প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করেছেন। আধুনিক সমাজে মানুষ নিজের কামনা, প্রবৃত্তি ও যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্রমাগত চিন্তা করতে শুরু করে। চিকিৎসক, মনোবিশেষজ্ঞ, বৈজ্ঞানিক বই কিংবা বিভিন্ন নির্দেশিকার সাহায্যে সে নিজের যৌন পরিচয়কে ব্যাখ্যা করতে থাকে।

একপর্যায়ে ব্যক্তি নিজেই নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট যৌন পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে। এখানে বাইরের কোনো সরাসরি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ব্যক্তি নিজের ওপর এক ধরনের মানসিক নজরদারি চালায়। নিজের পরিচয়কে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে স্থাপন করার এই প্রক্রিয়াই কর্তাসত্তা নির্মাণের অন্যতম সূক্ষ্ম পদ্ধতি।

ক্ষমতাকে বুঝতে হলে প্রতিরোধকে দেখতে হবে

ফুকোর মতে, সমাজকে কেবল অর্থনৈতিক উৎপাদন কিংবা ভাষার কাঠামোর মাধ্যমে বোঝা যায় না। মানুষের জীবন অসংখ্য সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যেও আবদ্ধ।

মার্ক্সবাদ উৎপাদন সম্পর্ক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভাষাতাত্ত্বিক ও কাঠামোগত চিন্তাধারা ভাষার অভ্যন্তরীণ কাঠামো বুঝতে সাহায্য করেছে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে ক্ষমতা কীভাবে সূক্ষ্মভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য প্রচলিত বিশ্লেষণ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ফুকো।

তাঁর মতে, ক্ষমতাকে শুধু আইন, রাষ্ট্র, সরকার কিংবা সার্বভৌমত্বের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ধারণায় সীমাবদ্ধ করলে এর বহু রূপ অদৃশ্য থেকে যায়। তাই একটি চূড়ান্ত ক্ষমতার তত্ত্বের বদলে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করছে, তা ক্রমাগত যাচাই ও সমালোচনার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

এই কারণেই ক্ষমতার প্রকৃতি বোঝার জন্য ফুকো ক্ষমতার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ ও সংগ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, প্রতিরোধ অনেকটা রাসায়নিক প্রভাবকের মতো কাজ করে ক্ষমতার সংস্পর্শে এসে তার লুকানো সম্পর্ক, কৌশল ও কার্যপ্রণালীকে দৃশ্যমান করে তোলে।

প্রতিরোধের ছয় বৈশিষ্ট্য

ফুকোর বিশ্লেষণে ক্ষমতার বিরুদ্ধে সমকালীন সংগ্রামগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

প্রথমত, এগুলো তির্যক বা সীমান্ত অতিক্রমকারী সংগ্রাম। নারী অধিকার, পরিবেশ রক্ষা কিংবা সমকামীদের অধিকারের মতো আন্দোলন কোনো একটি রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

দ্বিতীয়ত, এসব সংগ্রামের লক্ষ্য কেবল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করা নয়। বরং প্রতিষ্ঠান কীভাবে মানুষের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে, সেটিই প্রশ্নের কেন্দ্রে থাকে।

তৃতীয়ত, এগুলো তাৎক্ষণিক সংগ্রাম। ভবিষ্যতের কোনো মহান পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থেকে মানুষ তার বর্তমান জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে এমন ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

চতুর্থত, এসব সংগ্রাম ব্যক্তিসত্তার মর্যাদাকে গুরুত্ব দেয়। মানুষ যেমন নিজের স্বাতন্ত্র্য ও ভিন্নতার অধিকার দাবি করে, তেমনি যে ক্ষমতা তাকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের খাঁচায় বন্দি করে, তার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয়।

পঞ্চমত, প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞের কর্তৃত্বও এসব সংগ্রামের প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা নয়, বরং জ্ঞান কীভাবে তৈরি হয়, সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে—সেই প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন করা হয়।

ষষ্ঠত, এসব সংগ্রামের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন ‘আমরা কারা?’ রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা যখন মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করতে চায়, তখন এসব সংগ্রাম সেই কর্তাসত্তা নির্মাণের প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে।

আধিপত্য, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম

ফুকো ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক সংগ্রামকে তিনটি বড় ধরনের রূপে দেখেছেন। প্রথমটি আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম যেমন জাতিগত, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় আধিপত্যের বিরোধিতা।

দ্বিতীয়টি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, যেখানে অর্থনৈতিক কাঠামো মানুষের শ্রম ও উৎপাদিত বস্তু থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে।

তৃতীয়টি হলো সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, যা ব্যক্তিকে তার নিজের পরিচয়ের সঙ্গে বেঁধে ফেলে এবং তাকে অন্যের কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য করে। এটিই পরাধীনতা, আত্মপরিচয় ও বশ্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম।

ফুকোর মতে, বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগে এই সংগ্রামগুলোর গুরুত্ব ভিন্ন ছিল। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শিল্পবিপ্লবের পর উনিশ শতকে শোষণের প্রশ্ন সামনে আসে। আর আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক সমাজে পরিচয়, কর্তাসত্তা ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আধুনিক রাষ্ট্রের দ্বিমুখী ক্ষমতা

এই পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ফুকো আধুনিক রাষ্ট্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর দেন। রাষ্ট্র শুধু সামগ্রিক জনগোষ্ঠীকে পরিচালনা করে না; একই সঙ্গে প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনকেও নিয়ন্ত্রণ করে।

রাষ্ট্র জনসংখ্যার হিসাব রাখে, অর্থনীতি পরিচালনা করে এবং সামগ্রিক নীতি নির্ধারণ করে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবার, নিরাপত্তা, যৌনতা ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা ক্ষেত্রেও তার প্রভাব বিস্তৃত হয়।

এই সামগ্রিকীকরণ ও ব্যক্তিকরণের সমন্বয়কে বোঝার জন্য ফুকো খ্রিষ্টধর্মের প্রাচীন ‘যাজকীয় ক্ষমতা’র ধারণার দিকে ফিরে যান।

যাজকীয় ক্ষমতা থেকে আধুনিক রাষ্ট্র

ফুকোর মতে, খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে যাজক বা প্যাস্টরের ক্ষমতার চারটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ব্যক্তির আত্মার পরিত্রাণ। এই ক্ষমতা ছিল আত্মত্যাগী অনুসারীদের রক্ষায় যাজক নিজের জীবনও উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকতেন।

এটি শুধু একটি সম্প্রদায়কে দূর থেকে পরিচালনা করত না; বরং প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের আচরণ, ভালো-মন্দ এবং নৈতিক অবস্থার হিসাব রাখত। একই সঙ্গে ব্যক্তির অন্তর্জগৎ, গোপন পাপ ও স্বীকারোক্তির ওপরও এর প্রবেশাধিকার ছিল।

আধুনিক রাষ্ট্রের উত্থানের সঙ্গে চার্চের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কমলেও এই যাজকীয় কৌশলগুলো হারিয়ে যায়নি। বরং রাষ্ট্র সেগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্যকে ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোয় গ্রহণ করে নেয়।

তবে এখানে পরকালের মুক্তির পরিবর্তে লক্ষ্য হয়ে ওঠে পার্থিব কল্যাণ সুস্বাস্থ্য, সম্পদ, নিরাপত্তা, উন্নত জীবনযাত্রা এবং সামাজিক সুরক্ষা।

পুলিশ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসাবিদ্যা, শিক্ষা, কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান এমনকি পরিবারও মানুষের জীবনের বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করে। ফলে একদিকে সমগ্র জনসংখ্যাকে নিয়ে পরিসংখ্যানগত জ্ঞান তৈরি হয়, অন্যদিকে ব্যক্তির মানসিক ও ব্যক্তিগত জীবন বিশ্লেষণের নানা পদ্ধতিও বিস্তৃত হয়।

‘আমরা কারা’ প্রশ্নটিই কেন গুরুত্বপূর্ণ

ফুকোর বিশ্লেষণে আধুনিক রাষ্ট্র কেবল আইন প্রয়োগকারী কোনো দূরবর্তী প্রতিষ্ঠান নয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভেতরেও প্রবেশ করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সম্পর্ক, যৌনতা, পরিবার থেকে শুরু করে ব্যক্তির চিন্তার ক্ষেত্র পর্যন্ত এর প্রভাব বিস্তৃত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ক্ষমতা সবসময় সরাসরি জবরদস্তির মাধ্যমে কাজ করে না। বরং যত্ন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণের মতো ইতিবাচক উদ্দেশ্যের মধ্য দিয়েও মানুষকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে স্থাপন করা সম্ভব হয়।

ফলে মানুষ অনেক সময় নিজেই সেই পরিচয়কে নিজের বলে গ্রহণ করে। নিজের ওপর নিজেই নজরদারি চালায় এবং নির্দিষ্ট সামাজিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেকে বিচার করে।

এ কারণেই ফুকোর কাছে মুক্তির প্রশ্ন কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রশ্ন নয়। বরং আমরা নিজেদের সম্পর্কে যে ‘সত্য’কে স্বাভাবিক, চিরন্তন ও প্রশ্নাতীত বলে মেনে নিয়েছি, সেই সত্য কীভাবে তৈরি হলো এ প্রশ্ন তোলাও মুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মুক্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া

ফুকোর চিন্তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ক্ষমতাকে তিনি শুধু ওপর থেকে নিচে নেমে আসা কোনো শক্তি হিসেবে দেখেননি। ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্য দিয়ে কাজ করে এবং মানুষকে নির্দিষ্ট পরিচয় ও কর্তাসত্তার মধ্যে তৈরি করে।

তাই ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও কেবল কোনো শাসক বা প্রতিষ্ঠানকে পরাজিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের ওপর আরোপিত পরিচয়, শ্রেণিবিন্যাস, স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা এবং জ্ঞানের কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করাও সেই প্রতিরোধের অংশ।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ফুকোর দর্শনে মুক্তি কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। বরং নিজেদের ওপর আরোপিত পরিচয় ও ক্ষমতার কাঠামোকে বারবার প্রশ্ন করার একটি চলমান প্রক্রিয়া। ‘আমরা কারা’—এই প্রশ্নকে জীবন্ত রাখা এবং আমাদের কর্তাসত্তা কীভাবে নির্মিত হচ্ছে, তা অনুসন্ধান করাই হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে