প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬। ০৩:৩৯ এএম
আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬। ১৭:০০ পিএম
কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ বাংলা কবিতার ইতিহাসে শুধু দ্রোহের প্রতীক নয়; এটি পুরাণ, ধর্ম, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও বিশ্বসাহিত্যের নানা আখ্যানকে একসূত্রে বেঁধে নতুন অর্থ নির্মাণের এক অনন্য কাব্যিক প্রয়াস। কবিতাটিকে 'আন্তঃপাঠ্যতার' দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে এর ভেতরের বহুস্তরীয় অর্থ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক জীবন শেষ করে কলকাতায় ফেরেন নজরুল ইসলাম। সে সময় ভারতবর্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল চরম অস্থির। বন্ধু মুজাফফর আহমেদের সঙ্গে তিনি কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেনের একটি ছোট ঘরে বসবাস শুরু করেন। সেই স্যাঁতসেঁতে ঘরেই ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে মাত্র ২২ বছর বয়সে পেন্সিলে একটানে লিখে ফেলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা।
১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায় কবিতাটি প্রকাশের পরপরই তা সমগ্র বাংলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে ‘বিদ্রোহী’কে শুধু ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক চেতনার কবিতা হিসেবে দেখলে এর সাহিত্যিক ব্যাপ্তির একটি বড় অংশ আড়ালেই থেকে যায়।
‘আমি’র মধ্য দিয়ে মহাজাগতিক বিস্তার
‘বিদ্রোহী’ কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বারবার ‘আমি’ শব্দের ব্যবহার। এই ‘আমি’ কোনো একক ব্যক্তির সীমাবদ্ধ আত্মপরিচয় নয়। কখনো এটি মানুষ, কখনো প্রকৃতি, কখনো দেবতা, কখনো ঐতিহাসিক চরিত্র, আবার কখনো ধ্বংস ও সৃষ্টির মহাজাগতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
ওয়াল্ট হুইটম্যানের ‘নিজের গান’ কবিতার সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’র এই ‘আমি’-কেন্দ্রিক ভাবনার একটি সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। হুইটম্যান যেমন ‘আমি’র মাধ্যমে ব্যক্তি-মানুষের সত্তাকে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের সঙ্গে একীভূত করেছেন, নজরুলও তাঁর ‘আমি’কে সীমাহীন শক্তি ও মানবিক সম্ভাবনার প্রতীকে পরিণত করেছেন।
একইভাবে পার্সি বিশি শেলির ‘পশ্চিমা বাতাসের প্রতি স্তব’ ও ‘মুক্ত প্রমিথিউস’ কবিতার বিদ্রোহ, পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন পৃথিবী নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা এবং মুক্তির তীব্র বাসনার সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’র চেতনার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে নজরুল এসব ভাবনাকে সরলভাবে অনুসরণ করেননি। ভারতীয় পুরাণ, ইসলামি ঐতিহ্য, গ্রিক পুরাণ, ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের মানবতাবাদী ও বিপ্লবী চেতনাকে মিশিয়ে তিনি তৈরি করেছেন সম্পূর্ণ নিজস্ব এক কাব্যভাষা।
আন্তঃপাঠ্যতার ধারণা
সাহিত্যতাত্ত্বিক জুলিয়া ক্রিস্তেভা ১৯৬৬ সালে 'আন্তঃপাঠ্যতা' ধারণাকে তাত্ত্বিকভাবে সামনে আনেন। তাঁর মতে, কোনো সাহিত্যিক রচনা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা শূন্য থেকে তৈরি হয় না। প্রতিটি নতুন রচনার ভেতরে পূর্ববর্তী অসংখ্য রচনা, সংস্কৃতি, ভাষা ও ভাবনার উপস্থিতি থাকে।
তবে এটি সরল অনুকরণ নয়। নতুন লেখক আগের পাঠকে গ্রহণ, পরিবর্তন ও পুনর্নির্মাণ করে নতুন অর্থ তৈরি করেন।
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্পষ্ট। বৈদিক ও হিন্দু পুরাণ, ইসলামি ধর্মীয় প্রতীক, গ্রিক পুরাণ, ভারতীয় ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা সবকিছুকে নজরুল তাঁর বিদ্রোহী সত্তার ভেতরে এনে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছেন।
হিমালয় থেকে আরশ
কবিতার শুরুতেই নজরুল লিখেছেন
> ‘বল বীর
> বল উন্নত মম শির!’
এখানে কবি সরাসরি পাঠককে সম্বোধন করছেন। ফলে কবি ও পাঠকের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সংলাপ তৈরি হচ্ছে।
এর পরেই সেই ‘আমি’ পৌঁছে যাচ্ছে ভারতীয় ভূগোল ও পুরাণের বিশাল পরিসরে
> ‘শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!’
হিমালয়ের সামনে নিজের মাথাকে আরও উঁচু করে দেখানোর মধ্য দিয়ে নজরুল প্রচলিত শক্তির প্রতীককেই উল্টে দিচ্ছেন।
এরপর আসে ইসলামি সাংস্কৃতিক পরিসর
> ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
> উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!’
এখানে ‘আরশ’ স্রষ্টার সর্বোচ্চ আসনের প্রতীক। নজরুল এই চিহ্নকে মানুষের অদম্য আত্মশক্তির রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে ধর্মীয় প্রতীকটি তার প্রচলিত অর্থে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে মানুষের অসীম সম্ভাবনার প্রতীক।
মনসুর হাল্লাজ ও মানবসত্তার শক্তি
এই প্রসঙ্গে সুফি সাধক মনসুর হাল্লাজের ‘আনাল হক’ ধারণার সঙ্গেও একটি আন্তঃপাঠ্য সম্পর্ক তৈরি হয়। ‘আনাল হক’ অর্থ ‘আমিই সত্য’। এই উচ্চারণে মানুষ ও পরম সত্তার সম্পর্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল।
নজরুলের ‘আমি’ও বারবার প্রচলিত সীমারেখা অতিক্রম করে। সে দেবতার শক্তি ধারণ করে, পুরাণের চরিত্রে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের মধ্যেই অসীম শক্তির সন্ধান করে।
নটরাজ থেকে সাইক্লোন
নজরুলের কাব্যিক কৌশলের শক্তিশালী দৃষ্টান্ত
> ‘মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!’
একই চরণে পৌরাণিক নটরাজ এবং আধুনিক বাস্তবতার ঘূর্ণিঝড়কে পাশাপাশি দাঁড় করানো হয়েছে। নটরাজের তাণ্ডব এখানে শুধু ধ্বংস নয়; পুরোনোকে সরিয়ে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনারও প্রতীক।
অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় প্রকৃতির বাস্তব ধ্বংসাত্মক শক্তি। এই দুই ভিন্ন পাঠকে একত্র করে নজরুল নিজের বিদ্রোহী সত্তাকে এমন এক শক্তিতে রূপ দিয়েছেন, যা একই সঙ্গে পৌরাণিক এবং বাস্তব।
শিব, কৃষ্ণ ও যুদ্ধের দ্বৈততা
> ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী
> আর রণ-তূর্য।’
এখানে কৃষ্ণের বাঁশির কোমলতা এবং যুদ্ধের রণতূর্য একই ‘আমি’র মধ্যে অবস্থান করছে। একদিকে প্রেম, সংগীত ও সৌন্দর্য; অন্যদিকে যুদ্ধ, প্রতিরোধ ও সংগ্রাম।
নজরুলের বিদ্রোহ তাই শুধু ধ্বংসের দর্শন নয়। তাঁর ‘আমি’র মধ্যে কোমলতা ও কঠোরতা, প্রেম ও যুদ্ধ, সৃষ্টি ও ধ্বংস পাশাপাশি অবস্থান করে।
‘কৃষ্ণ-কণ্ঠ’ ও বিষপানের আখ্যান
> ‘আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধীর।’
সমুদ্রমন্থনের সময় শিব যে বিষ পান করেছিলেন, সেই পৌরাণিক আখ্যান এখানে মানুষের দুঃখ-বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ‘ব্যথা-বারিধী’ হয়ে উঠেছে নিপীড়িত মানুষের অসীম কষ্টের সমুদ্র।
অর্থাৎ পৌরাণিক শিবের বিষপান এখানে নতুন অর্থে মানুষের দুঃখ ধারণ ও তা অতিক্রম করার শক্তির প্রতীক।
বেদুইন থেকে চেঙ্গিস
‘বিদ্রোহী’ কবিতার আন্তঃপাঠ্যতা শুধু ধর্মীয় ও পৌরাণিক আখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা চরিত্রও এখানে নতুন অর্থে হাজির হয়েছে।
> ‘আমি বেদুইন, আমি চেঙ্গিস,
> আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!’
বেদুইনের স্বাধীনচেতা জীবন এবং চেঙ্গিস খানের অপরাজেয় সামরিক শক্তি দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রতীককে নজরুল নিজের আত্মপরিচয়ের অংশ করেছেন।
এর মাধ্যমে তিনি এমন এক ‘আমি’ নির্মাণ করেন, যে কোনো ক্ষমতার কাছে মাথা নত করে না।
ইস্রাফিলের শিঙা ও শিবের ওঙ্কার
ধর্মীয় বহুত্বের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায়
> ‘আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
> আমি ইস্রাফিলের শিঙার মহা হুঙ্কার।’
একদিকে শৈব ও হিন্দু ঐতিহ্যের ‘ওঙ্কার’, অন্যদিকে ইসলামী বিশ্বাসের কেয়ামতের দূত ইস্রাফিলের শিঙা। দুটি ভিন্ন ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রতীক একই কাব্যিক শক্তির মধ্যে এসে মিশেছে।
এর পরেই আসে ডমরু, ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড, চক্র ও শঙ্খ। যেন বিভিন্ন ধর্ম ও পুরাণের বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলো এসে কবির ‘আমি’র মধ্যে একত্রিত হয়েছে।
বোররাক ও উচ্চৈঃশ্রবা
> ‘তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার।’
ইসলামি ঐতিহ্যের মিরাজের বাহন বোররাক এবং ভারতীয় পুরাণের উচ্চৈঃশ্রবা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংস্কৃতিক জগতের প্রতীক।
নজরুল তাদের একই বিদ্রোহী যাত্রার বাহনে পরিণত করেছেন। একইভাবে বাসুকির ফণা ও জিব্রাইলের আগুনের পাখাকে একসঙ্গে ধারণ করার চিত্রে পাতাল ও স্বর্গের দুই বিপরীত শক্তিকেও মানুষের আয়ত্তে নিয়ে আসা হয়েছে।
অর্ফিয়াস ও কৃষ্ণের বাঁশি
গ্রিক পুরাণের অর্ফিয়াস এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের শ্যাম বা কৃষ্ণও নজরুলের ‘আমি’র মধ্যে মিলিত হয়েছেন
> ‘আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী…
> আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।’
অর্ফিয়াসের সংগীত যেমন প্রকৃতি ও প্রাণীকে মোহিত করার ক্ষমতার প্রতীক, কৃষ্ণের বাঁশিও তেমনি প্রেম, ভক্তি ও আকর্ষণের প্রতীক।
নজরুল দুই ভিন্ন পুরাণের সংগীতকে একই কাব্যিক সত্তায় মিলিয়ে দিয়েছেন।
হাবিয়া দোজখও যেখানে ভয় পায়
ইসলামি বিশ্বাসের ভয়ংকর প্রতীক ‘হাবিয়া দোজখ’ও নজরুলের ‘আমি’র সামনে এসে বিপরীত অর্থ ধারণ করে
> ‘ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!’
এখানে যে শক্তিকে মানুষ ভয় করে, সেই ভয়াবহ নরকই কবির ‘আমি’র সামনে ভীত হয়ে পড়ে।
আবার কবি বলেন
> ‘আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!’
প্রচলিত ভয়কে উল্টে দিয়ে কবি সেখানে মানুষের নির্ভীকতাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ছিন্নমস্তা, চণ্ডী ও পরশুরামের কুঠার
হিন্দু পুরাণের শক্তিশালী নারী ও পুরুষ চরিত্রগুলোকেও নজরুল তাঁর বিদ্রোহী সত্তার অংশ করেছেন। ‘ছিন্নমস্তা চণ্ডী’ থেকে ‘পরশুরামের কঠোর কুঠার’ সবই এখানে পুরোনো অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক।
পরশুরামের কুঠার এবং বলরামের হলের মতো পৌরাণিক অস্ত্রকে নজরুল কেবল ধ্বংসের জন্য ব্যবহার করেননি। এগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি অত্যাচারী ব্যবস্থা ভেঙে নতুন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
‘বিদ্রোহী ভৃগু’র নতুন অর্থ
কবিতার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ পুনর্নির্মাণ দেখা যায় ‘ভৃগু’ প্রসঙ্গে
> ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন!’
পুরাণের ভৃগু বিষ্ণুর বুকে লাথি মেরেছিলেন। সেই আখ্যানকে নজরুল সম্পূর্ণ নতুন অর্থে ব্যবহার করেছেন।
তাঁর ভৃগু কোনো পৌরাণিক পরীক্ষক নন; তিনি অন্যায়, দুঃখ ও শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের চূড়ান্ত প্রতিবাদের প্রতীক।
এখানেই আন্তঃপাঠ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি প্রকাশ পায় পুরোনো আখ্যানকে হুবহু পুনরাবৃত্তি না করে তার অর্থকে বদলে দেওয়া।
ধ্বংসের লক্ষ্য শান্তি
‘বিদ্রোহী’র শেষাংশে কবির বিদ্রোহের প্রকৃত উদ্দেশ্য আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে
> ‘মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
> আমি সেই দিন হব শান্ত,
> যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল
> আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’
এই বক্তব্য প্রমাণ করে, নজরুলের বিদ্রোহ ধ্বংসের জন্য ধ্বংস নয়। তাঁর বিদ্রোহের লক্ষ্য নিপীড়নের অবসান।
অত্যাচারীর অস্ত্র থেমে গেলে, উৎপীড়িত মানুষের কান্না বন্ধ হলে তাঁর ‘আমি’ শান্ত হবে।
অর্থাৎ নটরাজের ধ্বংসের মতোই নজরুলের ধ্বংসের ভেতরেও নতুন সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
বাহ্যিক পাঠ ও গভীর চেতনা
আন্তঃপাঠ্যতার আলোচনায় 'বাহ্যিক পাঠ' বলতে রচনার দৃশ্যমান ভাষা, শব্দ, বাক্য ও কাঠামোকে বোঝানো যায়। অন্যদিকে 'গভীর পাঠ' হলো সেই আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও শক্তি, যা রচনাটিকে চালিত করে।
‘বিদ্রোহী’র বাহ্যিক ভাষায় ফারসি, আরবি, সংস্কৃত ও বাংলা শব্দের বিস্ময়কর সংমিশ্রণ রয়েছে। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে পরাধীনতা, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ এবং মুক্ত মানুষের আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা।
এই দুই স্তরের মিলনেই কবিতাটির প্রকৃত শক্তি তৈরি হয়েছে।
শুধু অসাম্প্রদায়িকতা নয়, ভাষারও রাজনীতি
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় হিন্দু, ইসলামি ও গ্রিক পুরাণের পাশাপাশি ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের নানা উপাদানের উপস্থিতিকে অনেক সময় শুধু নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।
তবে আন্তঃপাঠ্যতার দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। এখানে নজরুল কেবল ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছেন না; তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতীকের ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রচলিত অর্থকেও পুনর্গঠন করছেন।
হাজার বছরের পুরাণ ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে তিনি আধুনিক পরাধীন মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’ হয়ে উঠেছে কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং বহু সংস্কৃতি, বহু পুরাণ, বহু ইতিহাস ও বহু মানুষের সম্মিলিত শক্তির এক কাব্যিক রূপ।
‘বিদ্রোহী’ তাই শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের কবিতা নয়। এটি পুরোনো পাঠকে গ্রহণ করে, ভেঙে, পুনর্গঠন করে নতুন অর্থ তৈরির এক অসাধারণ উদাহরণ।
নজরুলের কবিতায় শিব, কৃষ্ণ, ইস্রাফিল, জিব্রাইল, বোররাক, উচ্চৈঃশ্রবা, অর্ফিয়াস, চেঙ্গিস, ভৃগু কিংবা পরশুরাম কেউই তাঁদের পুরোনো অর্থে আটকে থাকেন না। তাঁরা সবাই এসে মিশেছেন এক সীমাহীন মানবিক ‘আমি’র মধ্যে।
এই কারণেই 'আন্তঃপাঠ্যতার দৃষ্টিতে ‘বিদ্রোহী’ পাঠ করলে কবিতাটি কেবল একটি সময়ের রাজনৈতিক দলিল থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে বহু সংস্কৃতি ও বহু পাঠের ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত এক অনন্ত মানবিক বিদ্রোহের কাব্য।'
