প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৪:০৫ পিএম
আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৬:৪২ পিএম
ছুটে চলা এই কর্পোরেট জীবনে ‘চাপ’ বা ‘স্ট্রেস’ যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। চাকরির চাপ, পড়াশোনার চাপ, ভালো ফল করার চাপ, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চাপ—সব মিলিয়ে প্রতিদিনের জীবনটা যেন এক অদৃশ্য দৌড়ের মধ্যে আটকে আছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত মানসিক চাপ কখনো কখনো শরীর ও মনের ওপর এমন প্রভাব ফেলে, যার নাম প্যানিক অ্যাটাক। তবে একটু দুশ্চিন্তা হওয়া, মন খারাপ করা কিংবা কোনো কারণে বিচলিত হয়ে পড়লেই সেটিকে প্যানিক অ্যাটাক বলা যাবে না। প্যানিক অ্যাটাকের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি তীব্র। হঠাৎ করে প্রবল ভয় বা আতঙ্ক শরীর ও মনের ওপর এমনভাবে চেপে বসে যে, কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে—কিছু একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক সময় এর পেছনে কোনো স্পষ্ট কারণও খুঁজে পাওয়া যায় না। প্যানিক অ্যাটাক দিনের যেকোনো সময় হতে পারে, এমনকি ঘুমের মধ্যেও।

প্যানিক অ্যাটাক ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতার নাম। ছবি: পিন্টারেস্ট ডট কম
কেমন হয় প্যানিক অ্যাটাক?
প্যানিক অ্যাটাক অনেক সময় কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই হঠাৎ শুরু হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভয় ও শারীরিক অস্বস্তি এতটা তীব্র হয়ে উঠতে পারে যে, মানুষ মনে করতে পারেন তিনি হয়তো গুরুতর কোনো বিপদের মধ্যে পড়েছেন। চলুন, দেখে নেওয়া যাক এর সাধারণ কিছু লক্ষণ।
হঠাৎ প্রচণ্ড ভয় বা আতঙ্ক
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই আচমকা মনে হতে পারে, ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ভয়টা এতটাই তীব্র হতে পারে যে, মানুষ নিজেই বুঝতে পারেন না কেন এমন অনুভূতি হচ্ছে।
মনে হতে পারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন
অনেকের মনে হয়, তিনি হয়তো নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন, পাগল হয়ে যাচ্ছেন কিংবা কিছু একটা ভয়ংকর ঘটতে চলেছে। এই চিন্তাই আবার আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়
হঠাৎ বুক ধড়ফড় করতে শুরু করে, হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়। শরীরের স্বাভাবিক ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে মনে হতে পারে, হয়তো হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে।
মৃত্যুভয় চেপে বসে
‘আমি কি মারা যাচ্ছি?’—এমন ভয় প্যানিক অ্যাটাকের অন্যতম ভীতিকর অভিজ্ঞতা। অনেকের মনে হয়, খুব খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে কিংবা মৃত্যু একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে
প্যানিক অ্যাটাকের সময় শ্বাস দ্রুত হয়ে যেতে পারে। বুক ভারী লাগা, দম নিতে কষ্ট হওয়া কিংবা দম বন্ধ হয়ে আসছে—এমন অনুভূতিও হতে পারে।
মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা
মাথা হালকা লাগা, দুর্বলতা, শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে। কারও কারও হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা অবশভাবও দেখা দিতে পারে।
ঘাম ও শরীর কাঁপা
হঠাৎ প্রচুর ঘাম হতে পারে। হাত-পা বা পুরো শরীর কাঁপতে পারে। একই সঙ্গে শরীর দুর্বল ও অস্থির মনে হতে পারে।
গরম বা ঠান্ডা লাগা
কখনো শরীর হঠাৎ গরম হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়, আবার কখনো প্রচণ্ড ঠান্ডা বা কাঁপুনি অনুভূত হতে পারে।
বমিভাব বা পেটে অস্বস্তি
প্যানিক অ্যাটাকের সময় বমি বমি ভাব, পেটে অস্বস্তি বা পেটব্যথাও হতে পারে।
বুকে ব্যথা বা চাপ
এটি সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। কারণ বুকের ব্যথা বা চাপকে অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বুকে ব্যথা হলে সেটিকে নিজে থেকে প্যানিক অ্যাটাক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ একই ধরনের উপসর্গ অন্য শারীরিক সমস্যার কারণেও হতে পারে। বিশেষ করে প্রথমবার এমন হলে বা উপসর্গ নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

এই সময় কি করা যায় কিছুই বুঝে উঠা যায়না। ছবি: পিন্টারেস্ট ডট কম
কেন হয় প্যানিক অ্যাটাক?
প্যানিক অ্যাটাকের একক কোনো কারণ নেই। গবেষণায় দেখা যায়, বংশগত প্রবণতা, দীর্ঘস্থায়ী বা বড় ধরনের মানসিক চাপ, শরীরের শারীরিক অনুভূতির প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা এবং মস্তিষ্কের ভয় ও উদ্বেগ-সম্পর্কিত কিছু প্রক্রিয়া এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

এটি একটি চক্রের মতো। ছবি: এ আই
বংশগত প্রভাব
পরিবারে প্যানিক ডিসঅর্ডার বা এ ধরনের উদ্বেগজনিত সমস্যা থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে পরিবারের কারও এই সমস্যা থাকলেই যে অন্য সদস্যেরও হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মানসিক চাপ
জীবনের বড় ধরনের চাপ বা দীর্ঘদিনের স্ট্রেস প্যানিক অ্যাটাকের অন্যতম সম্ভাব্য কারণ বা ট্রিগার হতে পারে। কর্মক্ষেত্রের চাপ, সম্পর্কের সমস্যা, আর্থিক দুশ্চিন্তা কিংবা জীবনের বড় কোনো পরিবর্তন—সবই মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
শরীরের অনুভূতির প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা
কেউ কেউ শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন—যেমন হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা শ্বাস একটু দ্রুত হওয়া—খুব তীব্রভাবে অনুভব করেন। সেই অনুভূতিকে বিপদের সংকেত মনে হলে ভয় আরও বাড়তে পারে। ফলে ভয়, শারীরিক উপসর্গ এবং আরও ভয়—এভাবে একটি চক্র তৈরি হতে পারে।
‘আবার যদি হয়’—এই ভয়
একবার প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার পর অনেকের মনে নতুন একটি ভয় তৈরি হয়—‘আবার যদি হয়?’
এই আশঙ্কা ধীরে ধীরে এতটাই বড় হয়ে উঠতে পারে যে, কেউ কেউ এমন জায়গা বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে শুরু করেন যেখানে আগে প্যানিক অ্যাটাক হয়েছিল।
ফলে তৈরি হতে পারে এক ধরনের ‘ভয়ের ভয়’—অর্থাৎ প্যানিক অ্যাটাকের চেয়েও পরবর্তী অ্যাটাকের আশঙ্কাই জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
ঘুমের মধ্যেও কি প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে?
হ্যাঁ, পারে। একে বলা হয় নক্টার্নাল বা রাতের প্যানিক অ্যাটাক। ভাবুন, গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ আপনার ঘুম ভেঙে গেল। বুক ধড়ফড় করছে, শরীর ঘামে ভিজে গেছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে—অথচ কেন এমন হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছেন না। চারপাশ অন্ধকার। আর সেই মুহূর্তে অজানা ভয়টা আরও তীব্র মনে হতে পারে। রাতের প্যানিক অ্যাটাকে সাধারণত দিনের প্যানিক অ্যাটাকের মতোই লক্ষণ দেখা যায়—হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘাম, কাঁপুনি, শ্বাসকষ্ট, বুকে অস্বস্তি, মাথা ঘোরা, বমিভাব কিংবা প্রচণ্ড আতঙ্ক।
রাতের প্যানিক অ্যাটাকের সঠিক কারণ সবসময় জানা যায় না। তবে জেনেটিক প্রবণতা, মানসিক চাপ এবং মস্তিষ্কের ভয়-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, অ্যাজমা বা থাইরয়েডের মতো শারীরিক সমস্যাও একই ধরনের উপসর্গ তৈরি করতে পারে।
তাই ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, হাঁসফাঁস করে জেগে ওঠা কিংবা এ ধরনের সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্যানিক অ্যাটাক হলে কী করবেন?
আতঙ্কের মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আতঙ্ককে আরও বাড়তে না দেওয়া। যদি সম্ভব হয়, নিরাপদ জায়গায় থাকুন। ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করুন। নিজেকে মনে করিয়ে দিন—
‘আমি ভয় পাচ্ছি, কিন্তু এই অনুভূতিটা কেটে যাবে।’
নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন এবং মনে করুন যে প্যানিক অ্যাটাকের উপসর্গ সাধারণত সময়ের সঙ্গে কমে আসে। NHS-ও প্যানিক অ্যাটাকের সময় ধীরে শ্বাস নেওয়া, নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া যে অ্যাটাকটি কেটে যাবে এবং শান্ত কোনো কিছুর দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
তবে শুধু নিজেকে বোঝালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
যদি বারবার প্যানিক অ্যাটাক হয়, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, ঘুমে সমস্যা হয় কিংবা সবসময় ‘আবার যদি হয়’ ধরনের ভয় কাজ করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

একবার প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার পর অনেকের মনে নতুন একটি ভয় তৈরি হয়। ছবি: পিন্টারেস্ট ডট কম
চিকিৎসা কি আছে?
অবশ্যই আছে। প্যানিক ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় সাইকোথেরাপি, বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি (CBT) বহুল ব্যবহৃত এবং কার্যকর একটি পদ্ধতি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধও দিতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে শুধু থেরাপি, আবার কারও ক্ষেত্রে থেরাপি ও ওষুধ—দুই ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। নিয়মিত ঘুম, শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং কাছের মানুষের সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়াও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে এগুলো চিকিৎসার বিকল্প নয়।
শেষ কথা
প্যানিক অ্যাটাকের অভিজ্ঞতা সত্যিই ভয়ংকর হতে পারে। সেই মুহূর্তে মনে হতে পারে—‘আমি হয়তো আর সামলাতে পারব না।’ কিন্তু এই অনুভূতিটা যতটা ভয়ংকর, তার অর্থ এই নয় যে আপনি সত্যিই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। নিজের শরীর ও মনের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া, ভয়কে বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সাহায্য নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আর একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে—বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক উপসর্গকে কখনোই নিজে থেকে শুধু ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ, যুক্তরাষ্ট্র
মায়ো ক্লিনিক, যুক্তরাষ্ট্র
মায়ো ক্লিনিক, যুক্তরাষ্ট্র
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, যুক্তরাষ্ট্র
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS), যুক্তরাজ্য
