প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬। ০১:১২ পিএম
আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬। ১৩:৫২ পিএম
ভারতের গ্রেট নিকোবর প্রকল্প নিয়ে অনেকদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। কারণ এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বন্দর, বেসামরিক উন্নয়ন ও সামরিক কৌশল; এই তিনটি স্তরকে একসঙ্গে যুক্ত করছে।
গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সর্বদক্ষিণে, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝামাঝি অঞ্চলে অবস্থিত। এর সবচেয়ে বড় কৌশলগত বৈশিষ্ট্য হলো মালাক্কা প্রণালির খুব কাছে অবস্থান। হরমুজের পর মালাক্কা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল-বাণিজ্য ‘চোকপয়েন্ট’। অর্থাৎ এমন একটি সরু সামুদ্রিক পথ, যেখানে জাহাজ চলাচলে বড় বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রবাহে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়ে।
প্রকল্পটির আওতায় তৈরি হবে একটি ট্রান্সশিপমেন্ট হাব, বেসামরিক ও সামরিক বিমানবন্দর, গ্যাস ও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নতুন একটি টাউনশিপ। ‘ট্রান্সশিপমেন্ট হাব’ হলো এমন একটি বন্দর, যেখানে এক জাহাজ থেকে কনটেইনার নামিয়ে অন্য জাহাজে তুলে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীকে নিয়ে গঠিত যৌথ সামরিক কমান্ড আগে থেকেই রয়েছে। নতুন অবকাঠামো সেই বিদ্যমান সামরিক কাঠামোকে আরও স্থায়ী ও শক্তিশালী করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন ধাপে ২০৪৭ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হবে। সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার।
প্রকল্পটি অবশ্য শুরু থেকেই বিতর্কের বাইরে নয়। ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রকল্পটির ট্রান্সশিপমেন্ট হাব কতটা কার্যকর হবে, পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; এসব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারত সরকার পাল্টা যুক্তি হিসেবে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের অনুমোদনের কথা বলেছে। এমনকি সরকারি প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর প্রকাশিত ব্যাখ্যামূলক নথিতেও পরিবেশগত উদ্বেগ নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি জায়গা দেওয়া হয়েছে।
গ্রেট নিকোবরের গুরুত্ব বোঝার জন্য এর অর্থনৈতিক যুক্তিটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত চায় কলম্বো ও সিঙ্গাপুরের মতো বড় গভীর সমুদ্রবন্দরের ওপর নির্ভরতা কমাতে। কেরালার ভিঝিনজামে ইতোমধ্যে নতুন বন্দর তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যত বড় হবে, অতিরিক্ত বন্দর সুবিধার প্রয়োজনও তত বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়াগামী বৈশ্বিক কনটেইনার ও জাহাজ চলাচলের পথে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এই ক্ষেত্রে বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে।
আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্দরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি। চীন ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে পূর্ব আফ্রিকা, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে বিভিন্ন বন্দর উন্নয়ন করেছে। এমন এক সময়ে, যখন পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতাও কৌশলগত চাপের উপকরণ হয়ে উঠছে, নয়াদিল্লি নিজস্ব বিকল্প কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে।
দক্ষিণে ভিঝিনজাম, পশ্চিমে ভাধভান ও পূর্বে গ্রেট নিকোবর; এই তিনটি বন্দর ভারতের ভিন্ন ভিন্ন অংশকে সেবা দেবে। এগুলো ‘মেরিটাইম ভিশন ২০৩০’ ও ‘সাগরমালা’ উদ্যোগের সঙ্গেও মিল রয়েছে, যেগুলো বন্দরনির্ভর অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়। গভীর সমুদ্রবন্দরের এই নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতের ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ইরান যুদ্ধের পর মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রবাহের বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। চীনা কৌশলবিদরা বহু বছর ধরে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নিয়ে আলোচনা করছেন। এই ধারণাটি মূলত চীনের সেই উদ্বেগকে বোঝায়, যেখানে দেশটির বিপুল বাণিজ্য ও জ্বালানি আমদানি একটি সরু সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরশীল। কোনো সংঘাত বা অবরোধে মালাক্কা বন্ধ হয়ে গেলে চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চাপে পড়তে পারে।
বেইজিং এই ঝুঁকি কমানোর জন্য চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর বা সিএমইসির মতো উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলোর উদ্দেশ্য বিকল্প স্থল ও সামুদ্রিক পথে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং মালাক্কার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো। গ্রেট নিকোবর প্রকল্প মালাক্কা প্রণালির প্রবেশমুখের কাছে ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে আরও মজবুত করবে।
এই প্রণালি দিয়ে শুধু চীনা বাণিজ্যিক জাহাজ নয়, পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির জাহাজও ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। চীনের গোয়েন্দা জাহাজগুলোও নিয়মিত এই অঞ্চলে চলাচল করে এবং সামরিক কার্যক্রম ও পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।
জিবুতিতে চীনের সামরিক ঘাঁটি এবং গোয়াদরের মতো বেসামরিক ও সামরিক; দুই কাজে ব্যবহারযোগ্য ‘ডুয়াল-ইউজ’ স্থাপনা ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। চীনা গোয়েন্দা জাহাজ মালাক্কা পথ ব্যবহার করে ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মতো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের দৃষ্টিতে চীন একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। দুই দেশের সীমান্ত বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কের উত্তেজনা কিছুটা কমলেও চীনকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ কমেনি। বরং গ্রেট নিকোবর প্রকল্প মালাক্কা প্রণালি পর্যবেক্ষণ ও নজরদারিতে ভারতের সক্ষমতা বাড়াবে।
কোনো বড় সংকট তৈরি হলে ভারত তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে; যেমন ইরান তার নিজস্ব ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত হিসাবের অংশ করে। একই সঙ্গে গ্রেট নিকোবর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গভীরে ভারতের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি ‘ফরোয়ার্ড অপারেটিং বেস’ হিসেবে কাজ করতে পারে। ফরোয়ার্ড অপারেটিং বেস বলতে মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে এমন সামরিক ঘাঁটিকে বোঝায়, যেখান থেকে দ্রুত অভিযান, নজরদারি বা প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো যায়।
ভারত মহাসাগরে দূরবর্তী দ্বীপে বড় শক্তির সামরিক উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ডিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহার করে। দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত মহাসাগরে ফ্রান্সের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ক্রিসমাস ও কোকোস দ্বীপপুঞ্জ। সেই ধারায় গ্রেট নিকোবরও ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থান হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, গ্রেট নিকোবর প্রকল্প ভারতের জন্য শুধু নতুন বন্দর বা টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনা নয়। এটি অর্থনীতি, সামুদ্রিক বাণিজ্য, চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতিকে এক জায়গায় আনার একটি বৃহৎ পরিকল্পনা।
