Logo
Logo
×
শিল্পী নেই, পাপেটগুলো এখনো কথা বলে

ভিজ্যুয়াল ।  আর্ট-রিভিউ

শিল্পী নেই, পাপেটগুলো এখনো কথা বলে

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৪:৪৩ পিএম

আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৬:৫৩ পিএম

ধানমণ্ডির পাপেট বাড়িতে রয়ে গেছে সারি সারি মুখ, পারুল-বাউল, পুরোনো যন্ত্রপাতি, অসমাপ্ত ‘বীরপুরুষ’ আর একটি ফাঁপা ষাঁড়। মুস্তাফা মনোয়ার নেই, কিন্তু ঘরটি এখনো ধরে রেখেছে তার শিল্পভাষা ও সৃষ্টির প্রক্রিয়া।

ধানমণ্ডির যে বাড়িতে মুস্তাফা মনোয়ার থাকতেন, তার দোতলার একটি ঘরে এখনো বাস করে তার তৈরি পাপেটেরা। ঘরে ঢুকলেই প্রথমে চোখ আটকে যায় দেয়ালজুড়ে সাজানো মুখের সারিতে। শিশু, বৃদ্ধ, মানুষ কিংবা পশু-পাখি—কোনো মুখ হাসছে, কোনোটি বিস্মিত, কোনোটি রাগী, আবার কোনো মুখ হাঁ করে আছে যেন একটু পরেই কথা বলে উঠবে।

নীল রঙের বোর্ডজুড়ে সাজানো অন্তত ৫০টি পাপেট-মুখের প্রত্যেকটির অভিব্যক্তি আলাদা। রং, চোখ, ঠোঁট কিংবা মুখের গড়নের সামান্য পরিবর্তনেই একেকটি মুখ হয়ে উঠেছে একেকটি চরিত্র।

এখানেই মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেটশিল্পের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে—জড় বস্তুকে শুধু আকৃতি দেওয়া নয়, তাকে একটি ব্যক্তিত্ব দেওয়া।

ধানমণ্ডির পাপেট বাড়িতে দেয়ালজুড়ে সাজানো নানা অভিব্যক্তির পাপেট-মুখ। রং, ভঙ্গি ও মুখের গড়নে প্রতিটি চরিত্র পেয়েছে আলাদা পরিচয়। ছবি: বিডি নিউজ ২৪

ঘরের আরেক দিকে তাকালেই শিল্পের ফলাফলের পাশাপাশি দেখা যায় তার নির্মাণপ্রক্রিয়া।

কাঠের আলমারি, টেবিল, হাতিয়ার, ছেনি, স্ক্রু-ড্রাইভার, তার, রং, তুলি এবং ঝুলে থাকা অসম্পূর্ণ পাপেটদেহ—সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটি একই সঙ্গে কর্মশালা ও সংরক্ষণাগার।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে নিজের বাসভবনেই এই ‘পাপেট বাড়ি’ গড়ে তুলেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। এখানে রয়েছে ৫১টি সম্পূর্ণ ও ৩০টি অসম্পূর্ণ পাপেট।

দীর্ঘদিন নানা রোগে ভোগার পর রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৯ জুন মারা যান এই সব্যসাচী শিল্পী। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

তার চলে যাওয়ার পরও কর্মশালাটি প্রায় আগের অবস্থাতেই রয়েছে।

ঝুলন্ত পাপেট, কাঠের আলমারি, পুরোনো সরঞ্জাম আর টেবিলে পড়ে থাকা ষাঁড়ের শরীর—পাপেটঘরটি এখনো ধরে রেখেছে একটি সচল কর্মশালার চিহ্ন। ছবি: বিডি নিউজ ২৪

যন্ত্রগুলোও যেন শিল্পের অংশ

পাপেটঘরের এক কোণে রয়েছে পুরোনো লেদ মেশিন। পাশে নানা আকৃতির ধাতব ও কাঠের হাতিয়ার। দেয়ালের বোর্ডে সারি করে ঝোলানো রেঞ্চ, নিচে ছোট-বড় যন্ত্রাংশ। মাঝখানে ঝুলে আছে কমলা রঙের পুরোনো ডেস্ক-ল্যাম্প।

এসব যন্ত্র দেখে বোঝা যায়, মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট কেবল আঁকা কিংবা কাপড় দিয়ে বানানো চরিত্র ছিল না। এর পেছনে ছিল কাঠ, ধাতু, যান্ত্রিক সংযোগ, জয়েন্ট এবং নড়াচড়ার দীর্ঘ কারিগরি প্রক্রিয়া।

একটি মুখের অভিব্যক্তির মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার শরীর কীভাবে নড়বে, হাত-পা কীভাবে চলবে কিংবা মঞ্চে চরিত্রটি কীভাবে প্রাণ পাবে।

পুরোনো লেদ মেশিন, দেয়ালে সাজানো হাতিয়ার আর কমলা ডেস্ক-ল্যাম্প—পাপেট তৈরির শিল্পের পেছনে থাকা কারিগরি জগতের একটি অংশ। ছবি: বিডি নিউজ ২৪

অপেক্ষায় থাকা ষাঁড়

এই ঘরের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যগুলোর একটি—এক পাশে শুয়ে থাকা একটি ষাঁড়ের শরীর।

ভেতরটা ফাঁপা। শরীরের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানো, কিন্তু তাকে দেখে সম্পূর্ণ মনে হয় না। চারদিকে পাপেট তৈরির সরঞ্জাম ছড়িয়ে আছে।

মনে হয়, নির্মাণের মাঝপথে কাজ থেমে গেছে।

এই অসম্পূর্ণতাই ছবিটিকে অন্য অর্থ দেয়। শিল্পী আর ফিরে আসবেন না, অথচ যে পাপেটটি তার হাতে আরেকটু এগিয়ে যেতে পারত, সেটি একই জায়গায় পড়ে আছে।

পাপেটঘরে পড়ে থাকা ফাঁপা ষাঁড়ের শরীর। অসম্পূর্ণ অবয়বটি যেন এখনো অপেক্ষা করছে নির্মাতার শেষ স্পর্শের। ছবি: বিডি নিউজ ২৪

টেবিলের চারপাশে পুরোনো তুলি, ছেনি, রঙের কৌটা, কাটাকাটির সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন পাপেটের অংশ ছড়িয়ে আছে। দেয়াল ও আলমারিতে ঝুলছে অসম্পূর্ণ দেহ ও মুখ।

এই দৃশ্যটি পাপেট বাড়িকে কেবল স্মৃতির জায়গা হতে দেয় না। বরং মনে করিয়ে দেয়—এটি ছিল নিয়মিত কাজের জায়গা, যেখানে চরিত্রের ধারণা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত তাকে মঞ্চে তোলার প্রস্তুতি চলত।

কাঠের আলমারি, ঝুলে থাকা অসম্পূর্ণ পাপেট আর টেবিলভর্তি হাতিয়ার—এই ঘরেই একসময় চলত চরিত্র নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়া। ছবি: বিডি নিউজ ২৪

পারুল: একটি চরিত্রের চেয়েও বেশি

১৯৯৪ সালে মুস্তাফা মনোয়ার শুরু করেন শিক্ষামূলক পাপেট অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’। সেখানে তার তৈরি ‘পারুল’ চরিত্রটি তাকে সম্বোধন করত ‘শিল্পী ভাই’ বলে।

সেই থেকে কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরের কাছে মুস্তাফা মনোয়ার হয়ে ওঠেন ‘শিল্পী ভাই’।

পারুল চরিত্রে কাজ করা তামান্না তিথির ভাষায়, পারুল ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের অনুভূতিরই একটি প্রাণবন্ত রূপ।

চরিত্রটির পেছনে শিল্পীর ভাবনা ছিল—মেয়েটি যেন পুরো বাংলাদেশের ঘুম ভাঙায়; তার মধ্যে ফুটে উঠবে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিবাচক দিকগুলো।

সহজ-সরল কথায় তৈরি পারুল তাই নিছক একটি পাপেট হয়ে থাকেনি। চরিত্রটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক।

পাপেটকে কেবল বিনোদনের বস্তু না বানিয়ে তার মধ্যে বক্তব্য, জীবনবোধ ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার প্রবণতাই মুস্তাফা মনোয়ারের কাজকে আলাদা করেছে।

শিল্পী ও পাপেট চরিত্রের মুখোমুখি মুহূর্ত। পাপেটকে শুধু দৃশ্যমান অবয়ব নয়, সংলাপ ও অনুভূতির চরিত্র হিসেবেই গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ছবি: বিডি নিউজ ২৪

তামান্না তিথির স্মৃতিতে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি প্রতিনিয়ত নতুন কিছু তৈরি করতেন।

শুধু পাপেট বানানো নয়—পাপেটের কণ্ঠ, সুর, মঞ্চ, চিত্রনাট্য—সবকিছুতেই তিনি যুক্ত থাকতেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, পাপেট শুধু আনন্দের বস্তু নয়; এর ভেতরে গভীর অর্থ ও জীবনবোধ থাকতে পারে।

শিল্প নিয়ে তার একটি কথা এখনো শিষ্যদের মনে আছে—

“বলা যাবে না শিল্প এখানেই শেষ, কোনো নিয়ম নেই, নিয়ম ভাঙাটাই শিল্প।”

এই কথাটি তার পাপেটগুলোর দিকে তাকালেও বোঝা যায়। লোকজ পুতুলের স্মৃতি আছে, আবার আছে আধুনিক মঞ্চ, যান্ত্রিক নড়াচড়া, টেলিভিশন এবং শিক্ষামূলক গল্পের ভাষাও।

পারুল, বাউল ও ষাঁড়সহ বিভিন্ন পাপেট চরিত্রের সঙ্গে শিল্পী। ছবি: বিডি নিউজ ২৪

অসম্পূর্ণ ‘বীরপুরুষ’

পাপেটঘরের একটি কাঠের আলমারির দরজায় এখনো সাঁটা রয়েছে হাতে লেখা কয়েকটি কাগজ।

কোথাও লেখা ‘চলচ্চিত্র বীরপুরুষ’, কোথাও পাপেটের অংশগ্রহণের পরিকল্পনা, আবার কোথাও ‘চিত্রনাট্য’ শিরোনামের নিচে চরিত্রের নাম, সংখ্যা ও বয়স ধরে তালিকা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ কবিতা অবলম্বনে পাপেট ও মানুষের যৌথ অভিনয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

বাউল চরিত্রের শিল্পী অনুকূল দাস জানিয়েছেন, চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে পাপেট চরিত্র তৈরির কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজটি শেষ করতে পারেননি মুস্তাফা মনোয়ার।

হাতে লেখা পরিকল্পনার সামনে ঝুলছে একটি অসম্পূর্ণ পাপেট। ‘বীরপুরুষ’ চলচ্চিত্রের মতোই কিছু স্বপ্ন রয়ে গেছে নির্মাণের মাঝপথে। ছবি: বিডি নিউজ ২৪

অনুকূল দাস ছাত্রজীবন থেকেই মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৩০ বছরের বেশি সময় তিনি শিল্পীর সঙ্গে ছিলেন।

চারুকলায় পড়ার সময় থেকেই পাপেট নিয়ে কাজ শুরু করেন।

শারীরিকভাবে সামান্য চলাফেরার সক্ষমতা থাকলেও মুস্তাফা মনোয়ার স্টুডিওতে চলে আসতেন। কাজের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। নিজের মনমতো না হলে কাজ আবার নতুন করে শুরু করতেন।

তার তৈরি একশর বেশি পাপেট ও নানা যন্ত্রপাতি এখনো এই ঘরে রয়েছে বলে জানিয়েছেন অনুকূল।

তার চাওয়া, শিল্পী চলে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি যেন বন্ধ হয়ে না যায়।

‘বীরপুরুষ’-এর অসমাপ্ত কাজ নিয়েও তার আশা আছে। কেউ উদ্যোগ নিলে মুস্তাফা মনোয়ারের শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় এটি সম্পন্ন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

শিল্পী নেই, শিষ্যরা আছেন

মুস্তাফা মনোয়ার যখন শারীরিক অসুস্থতার কারণে সব কাজ নিজে করতে পারতেন না, তখন তার শিক্ষার্থীরাই অনেক দায়িত্ব নিতে শুরু করেন।

পাপেট রুমের দায়িত্বে থাকা শিল্পী সোহেল জানিয়েছেন, মুস্তাফা মনোয়ার বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা করিয়েছেন।

মৃত্যুর আগের প্রায় তিন বছর অসুস্থতার কারণে তিনি নিয়মিতভাবে পাপেটঘর দেখাশোনা করতে পারেননি। সেই সময় থেকেই শিষ্যরা তার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

সোহেলের প্রত্যয়—এই শিল্পকে বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।

এই জায়গাতেই পাপেট বাড়ির ভবিষ্যতের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কারণ পাপেট এমন একটি শিল্প, যেখানে কেবল বস্তুটি সংরক্ষণ করলেই সবকিছু সংরক্ষিত হয় না। এর সঙ্গে থাকে নির্মাণকৌশল, নড়াচড়া, কণ্ঠ, অভিনয়, মঞ্চ এবং গল্প বলার পদ্ধতি।

তাই মুস্তাফা মনোয়ারের উত্তরাধিকার বাঁচাতে হলে পাপেটের পাশাপাশি এই জ্ঞানও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হবে।

পাপেট কি জাদুঘরে যাবে

মুস্তাফা মনোয়ারের ছেলে সাদাত মনোয়ার চান, তার বাবার তৈরি পাপেট এবং পাপেট তৈরির প্রযুক্তি যেন হারিয়ে না যায়।

মৃত্যুর আগে নিজের সংগ্রহশালা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দিয়ে যাননি মুস্তাফা মনোয়ার।

সাদাতের ভাষায়, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ইতিবাচক মানুষ। নিজের চলে যাওয়া কিংবা নিজের কাজের ‘শেষ’ নিয়ে কথা বলতেন না।

তবে পরিবারের ইচ্ছা, সারাজীবনে তৈরি পাপেটগুলোর অন্তত কয়েকটি কোনো উপযুক্ত জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেগুলো দেখতে পারে।

শুধু পাপেট নয়, সেগুলো তৈরির কৌশল ও প্রযুক্তিও শিষ্যদের কাছে যথাযথভাবে হস্তান্তর করা দরকার বলে মনে করেন সাদাত।

অর্থাৎ সংরক্ষণের প্রশ্নটি এখানে দুই ধরনের—একটি হলো শিল্পবস্তু সংরক্ষণ, অন্যটি শিল্প তৈরির জ্ঞান সংরক্ষণ।

শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেও পাপেট

সাদাত মনোয়ার মনে করেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পাপেটকে কার্যকর শেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তার মতে, আনন্দের মাধ্যমে শেখার যে ঘাটতি রয়েছে, সেখানে পাপেট একটি শক্তিশালী ‘লার্নিং টুল’ হতে পারে।

শিশু যদি আনন্দের সঙ্গে শেখে, সেই শিক্ষা আরও কার্যকর হয়।

এই ধারণাটি মুস্তাফা মনোয়ারের নিজের কাজের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিল। পারুল কিংবা তার অন্য চরিত্রগুলো শুধু দর্শককে আনন্দ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি; তাদের দিয়ে কথা বলা হয়েছে সমাজ, জীবন ও শিক্ষার নানা বিষয় নিয়ে।

গ্রামবাংলার পুতুল থেকে আধুনিক পাপেট

ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচ মুস্তাফা মনোয়ারকে আকৃষ্ট করেছিল।

পরে কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পাপেট দেখেন। পাপেট নিয়ে বহু দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন।

নিজের পাপেট দলের পাশাপাশি বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ‘ধনমিয়া’কে নিয়ে তিনি মস্কো ও তাসখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের লোকজ পাপেট প্রশংসিত হয়।

১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফী তার একটি প্রামাণ্যচিত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট অন্তর্ভুক্ত করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে থাকা আতঙ্কিত শিশুদের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিতে সেখানেই পাপেট শোর আয়োজন করেছিলেন তিনি।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিল্পজগতে পাপেটকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেন।

তার তৈরি ‘পারুল’ চরিত্র দেখে ইউনিসেফের র‌্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন; পরে তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্র।

টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত দেখা যেত তার তৈরি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’।

লোকজ পুতুলনাচ থেকে টেলিভিশন, শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ—পাপেটকে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়ে গিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

শত মুখে রয়ে গেছে এক শিল্পীর কল্পনা

পাপেটঘরের দেয়ালে আবার ফিরে তাকালে বোঝা যায়, এখানে একই ধরনের চরিত্র বারবার তৈরি হয়নি।

একটি মুখে বিদ্রূপ, অন্যটিতে ভয়; কোথাও সরলতা, কোথাও কৌতুক, কোথাও আবার অতিরঞ্জিত চোখ-মুখ।

মানুষের মুখের বাস্তব অনুকরণ করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে অভিব্যক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছেন মুস্তাফা মনোয়ার। ফলে মঞ্চে দূর থেকেও একটি চরিত্রের মেজাজ দর্শকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই মুখগুলোর মধ্যেই যেন তার বহু বছরের পর্যবেক্ষণ, কৌতুকবোধ ও চরিত্র নির্মাণের ভাষা জমা আছে।

শিল্পী নেই, সৃষ্টির ঘরটি জেগে আছে

ধানমণ্ডির পাপেট বাড়িতে তাই শুধু কয়েকটি পুরোনো পুতুল সংরক্ষিত নেই।

এখানে একই সঙ্গে আছে শিল্পীর সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ কাজ, পুরোনো যন্ত্রপাতি, চরিত্র তৈরির নকশা, হাতে লেখা চলচ্চিত্র পরিকল্পনা এবং শিষ্যদের স্মৃতি।

এক পাশে পড়ে থাকা ষাঁড়টি অসম্পূর্ণ। ‘বীরপুরুষ’ও শেষ হয়নি।

অথচ পারুল, বাউল, বাঘা কিংবা মেনির মতো চরিত্র বহু আগেই দর্শকের স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।

একদিকে সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া চরিত্র, অন্যদিকে থেমে থাকা নির্মাণ—এই বৈপরীত্যই পাপেট বাড়িটির সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যগুলোর একটি।

মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। কিন্তু একটি শিল্পী কীভাবে নিজের তৈরি চরিত্র, ব্যবহৃত সরঞ্জাম, অসমাপ্ত পরিকল্পনা এবং শিষ্যদের হাতের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারেন—এই পাপেটঘর যেন তারই দৃশ্যমান দলিল।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে