প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ এএম
জয়নুল আবেদিন: শিল্পে মানুষের জীবন, ক্ষুধা ও প্রতিবাদ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৬:০৮ পিএম
আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৫:৫৯ পিএম
- শেয়ার
- Messenger
- Telegram
- Threads
১৯৭১ সালে মনপুরা '৭০ পেইন্টিং তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর
জয়নুল আবেদিনের শিল্পের কেন্দ্রে ছিল মানুষ এবং তার জীবন, সংগ্রাম ও মর্যাদা। বাংলার প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য থেকে দুর্ভিক্ষের নির্মম বাস্তবতা, তাঁর কালি-তুলিতে উঠে এসেছে মানুষের বিপন্নতা ও অদম্য শক্তি। শিল্পকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা এবং সমাজে পরিবর্তন আনার আকাঙ্ক্ষা তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও শিল্পশিক্ষার উদ্যোগকে এক সুতোয় বেঁধেছে।
'নিজের শিল্পকর্ম সৃষ্টির চেয়েও সমাজে শিল্পের লালন দেখতে পাওয়া আমাকে বেশি আনন্দ দেয়। শিল্পকে সর্বব্যাপী, দৈনন্দিন চর্চায় পরিণত করা উচিত।'জয়নুল আবেদিন

স্কিরা এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ প্রকাশনায় ‘গ্রেট মাস্টার্স অব জয়নুল আবেদিন বইটির প্রচ্ছদ’।
রোজা মারিয়া ফালভো সম্পাদিত এবং মিলানের স্কিরা ও ঢাকার বেঙ্গল ফাউন্ডেশন যৌথভাবে প্রকাশিত এই বইটি এখন পর্যন্ত জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্মের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা। বাংলাদেশের মহান শিল্পীদের নিয়ে বিশ্বের প্রথম প্রকাশনা ধারাবাহিক ‘গ্রেট মাস্টার আর্টিস্টস অব বাংলাদেশ’-এর দ্বিতীয় খণ্ড এটি। জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প আন্দোলনের স্থপতি, যাঁকে শ্রদ্ধাভরে ‘শিল্পাচার্য’ বা ‘শিল্পের গুরু’ বলা হয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় প্রথম সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। শিল্পশিক্ষার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, দূরদর্শিতা ও শৈল্পিক অর্জনের কারণে তিনি বরাবরই বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পজগতের অবিসংবাদিত প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। আবুল মনসুর, নজরুল ইসলাম ও আবুল হাসনাতের প্রবন্ধসমৃদ্ধ বইটিতে জয়নুল আবেদিনের প্রায় ৪০ বছরের শিল্পকর্ম তুলে ধরা হয়েছে। ২০০টিরও বেশি রঙিন ও সাদাকালো চিত্রের মধ্য দিয়ে নিজ দেশের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ককে নানা শৈল্পিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছে। সুন্দর ও যুগান্তকারী এই গ্রন্থ তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে এমন এক সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে বোঝার উৎকৃষ্ট দৃষ্টিকোণ দেয়, যা পশ্চিমে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়েছে, এমনকি ভুলভাবে বোঝা হয়েছে। আবেদিনের মানবিক অবস্থান ও শিল্পের প্রতি অঙ্গীকার বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পীদের একটি পুরো প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছে।

১৯৫৩ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘দুই বোন’। ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।

১৯৫৫ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘নৌকা টানা’। ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।
-6ab4e87969887.jpg)
১৯৭৩ সালে ঢাকার স্টুডিওতে জয়নুল আবেদিন। ছবি: আমানুল হক।
দার্শনিক দৃষ্টিতে জয়নুল আবেদিনের ভাবনার কেন্দ্রে ছিল সাধারণ মানুষের দুর্দশা। এই অসাধারণ শিল্পী, শিক্ষক ও মানবতাবাদী চেয়েছিলেন, শিল্প যেন শিক্ষার সর্বস্তরে জায়গা পায় এবং সব স্তরের মানুষের জীবনকে স্বীকৃতি দেয়। অন্য শিল্পী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করতে নিজের কর্মজীবনকে পেছনে রেখে আবেদিন শিল্পজগতে পরিবর্তন আনার ব্যক্তিগত স্বপ্ন নিজের জীবনেই বাস্তবায়ন করেছিলেন। সহজাত প্রতিভা ও পরিস্থিতির দায় বহন করে তিনি নিজের স্বর খুঁজে নেওয়া এবং সেই স্বরকে সম্মিলিত সংগীতে স্থান দেওয়ার উপায় অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এভাবেই তিনি সমাজে অংশগ্রহণের নতুন পথ খুলে দিয়েছিলেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া আবেদিনের মধ্যে জীবিকার জন্য সংগ্রামরত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল। ১৯৩৮ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে তাঁর নিয়োগ বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের ‘অবতার’ হয়ে ওঠার পথ তৈরি করে দেয়।
প্রাকৃতিক জগতের সঙ্গে শিল্পীর অন্তরঙ্গ সংযোগও স্পষ্ট। প্রকৃতির সৃষ্টিশীল, ধ্বংসাত্মক ও পুনর্জীবনদায়ী শক্তির গভীর পর্যবেক্ষণ ফুটে উঠেছে তাঁর সমগ্র শিল্পকর্মে। হিমালয়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শ্বাসরুদ্ধকর তুষারঢাকা ভূদৃশ্য দেখার এবং পাহাড় ও সমুদ্রের মাঝখানে বিস্তৃত বিশাল প্লাবনভূমি আবিষ্কারের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বাংলা যেন পৃথিবীর ঝরনার মুখ, কারণ হিমালয় থেকে নেমে আসা প্রায় সব পানিই এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। প্রতি বসন্তে তুষার ও বরফ গলে ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তৈরি করে নদী, যা ছুটে চলে সমুদ্রের দিকে। পৃথিবীর বৃহত্তম ‘সবুজ বদ্বীপ’ গড়ে ওঠার এই অনন্ত প্রক্রিয়াই সৃষ্টি করেছে সেই ঝলমলে ভূখণ্ড, যাকে আমরা আজ বাংলাদেশ বলে জানি। দক্ষিণ দিক থেকে অসংখ্য নদী এসে মিশেছে মহান গঙ্গায়। ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যেখানে নদীটি পদ্মা নামেও পরিচিত। এরপর এটি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। উত্তরের মহিমান্বিত ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি তিব্বতে, যেখানে এর নাম ইয়ারলুং সাংপো। লাসা পেরিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্ব কোণ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে এসে নদীটি উত্তর বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যেখানে এটি যমুনা নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের মতো অনন্য একটি দেশে পানি—নদী, বৃষ্টি ও সমুদ্রের ভূমিকাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। শীতকালে প্রকৃতিমাতাকে শান্ত মনে হয়; নদী সংকুচিত হয়, আকাশ নীল থাকে এবং নোনা পানি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে। গ্রীষ্মে প্রকৃতি খেয়ালি হয়ে ওঠে, ভূমি নেয় জল-স্থলের মিশ্র রূপ। নদী প্রশস্ত হয়, প্রবল বৃষ্টি নামে এবং সমুদ্রে ঝড় তাণ্ডব চালায়। এর ফলে বন্যা হয়, যা মাটিকে সব সময় উর্বর রাখে এবং ঘন সবুজ উদ্ভিদের জন্ম দেয়। একই সঙ্গে তা প্রতি কয়েক বছর পরপর ভয়াবহ প্লাবনের নির্মম নিশ্চয়তাও নিয়ে আসে।

১৯৭৩ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘মনপুরা ৭০’। ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।
ময়মনসিংহে নদীকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ হিসেবে পেয়ে বড় হয়েছেন আবেদিন। সেখানকার গ্রামীণ জীবনের শান্ত ছন্দ নিয়ে তাঁর প্রথম দিকের কাজগুলো এবং দুমকা জলরংচিত্রমালা তাঁকে শান্ত-সুন্দর বাংলার এক রোমান্টিক ব্যাখ্যাকার হিসেবে তুলে ধরে। এমন অফুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অনুকূল পরিবেশের মধ্যে দুর্ভিক্ষের বৈপরীত্য আরও ভয়াবহ মনে হয়; যেন মৃত্যুর এক নির্মম কাস্তে মানুষকে ফসলের মতো কেটে নিচ্ছে। বস্তুত, ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ দেশ ও শিল্পের প্রতি আবেদিনের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দেয়। তাঁকে ঠেলে দেয় এক আপসহীন বাস্তববাদের দিকে, যা সমগ্র উপমহাদেশে তাঁকে স্বতন্ত্র করে তোলে। লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই দুর্ভিক্ষ আজও অস্বস্তিকর আলোচনার বিষয়। নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন যুক্তি দিয়েছেন, অনাহার অনিবার্য ছিল না: ‘যুদ্ধের তৎপরতা অনেক মানুষের আয় বাড়িয়ে দিয়েছিল, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, যেখানে যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি চাঙা হয়ে ওঠার সুফল পাওয়া যাচ্ছিল। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কলকাতার সমগ্র জনগোষ্ঠীকে “ন্যায্যমূল্যের রেশন দোকানের” আওতায় আনা হবে। বাস্তবে এর অর্থ ছিল, গ্রামাঞ্চল থেকে যে দামেই পাওয়া যাক, চাল কিনে এনে ভর্তুকি দিয়ে শহরাঞ্চলে বিক্রি করা হবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যায়।

১৯৭৫ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘বিদ্রোহী গরু’। ছবি: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ।

১৯৪৩ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্র’। ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।

১৯৪৩ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্র’। ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।
সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃতের সংখ্যার মধ্যে হারিয়ে গিয়ে, কিংবা ভারতভাগ ও তার পরবর্তী স্বাধীনতার আড়ালে চাপা পড়ে গেলেও, বাংলার দুর্ভিক্ষে মানুষের প্রাণহানি ছিল বিপর্যয়কর। ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, যিনি ১৯২১ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯২ সালে মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ১৯৭৩ সালের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে এই ঘটনার এক মর্মস্পর্শী রূপ তুলে ধরেছেন। তরুণ এক প্রেমিক যুগলের চোখ দিয়ে ঘটনাটি দেখানো এই চলচ্চিত্র ফিরে তাকায় ধর্মনিরপেক্ষ, গ্রামীণ ও সৃজনশীল ঐতিহ্যের দিকে, যা জমিদারি ব্যবস্থা, ব্রিটিশ বাণিজ্যবাদ, ধর্ম ও বর্ণপ্রথার মতো সংগঠিত ব্যবস্থার অধীনে বিপন্ন। মর্যাদা ও সম্মিলিত প্রতিরোধের শক্তি নিয়ে বিপর্যয় পেরিয়ে আসার যে অসাধারণ সামর্থ্য সাধারণ মানুষের রয়েছে, চলচ্চিত্রটি তাকেই মহিমান্বিত করে। রায়ের নিজের আপত্তির সুর ইচ্ছাকৃতভাবে সংযত বলে মনে হলেও, চলচ্চিত্রের শেষে আমরা দেখি, পটভূমির ভূদৃশ্যজুড়ে বিপর্যস্ত মানুষের উপস্থিতি বাঙ্ময় হয়ে উঠছে। এই দুর্ভিক্ষ যে মানুষের সৃষ্টি, তা নিয়ে খুব কম ইতিহাসবিদই দ্বিমত পোষণ করেন। তবে শেষ পর্যন্ত কত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, তা নিয়ে ঐকমত্য অনেক কম।

১৯৪৩ সালে কলকাতায় বাংলার দুর্ভিক্ষের চিত্র। ছবি: উইলিয়াম ভ্যানডিভার্ট।

১৯৪৩ সালে কলকাতায় বাংলার দুর্ভিক্ষের চিত্র। ছবি: সুনীল জানাহ।
ভারতীয় সুনীল জানাহ ও মার্কিন উইলিয়াম ভ্যানডিভার্টের মতো প্রগতিশীল আলোকচিত্রীদের কাজ দেখলে মানুষের সেই ভয়াবহ অবনতির প্রতি অনুভূতি নতুন করে জেগে ওঠে। দুজনই খুব কাছ থেকে এই বিপর্যয় নথিবদ্ধ করেছিলেন। জানাহ ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন; ভ্যানডিভার্টের জন্ম ১৯১২ সালে, মৃত্যু ১৯৮৯ সালে। আর্কাইভে অজ্ঞাতনামা আলোকচিত্রীদের ছবিও রয়েছে, যাঁরা ক্ষয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা পুরো পরিবারকে ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন। মোড়ানোর কাগজে কালো কালিতে আঁকা আবেদিনের সাহসী ও সরল নিজস্ব ‘নথিবদ্ধকরণ’ তাঁর তীক্ষ্ণ ও সংযত প্রতিবাদের পূর্ণ শক্তি প্রকাশ করে। এটি এক বিশেষ ধরনের শৈল্পিক বস্তুনিষ্ঠতা, যা সামাজিক বাস্তববাদের দিকে তাঁর বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে শক্তি জুগিয়েছিল। একই সঙ্গে তা সাক্ষ্য দিয়েছিল খাদ্যের ঘাটতির নয়, বরং তার যথাযথ বণ্টন নির্মমভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার। শিল্পীর আঁকা সর্বজনীন মানব অবয়ব ও অঙ্গভঙ্গি সহমর্মিতার রূপক হয়ে ওঠে; একই সঙ্গে সেই সব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নির্বাক অভিযোগে পরিণত হয়, যা একটি সমগ্র জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁর সাহসী তুলির টান দর্শক ও এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ীদের ওপর সমানভাবে এক অবিস্মরণীয় আঘাত হানে। তাঁর কোমলতর, আদর্শবাদী কাজগুলোর বিপরীতে আমরা দেখি, তিনি নিজের সময়ের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধান থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত অর্থেই এক স্বতন্ত্র শৈলী প্রতিষ্ঠা করছেন।

১৯৭৬ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘সংগ্রাম’। ছবি: জাহানারা আবেদিন।
১৯৭৬ সালে সৃষ্ট আবেদিনের শেষ অনবদ্য শিল্পকর্ম ‘সংগ্রাম’-এর মধ্যেও বাঙালি কবি জসীমউদ্দীনের রচনার এক চিত্ররূপী সমান্তরাল পাওয়া যায়। ১৯০৩ সালে জন্ম নেওয়া জসীমউদ্দীন মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৬ সালে। বাংলাদেশে তিনি ‘পল্লিকবি’ নামে পরিচিত। জসীমউদ্দীন ও আবেদিন দুজনই গ্রামীণ জীবনের শান্ত-সুন্দর রূপের আড়ালে থাকা অবিচার তুলে ধরেছেন। নিচের রূপান্তরে তা বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে:
ও বাজান চল যাই চল – জসীম উদ্দীন
ও বাজান, চল, যাই চল
মাঠে লাঙল বাইতে,
গরুর কাঁধে লাঙল দিয়া
ঠেলতে ঠেলতে ঠেলতে।
মোরা লাঙল খুঁড়ে ফসল আনি
পাতাল পাথার হইতে,
সব দুনিয়ার আহার জোগাই
সেই না ফসল হইতে,
আর আমরা কেন খাইতে না পাই
পারো কি কেউ কইতে।
বউ দিয়াছে গলায় দড়ি সাতদিন না খাইতে,
ভুখের জ্বালা সইতে, কবরখানায় রইতে;
এবার লাঙর দিয়ে খুঁড়ি মাটি তারি দেখা পাইতে।
মোরা, মাঠ চিরি ভাই! লাঙল দিয়ে,
মোদের বুক চেরা তার চাইতে,
মাঠ চিরিলে ফসল ফলে,
ও ফসল ফলে না বুক হইতে।
এবার মাটি খুঁড়বরে ভাই, ফসল নাহি পাইতে,
ও মাটি খুঁড়ে দেখব আর কতদূর কবরখানায় যাইতে।

১৯৫৩ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘তিন নারী’। ছবি: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ।
শিল্প কি নতুন আদর্শের জন্ম দিতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে সামাজিক অগ্রগতিকে বাস্তব রূপ দেয়? রাজনৈতিক সংকটের মুখে শিল্প কি সাংস্কৃতিক সংহতির বাহন হয়ে উঠতে পারে? জয়নুল আবেদিন নিঃসন্দেহে পরিবর্তনের একজন কারিগর ছিলেন। দেশভাগের পর কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে শিক্ষিত অনেক মুসলিম শিল্পী ঢাকায় চলে আসেন। সে সময়ের ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে শিল্পের ভূমিকা বিবেচনা করলে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার আবেদিনের আকাঙ্ক্ষা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়।
শিল্পকে অনুকরণ হিসেবে নিন্দা করার প্লেটোনীয় ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ফ্রিডরিখ শিলার ও পার্সি বিশি শেলির মতো রোমান্টিক কবিরা। শিলার ১৭৫৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮০৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন; শেলির জন্ম ১৭৯২ সালে, মৃত্যু ১৮২২ সালে। সৌন্দর্য, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের মহত্ত্বদায়ী চিত্রের মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার যে ক্ষমতা শিল্পের রয়েছে, তাঁরা তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। শিলার তাঁর ‘মানুষের নান্দনিক শিক্ষা’ প্রকল্পের কেন্দ্রে রেখেছিলেন শিল্পকে। একইভাবে শেলি যুক্তি দিয়েছিলেন, “কবিরাই পৃথিবীর অস্বীকৃত আইনপ্রণেতা।”
আবেদিনের হারানো স্বর্গের প্রতীকী চিত্রকল্প যেন কালি-তুলিতে সত্যের অমোচনীয় ছাপ রেখে যায়, যা প্রায়ই এক দ্বিমুখী সংকট সামনে আনে। জটিলতা বা সূক্ষ্মতা বোঝার বদলে গতানুগতিক ধারণা গ্রহণের প্রায় প্রবৃত্তিগত প্রবণতা আমাদের সহমানুষ সম্পর্কে ব্যাপক অজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে। আবেদিন ছিলেন সেই সমাজেরই মানুষ; নিজের দেশের নারী, পুরুষ ও শিশুদের প্রতিনিধিত্ব করার পূর্ণ যোগ্যতা তাঁর ছিল। পশ্চিমের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁর নিজের শিক্ষা ও বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাঙালির এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক নন্দনবোধকে স্বতন্ত্রভাবে তুলে ধরার স্বনিযুক্ত দূত হিসেবে তাঁর ভূমিকার জন্য এই যোগাযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মূলত সাধারণ মানুষের শিল্পী হিসেবে আবেদিন বিশ্বাস করতেন, মানুষের নিজস্ব স্বর তার নিজের আকাঙ্ক্ষা ও সম্পদ থেকেই উঠে আসে। তিনি পশ্চিমা আদর্শের কাছে নতজানু হননি। বাংলার কবিতা, সংগীত ও শিল্প বাইরে থেকে গ্রহণ করার প্রয়োজন ছিল না। এর লোকঐতিহ্যকে বিশ্বমুখী আধুনিকতার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব ছিল। এই অর্থে ছবি নির্মাণের ‘কারুশিল্পে’ স্থানীয় পরিচয় গড়ে তুলতে আবেদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
বাংলাদেশের পথে পথে ঘুরলে এবং শিল্পী, লেখক ও সংগ্রাহকদের বাড়িতে থাকলে বোঝা যায়, প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা দুর্দশার বাইরেও এখানে অনেক কিছু আছে। ১৯৫০ সালের ‘কালবৈশাখী’, ১৯৫১ সালের ‘ব্রহ্মপুত্র পার হওয়ার জন্য খেয়ানৌকার অপেক্ষায়’ এবং ১৯৫৯ সালের ‘চাষ করা জমিতে মই দেওয়া’র মতো জলরংচিত্রে শুধু ভূদৃশ্যই ধরা পড়েনি, কারণ এসবের প্রেক্ষাপট অনমনীয় ও কালাতীত। এগুলো বরং গতি, আবহ ও মানুষের অদম্যতার ছবি। মানুষকে চিরাচরিত অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানোর বদলে এই ছবিগুলো উপমহাদেশ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণার বিকল্পকে জোরালো করে তোলে। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি এটি এক ধরনের ঔপনিবেশিকতাবিরোধী প্রতিক্রিয়া।
সংস্কৃতিকে ভাগ করা যায় না বলেই আবেদিন আমাদের বিচার করার বদলে বুঝতে, প্রতিযোগিতা করার বদলে উদ্যাপন করতে বলেন। তাঁর স্বাভাবিক সহমর্মিতা এবং মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল। এর ফলে তিনি নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন যে গল্পটির ভুল পাঠ হচ্ছে না। অন্যান্য অবদানের পাশাপাশি, পশ্চিমা চোখে এত দিন ‘অপরিচিত’ হিসেবে দেখা বাস্তবতাগুলোকে নতুনভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তিনি পথিকৃৎ ছিলেন। সমকালীন ‘দেশজ শিল্পীদের’ উত্থানের জন্য তিনি যদি কোনো বাস্তব উত্তরাধিকার রেখে গিয়ে থাকেন, তা হলো নিজেদের বিষয়বস্তুর সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা, যা তাঁদের কাজের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রকাশক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

১৯৪৬ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম’। ছবি: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের আরেক জাতীয় সম্পদ, ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের মতো জয়নুল আবেদিনও একই উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন—শিল্পের মাধ্যমে মানুষের সেবা করা। নজরুল ১৮৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। নিজ মাটিতে বেড়ে ওঠা এই বিপ্লবী ও সুরকার সামাজিক-রাজনৈতিক সাময়িকী ‘ধূমকেতু’ সম্পাদনা করতেন। ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি রাজনৈতিক কবিতার কারণে পত্রিকার কার্যালয়ে পুলিশ অভিযান চালায় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯২৩ সালের এপ্রিলে তাঁকে কলকাতার আলিপুর কারাগার থেকে হুগলি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ব্রিটিশ কারা তত্ত্বাবধায়কের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে তিনি অনশন শুরু করেন। এক মাসেরও বেশি সময় পর তিনি অনশন ভাঙেন এবং শেষ পর্যন্ত ওই বছরের ডিসেম্বরে মুক্তি পান। কারাবন্দী অবস্থায় নজরুল বহু কবিতা ও গান রচনা করেন, যেগুলো ১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নিষিদ্ধ করেছিল।
নজরুল বয়সে পনেরো বছরের বড় হলেও তিনি ও জয়নুল একই বছরে মৃত্যুবরণ করেন। আবেদিনের ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে নজরুলের বিপ্লবী আহ্বানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ভিন্ন মাধ্যমে কাজ করা শিল্পীরা কীভাবে সামাজিক পরিবর্তনের কার্যকর বাহক হয়ে উঠতে পারেন এবং সম্মিলিত চেতনায় ইতিবাচক রূপান্তর ঘটাতে পারেন। দুজনই মানুষের সংবেদনশীলতা নতুন করে জাগিয়ে তুলতে, অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা দৃশ্যগত কদর্যতা দূর করতে এবং সৌন্দর্যকে দৈনন্দিন চর্চায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। শাসকগোষ্ঠীর হাতে সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনও দুজনের কাজে উঠে এসেছে। বস্তুত, নানা সময়, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ভৌগোলিক পরিসরের বহু শিল্পী আদালতে দেওয়া নজরুলের এই অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তব্যে নিজেদের অনুভূতির প্রতিধ্বনি খুঁজে পেতে পারেন:
‘আমার কণ্ঠ সত্যের একটি মাধ্যমমাত্র, ঈশ্বরের বাণী। আমি সেই চিরন্তন স্বতঃসিদ্ধ সত্যের যন্ত্র, এমন এক যন্ত্র যা চিরসত্যের বাণী উচ্চারণ করে। যন্ত্র অবিনাশী নয়, কিন্তু ঈশ্বরকে ধ্বংস করবে কে?’

১৯৫৭ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিনের ‘প্রজন্ম’। ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।
মূল লেখা: রোজা মারিয়া ফালভো
আন্তর্জাতিক কমিশনিং সম্পাদক - স্কিরা পাবলিশিং, মিলান
