প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬। ০২:২০ পিএম
আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ১৪:০৫ পিএম
দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৭ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব আগুনে পুড়ে যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ। সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটছে ঢাকা বিভাগে। আর আগুন লাগার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এই সময়ে দেশে মোট ৮১ হাজার ৩৪২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০৯ কোটি টাকার সম্পদ। অর্থাৎ বছরে গড়ে ২৭ হাজার ১১৪টি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৬০৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে পুড়ে যায় ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদ।
এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ৬৫৯টি। ওই বছর আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের আর্থিক মূল্য ছিল ৪৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
অন্যদিকে ২০২৩ সালে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই বছর আগুনে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
তিন বছরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২০২৩ সালে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা প্রতিবছরই ২৬ হাজারের ওপরে ছিল।
অগ্নিকাণ্ডের এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে আগুনে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেন, আগুন লাগার পর তা নেভানোর চেয়ে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, আগুনে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয় না, মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ সতর্কতা এবং কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সংস্থাটির ভূমিকা আরও কার্যকর হবে।
তবে বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি গত তিন বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ আগুন থেকে রক্ষা করেছে ফায়ার সার্ভিস।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে প্রায় ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে ১ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে তিন বছরে ৭ হাজার ৪৫ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করেছে সংস্থাটি।
সবচেয়ে বেশি আগুন ঢাকা বিভাগে, প্রধান কারণ বৈদ্যুতিক গোলযোগ
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেশের সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটছে ঢাকা বিভাগে। ২০২৫ সালে শুধু এই বিভাগেই ৭ হাজার ১৭৯টি আগুন লাগার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ঢাকার পর অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রংপুর বিভাগ। এরপর যথাক্রমে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের অবস্থান। সবচেয়ে কম আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে।
রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ঘনবসতি, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সরু সড়কের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের।
গত ১২ অক্টোবর পুরান ঢাকার চকবাজারের একটি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের পর আগুন পুরোপুরি নেভাতে প্রায় ৩৭ ঘণ্টা সময় লাগে।
ঘটনাস্থলে রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি, সরু গলি, পর্যাপ্ত পানির অভাব এবং বাতাস চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।
এর দুই দিন পর, ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ওষুধ কারখানায় আগুন লাগে।
ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। অভিযানে সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরাও অংশ নেন।
তবে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সময় লাগে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার জানান, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
তার মতে, সরু রাস্তা, যানজট এবং ভবনের অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তোলে।
এ কারণে ভবন নির্মাণের সময় থেকেই অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং জরুরি বহির্গমনপথ সচল রাখা জরুরি।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত তিন বছরেই সবচেয়ে বেশি আগুন লেগেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে।
২০২৫ সালে বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে ৯ হাজার ৩৯২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা ওই বছরের মোট ঘটনার ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।
২০২৪ সালে একই কারণে ৯ হাজার ৬৯টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ওই বছরের মোট অগ্নিকাণ্ডের ৩৪ শতাংশ ছিল বৈদ্যুতিক গোলযোগের ফল।
আর ২০২৩ সালে বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে ৯ হাজার ৮১৩টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা ওই বছরের মোট ঘটনার ৩৫ দশমিক ৫২ শতাংশ।
অর্থাৎ তিন বছরেই মোট অগ্নিকাণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে।
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান বলেন, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কারণ।
অনেক ভবনে বৈদ্যুতিক তার, সার্কিট এবং অন্যান্য সরঞ্জাম যথাযথ মান বজায় রেখে স্থাপন করা হয় না। পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
এ বিষয়ে ভবনমালিক ও ব্যবহারকারীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মার্চে সবচেয়ে বেশি আগুন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়ছে অভিযান
বছরের কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, সেই পরিসংখ্যানেও একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে।
গত তিন বছরের সম্মিলিত হিসাবে সবচেয়ে বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে মার্চ মাসে। এরপর রয়েছে এপ্রিল।
২০২৫ সালের মার্চে সারা দেশে ৩ হাজার ৫২২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০২৪ সালের একই মাসে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪২১টি এবং ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৩৩৪টি।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের স্টেশন অফিসার তালহা বিন জসিম বলেন, শুষ্ক মৌসুমে অসতর্কতা, বৈদ্যুতিক ত্রুটি এবং আগুনের অন্যান্য উৎস থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তাই মার্চসহ শুষ্ক মৌসুমে বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে শুধু সচেতনতা বাড়ানো নয়, বিদ্যমান অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থাও কার্যকর রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, বিপণিবিতান এবং রাসায়নিক গুদামে নজরদারি বাড়িয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
সংস্থাটির পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান জানান, অগ্নিঝুঁকি নিরূপণ, ভবন পরিদর্শন, প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে।
তার মতে, অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে মানুষের অসচেতনতা, বিধিবিধান না মানার প্রবণতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি কার্যকর তদারকির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
নিরাপত্তাবিধি নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ বিভিন্ন আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
২০২৫ সালে সারা দেশে ১৯২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ১৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এ ছাড়া বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান মনে করেন, ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে অধিকাংশ ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
তার দাবি, যথাযথ পরিকল্পনা, অগ্নিনিরাপত্তা নীতিমালা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হলে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভবনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যেত।
তিনি বলেন, ভবনে আগুন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলে দুর্ঘটনার শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। তবে বাংলাদেশে এসব নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার প্রবণতা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
একই সঙ্গে ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে শুরু করে প্রতিটি অংশের বৈদ্যুতিক তার ও হিটিং সিস্টেম নিয়মিত পরীক্ষা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন এই বিশেষজ্ঞ।
তার মতে, অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করা গেলে অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবন থেকে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা প্রতিবছর প্রায় একই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের জীবন সুরক্ষার জন্য আগুন প্রতিরোধ, ভবনের নিরাপত্তা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
