প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
ঢাকায় দুই মেট্রোরেল, ব্যয় ২ লাখ কোটি ছাড়াল
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬। ০৩:৫৬ পিএম
আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬। ১৫:৫৮ পিএম
- শেয়ার
- Messenger
- Telegram
- Threads
ঢাকা মেট্রোরেল। ছবি: বাংলাবাজার ইলাস্ট্রেশন
দুই প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাবকে যৌক্তিক বলেছে কারিগরি কমিটি। সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ডিএমটিসিএল।
ঢাকার আরও দুটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। শুরুতে প্রকল্প দুটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সংশোধিত হিসাবে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব এখন পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায়।
প্রকল্প দুটির একটি এমআরটি লাইন-১। কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এর প্রধান অংশ নির্মিত হবে পাতালপথে। একই লাইনের আরেকটি অংশ নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত যাবে উড়ালপথে। অর্থাৎ পাতাল ও উড়ালপথ মিলিয়ে লাইনটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
অন্য প্রকল্পটি এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)। এটি সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত যাবে। এই প্রকল্পেও পাতাল ও উড়াল—দুই ধরনের রেলপথ থাকবে।
ঢাকার মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) হিসাবে, বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি এবং বিভিন্ন কারিগরি পরিবর্তনের কারণে ব্যয় এতটা বাড়ছে।
সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ভাষ্য, ঢাকার জন্য মেট্রোরেল প্রয়োজন। মেট্রোরেল ছাড়া রাজধানীর পরিবহন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
২০১৯ সালে নেওয়া দুই প্রকল্প
এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প দুটি নেওয়া হয় ২০১৯ সালে। বর্তমানে ডিপো উন্নয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং মূল নির্মাণকাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়াও চলছে।
এর মধ্যেই প্রকল্প দুটির সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা আরডিপিপি তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ডিএমটিসিএল।
পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প দুটির মূল্যায়ন বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বাড়তি ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা শেষে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দুটি প্রকল্পেই অর্থায়ন করছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। প্রকল্পের ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ার বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই সামনে আসে।
তখন ব্যয় কমানোর তাগিদ দেওয়া হলেও প্রকল্প এগোয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে জাইকার সঙ্গে এ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে।
গত ২৪ মে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর উপায় নিয়ে পরামর্শ দিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে সরকার।
গত জুলাইয়ে ওই কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মূল প্রকল্প প্রস্তাবের তুলনায় ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর বিষয়টিকে যৌক্তিক বলেছে কমিটি। এরপর সংশোধিত ব্যয়ের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় ডিএমটিসিএল।
শামীম জেড বসুনিয়ার মতে, প্রতিবছর প্রায় ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ডলারের দাম প্রায় ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি, বিস্তারিত নকশার পরিবর্তনের কারণে কাজ বেড়ে যাওয়া এবং সরকারের ভ্যাট ও কর বৃদ্ধির প্রভাব প্রকল্প ব্যয়ে পড়েছে।
তার বক্তব্য, ঢাকার জন্য মেট্রোরেল প্রয়োজন। ব্যয় বেশি মনে হলে সরকার বিকল্প ঋণদাতা খুঁজতে পারে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে যত দেরি হবে, ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।
প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় অনেক বেশি
বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করছে। এই পথের সম্প্রসারিত অংশ কমলাপুর পর্যন্ত নেওয়ার কাজও চলছে।
পুরো প্রকল্পটির ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়ছে প্রায় ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডিএমটিসিএল এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নির্মাণাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করেছিল।
সেই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিলে ভারতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে প্রায় ১৫০ কোটি থেকে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
ভারতও বিদেশি ঋণ ব্যবহার করে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। তবে ঋণের এমন শর্ত তারা গ্রহণ করে না, যাতে ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে না পারলে প্রকল্পের ব্যয় কমানো কঠিন হবে।
তার বক্তব্য, ঋণদাতা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে দরপত্রের শর্ত শিথিল করা গেলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ব্যয়ও কমতে পারে। টাকার অবমূল্যায়ন, নকশার পরিবর্তন ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে যৌক্তিক হারে ব্যয় বাড়তে পারে, তবে তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কেন দ্বিগুণের বেশি ব্যয়
লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে যখন প্রথম ব্যয় নির্ধারণ করা হয়, তখন বিস্তারিত নকশা তৈরি হয়নি।
পরে বিস্তারিত নকশা করার সময় প্রকল্পে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। ফলে কাজের পরিমাণ ও কারিগরি প্রয়োজনও বেড়ে যায়।
এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির কারণে সিমেন্ট, ইস্পাত, জ্বালানি, বিটুমিন, যন্ত্রপাতি ও পরিবহনের খরচ বেড়েছে।
আরেকটি বড় কারণ টাকার অবমূল্যায়ন। ২০১৯ সালে এক ডলারের বিপরীতে প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরে প্রকল্পের হিসাব করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের হিসাবে সেটি প্রায় ১২২ টাকা ধরা হয়েছে।
ফলে বিদেশ থেকে কেনা যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সামগ্রীর দাম টাকার হিসাবে অনেক বেড়ে গেছে।
এর সঙ্গে কর ও ভ্যাট, ভূমি অধিগ্রহণ, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর, পরামর্শক ব্যয়, নির্মাণকালীন সুদ এবং বিভিন্ন ধরনের আপৎকালীন খরচও নতুন প্রস্তাবে যুক্ত হয়েছে।
সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, প্রথম যখন প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন পূর্ণাঙ্গ নকশা ছিল না। পরে বিস্তারিত নকশা তৈরি হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে।
তার মতে, পূর্ণাঙ্গ নকশা আগে পাওয়া গেলে কিছু খরচ কমানোর সুযোগ থাকত। এখন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে আরও সময় নিলে ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
লাইন-১-এর ব্যয় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি
২০১৯ সালে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে এই ব্যয় বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
টাকার অঙ্কে অনুমোদন পেলে এটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি হবে।
লাইন-১-এর আওতায় পাতাল ও উড়াল মিলিয়ে ৩১ কিলোমিটারের বেশি মেট্রোরেল নির্মাণ হবে। এতে মোট ২১টি স্টেশন থাকবে।
সংশোধিত ব্যয় অনুমোদিত হলে এই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।
লাইন-৫-এর ব্যয় ৯৩ হাজার কোটি
এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।
পাতাল ও উড়ালপথের সমন্বয়ে এই লাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। পুরো পথে ১৪টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এখন পরিকল্পনা কমিশনে প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন ব্যয় অনুমোদন হলে লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।
প্রতিযোগিতা কম হওয়াকেও দায়ী করা হচ্ছে
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প দুটির ব্যয় বাড়ার পেছনে জাইকার ঋণের বিভিন্ন শর্ত এবং দরপত্রে সীমিত প্রতিযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
দরপত্রে মূলত জাপানি কোম্পানিগুলো অংশ নেয়। তাদের দেওয়া দর তুলনামূলক বেশি হলেও দর-কষাকষির সুযোগ সীমিত থাকে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এ ছাড়া দরপত্রের কাগজপত্রে এমন কিছু কাজের পদ্ধতি ও প্রযুক্তিগত শর্ত থাকে, যা জাপানি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য পূরণ করা কঠিন।
ফলে ঠিকাদার নিয়োগে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না এবং প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, এই জায়গাতেই পরিবর্তন প্রয়োজন। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে ঠিকাদারের সংখ্যা বাড়বে এবং প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে নকশার পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের মতো বাস্তব কারণে কিছু ব্যয় বৃদ্ধি স্বাভাবিক হলেও প্রকল্পের খরচ কেন দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাচ্ছে, সেটিও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
