Logo
Logo
×
সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল, বাড়ছে শঙ্কা

কারখানায় সুতা উৎপাদনের কার্যক্রম চলছে। ছবি: সংগৃহীত

অর্থনীতি ।  শিল্প ও বাণিজ্য

সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল, বাড়ছে শঙ্কা

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৭:১০ পিএম

রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোর জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় সুতা আমদানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বন্ড সুবিধার আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানির সুযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে সংশ্লিষ্ট পোশাক কারখানাগুলো এ ধরনের সুতা আমদানি করতে পারবে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার একটি সাধারণ আদেশ জারি করেছে এনবিআর। আদেশটি জারির সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

রপ্তানি আয় দেশে এলেই অবমুক্ত হবে সুতা

নতুন বিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানি করা সুতা সরাসরি অবমুক্ত করা হবে না। ওই সুতা ব্যবহার করে তৈরি পণ্যের রপ্তানি সম্পন্ন হওয়ার পর রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত হলেই সংশ্লিষ্ট আমদানি করা সুতা অবমুক্ত করা হবে।

এ ছাড়া ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি ও অবমুক্তির ক্ষেত্রে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ অথবা বিটিএমএ—এই তিন বাণিজ্য সংগঠনের যেকোনো একটির প্রত্যয়ন কাস্টমস স্টেশনে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এর ফলে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানে নন-বন্ডেড কারখানাগুলো যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, একই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

আমদানির বড় অংশ ১০-৩০ কাউন্ট সুতা

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট সুতা আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা। গত বছর দেশে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সুতা আমদানি হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতা আমদানি করতে হলে পোশাক রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হতে পারে। এ কারণে উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সুপারিশ এনবিআরের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে সে সময় তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পরে বিএনপি সরকার এ বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় বাণিজ্যমন্ত্রীকে। গত ২০ আগস্ট কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ওই সভায় পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট এইচএস কোড—৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭-এর আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানির ক্ষেত্রে নতুন শর্ত আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতেই এনবিআর নতুন সাধারণ আদেশ জারি করেছে।

তবে আদেশ জারির আগে যেসব চালান ইতোমধ্যে জাহাজীকরণ সম্পন্ন হয়েছে, সেসব চালানের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ক্ষোভ

সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।

সংগঠন দুটির অভিযোগ, একটি ‘স্বার্থান্বেষী মহলের’ প্রভাবে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করে স্থানীয় মিল থেকে সুতা কেনা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এটি দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’।

সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে তারা সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।

পোশাক খাতের নেতাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। বরং বৈঠকের পর বিষয়টি সামনে এলে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএকে যৌথ পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়কে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছিল।

বৈঠকের আলোচ্যসূচির বাইরে থাকা বিষয়টি কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করায় তারা বিস্ময় ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর মতে, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের প্রচলিত বন্ড ব্যবস্থা পরিবর্তনের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। এতে দেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি কার্যক্রমেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বাণিজ্যসচিব এবং এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছেও চিঠির অনুলিপি পাঠিয়েছে সংগঠন দুটি।

সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বিটিএমএ

অন্যদিকে এনবিআরের নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।

টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠনটি বিশেষ করে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্তির সঙ্গে রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসনের শর্ত যুক্ত করার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

বিটিএমএর ভাষ্য, সম্প্রতি পাওয়া তথ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত না হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনার জন্য আর্থিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন না হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নন-বন্ডেড বা বন্ড লাইসেন্সবিহীন রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির আওতায় সুতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

বিটিএমএর মতে, সরাসরি রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও ওই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছিল। বর্তমানে একই ব্যবস্থা বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ায় সুতা আমদানি কিংবা রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই।

স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা বনাম রপ্তানি প্রতিযোগিতা

বিটিএমএ মনে করছে, নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্পের সুরক্ষা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ এবং বন্ড ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

একই সঙ্গে রপ্তানি আয়ের পূর্ণ প্রত্যাবাসনের শর্ত যুক্ত হওয়ায় সরকারের উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে বলেও মনে করছে সংগঠনটি।

তবে পোশাক রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ হলো—ব্যাংক গ্যারান্টি, অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা ও রপ্তানি আয় দেশে আসার পর কাঁচামাল অবমুক্তির প্রক্রিয়া তাদের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে বাড়তি সময় ও ব্যয় তৈরি করতে পারে।

ফলে এনবিআরের নতুন সিদ্ধান্তে একদিকে স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্পের সুরক্ষা ও বন্ড ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যয় ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

আরও পড়ুন

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে