Logo
Logo
×

অর্থনীতি ।  শিল্প ও বাণিজ্য

হাজারো ডাকঘর, হাজার কোটি ব্যয়, আয় কোথায়

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬। ০১:৪৩ পিএম

আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬। ১৯:২৪ পিএম

হাজারো ডাকঘর, হাজার কোটি ব্যয়, আয় কোথায়

দেশজুড়ে প্রায় ৪০ হাজার কর্মী, ৯ হাজার ৮৪৮টি ডাকঘর এবং প্রায় ৪৩৯ একর জমি নিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম বড় জনসেবা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে ডাক অধিদপ্তর। কিন্তু বিশাল এই অবকাঠামোর তুলনায় সংস্থাটির আয় খুবই কম। ব্যয় ও আয়ের বড় ব্যবধান কমাতে এবার ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ডাক বিভাগ।

ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির পেছনে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা।

শুধু এক বছর নয়, গত পাঁচ বছরের হিসাবেও বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ডাক বিভাগের মোট ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ১৮ কোটি টাকা। একই সময়ে আয় হয়েছে ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।

ব্যক্তিগত চিঠিপত্র আদান-প্রদান কমে যাওয়া এবং বেসরকারি কুরিয়ার ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের বিস্তারের কারণে ডাক বিভাগের প্রচলিত ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মুখে। এ অবস্থায় দেশজুড়ে থাকা ডাকঘর ও অবকাঠামোকে নতুন করে ই-কমার্স, পার্সেল এবং লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে অধিদপ্তর।

এই পরিকল্পনার কেন্দ্রেই রাখা হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল।

এ ব্যবস্থায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজস্ব বিনিয়োগে ডাকসেবা কেন্দ্র পরিচালনা করবেন। তারা চিঠি ও পার্সেল বুকিং, ই-কমার্স পণ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং গ্রাহকসেবার মতো কার্যক্রম চালাবেন। অন্যদিকে ডাক বিভাগ তাদের দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক ও লজিস্টিকস সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ দেবে।

ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলামের ভাষ্য, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর মূল লক্ষ্য ডাক বিভাগকে আরও কার্যকর করা, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং পার্সেল ব্যবসা বাড়ানো। পার্সেলের পরিমাণ বাড়লে ডাকঘরের আয়ও বাড়বে এবং ধীরে ধীরে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

পাঁচ বছরে ৫ হাজারের বেশি আউটলেট

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত জুলাইয়ে আটটি ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেটের মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্যে চারটি ঢাকায় এবং বাকি চারটি ঢাকার বাইরে।

ডাক অধিদপ্তর আগামী পাঁচ বছরে ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেটের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি করতে চায়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব আউটলেট শুধু প্রচলিত ডাকঘর হিসেবে কাজ করবে না। এগুলো পার্সেল সংগ্রহ কেন্দ্র, ই-কমার্স ডেলিভারি হাব, পেমেন্ট সেন্টার এবং স্থানীয় ডেলিভারি স্টেশন হিসেবেও ব্যবহৃত হবে।

ফলে প্রতিটি নতুন আউটলেট পরিচালনায় সরকারের সরাসরি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন কমবে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজেদের বিনিয়োগে এসব কেন্দ্র পরিচালনা করলেও কেন্দ্রীয় লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক থাকবে ডাক বিভাগের নিয়ন্ত্রণে।

অধিদপ্তর বলছে, ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু হলেও বর্তমান স্থায়ী কর্মীদের চাকরিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং স্থায়ী কর্মীদের পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক ডেলিভারিম্যান ও আউটসোর্সিং কর্মী যুক্ত হতে পারেন।

বর্তমানে অনেক গ্রামীণ ডাকঘরই খণ্ডকালীন বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীর ওপর নির্ভরশীল। তাদের এক্সট্রা-ডিপার্টমেন্টাল বা ইডি স্টাফ হিসেবে পরিচিত করা হয়। স্থায়ী কর্মীদের বড় অংশ সদর দপ্তর, সার্কেল অফিস এবং বড় ডাকঘরগুলোতে কর্মরত।

হাজারো ডাকঘর আছে, কাজ কমেছে

ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিশাল অবকাঠামোর পর্যাপ্ত ব্যবহার না হওয়া।

দেশের অনেক গ্রামীণ ডাকঘরে আগের মতো চিঠি আসে না। কোথাও কোথাও দিনে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি চিঠি আসে, যার বড় অংশ ব্যাংক, এনজিও বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইনি ও দাপ্তরিক নোটিশ।

অনেক শাখা ও উপ-ডাকঘরে ভবন, জমি ও জনবল থাকলেও নিয়মিত কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ডাকঘরের একাধিক কক্ষের মধ্যে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র একটি।

অন্যদিকে একই সময়ে দেশের কুরিয়ার ও লজিস্টিকস খাত দ্রুত বড় হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি করেছে। সেখানে ডাক বিভাগের বার্ষিক আয় মাত্র ২৫২ কোটি টাকার কাছাকাছি।

ডাক বিভাগের আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক ডাকসেবা, সঞ্চয়পত্র, সরকারি ডাকটিকিট ও দাপ্তরিক চিঠিপত্রের বিভিন্ন ফি।

ই-কমার্স ও স্পিড পোস্টে নতুন চেষ্টা

হারানো বাজারের একটি অংশ ফিরে পেতে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পার্সেল ব্যবসায় নতুন করে জোর দিচ্ছে ডাক বিভাগ।

স্পিড পোস্ট ২০১৮ সালে চালু হলেও পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস সুবিধার অভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এবার সেবাটিকে পুনর্গঠন করে ঢাকার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা এবং জেলা শহরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

ডাক অধিদপ্তরের হিসাবে, গত আট মাসে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৮৫০ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের মধ্যেও এ সেবার ব্যবহার বাড়ছে।

ডাক বিভাগ বর্তমানে প্রায় ১৮ হাজার কাউন্টারের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৫ কোটি ডাকসামগ্রী প্রক্রিয়াকরণ করে বলে জানিয়েছেন মহাপরিচালক।

গত দুই অর্থবছরে প্রায় ৫৬ লাখ পাসপোর্ট, ৭ লাখ মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান এবং ১৫ লাখ টেলিফোন বিল গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ডাক বিভাগ।

এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ৭ কোটির বেশি স্মার্ট কার্ড ডেলিভারি করা হয়েছে।

বিদেশে পণ্য ও ডাক পাঠানোর পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশগামী ডাকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১৬ টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ২৪৩ টন। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ৩০ দশমিক ০৪ শতাংশ।

ডাক বিভাগের মতে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক চিঠিপত্রের ব্যবহার কমলেও বাণিজ্যিক চিঠিপত্র ও পার্সেলের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, লক্ষ্য অটোমেশন ও এআই

লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়নে প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ করছে ডাক বিভাগ।

মেইল ভ্যান ও বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের অবস্থান শনাক্ত করতে ভেহিকেল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে ৫০০ ডেস্কটপ কম্পিউটার, ৫০০ ইউপিএস, ১০টি ল্যাপটপ এবং ৬ হাজার অ্যান্ড্রয়েড ফোন দেওয়া হয়েছে।

ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের সহায়তায় পাওয়া ৪৩টি ডেলিভারি ভ্যান এবং ৮০টি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলও বহরে যুক্ত হয়েছে।

একই সময়ে ৩৩টি জেলা ডাকঘর নির্মাণ এবং ১০০টি উপজেলা ডাকঘর সংস্কার করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে ডাক বিভাগ ই-কমার্স লজিস্টিকস, কোল্ড চেইন, পার্সেল ট্র্যাকিং, দ্রুত হোম ডেলিভারি, অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে চায়।

ডিজিটাল অ্যাড্রেসিং, অনলাইনে ডাক জীবনবিমা ও সঞ্চয় সেবা, বিল পরিশোধ এবং সরকারি তথ্যসেবাও এ পরিকল্পনার অংশ।

এ নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের আম, জামদানি ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্য শহর ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

ব্যয়ের ৭৮ শতাংশই বেতন ও পেনশনে

তবে আধুনিকায়নের পথে বড় বাধা অর্থসংকট।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডাক বিভাগের মোট ১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে বেতন ও পেনশনেই গেছে ৮১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৮ শতাংশই খরচ হচ্ছে এই দুই খাতে।

ফলে প্রযুক্তি, পরিবহন, বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এবং নতুন সেবায় বিনিয়োগের জন্য তুলনামূলক কম অর্থ থাকে।

এর মধ্যেও ডাক বিভাগের অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ হয়েছে। ২০২১ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে ৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সদর দপ্তর ভবন উদ্বোধন করা হয়। ডাক বিভাগের কর্মীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণে ২০১৯ সালে ৩৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্পও অনুমোদিত হয়।

তবে সমালোচকদের মতে, অবকাঠামোয় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হলেও মূল ডাকসেবার আধুনিকায়ন এবং বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ডাক বিভাগ প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি।

ডাক অধিদপ্তর অবশ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাবে মূল্যায়ন করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের সব জায়গায় জনসেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে।

মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলামের ভাষ্য, বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী সেবার মূল্য নির্ধারণ করতে পারলেও ডাক বিভাগ তা পারে না। ডাক মাশুল পরিবর্তনেও সরকারি অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

তার মতে, ডাক বিভাগের প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা করা নয়, বরং জনসেবা দেওয়া।

তবে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের বিপরীতে মাত্র কয়েক শ কোটি টাকা আয় এবং পাঁচ বছরে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ঘাটতির বাস্তবতায় পুরোনো কাঠামো ধরে রাখা কতটা টেকসই, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল, ই-কমার্স লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে সেই ব্যবধান কতটা কমানো যাবে, সেটিই এখন ডাক বিভাগের রূপান্তরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে