প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬। ০১:০৬ পিএম
আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬। ১৪:২১ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের বিস্তার এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং সৌদি আরবের বিকল্প তেল রপ্তানি পথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৮৬ ডলারে পৌঁছায়। দিনের লেনদেনের একপর্যায়ে দাম ১১০ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। গত ১৯ মে ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ২৮ ডলারে ওঠার পর এটিই ব্রেন্টের সর্বোচ্চ মূল্য।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম এক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। শুক্রবার এই তেলের দাম ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১০১ দশমিক ৪১ ডলারে।
জ্বালানি বাজারের বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে এবং গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ সংকট গভীর হতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চলছে। সংঘাতের প্রথম পর্যায়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
পরে এপ্রিলে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির খবরে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। তেল ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
এর প্রভাবে মে মাসে ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের বেশি থাকা ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম জুনের শেষ নাগাদ প্রায় ৭৩ ডলারে নেমে আসে।
তবে জুলাই থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা ফের বাড়তে থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়।
শুক্রবার ব্রেন্টের দাম ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে বাজারে সেই উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম শুধু প্রকৃত উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে না। ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও বাজারদর নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কোনো বড় তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলে যুদ্ধ বা সামরিক হামলার ঝুঁকি তৈরি হলে সরবরাহে প্রকৃত ঘাটতি দেখা দেওয়ার আগেই দাম বেড়ে যেতে পারে।
সৌদি আরবের বিকল্প তেল রপ্তানি পথও হামলার ঝুঁকিতে
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলবর্তী ইয়ানবু বন্দরের গুরুত্ব বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় সৌদি আরব বিকল্প পথ হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করছে।
এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল পশ্চিমাঞ্চলের লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছানো হয়। সেখান থেকে জাহাজে করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করা হচ্ছে।
ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে ইয়ানবু সৌদি আরবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রপ্তানিকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
তবে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় এই পথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, শুক্রবার ইয়ানবুর দিকে নিক্ষেপ করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে তাদের বাহিনী।
ইয়ানবু সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিশোধন, পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন ও জ্বালানি রপ্তানিকেন্দ্র। ফলে এই এলাকায় সামরিক হামলার ঝুঁকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক শ্রেইনার পার্কার মনে করেন, ইয়ানবু বন্দরে হুতিদের সম্ভাব্য হামলা সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলার কারণে সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এখন ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন করা হচ্ছে।
এই তেল ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছানোর পর আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। ফলে বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হলে সৌদি আরবের সরবরাহ সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে কেন এত উদ্বেগ
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।
ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে এই পথে তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলা বৃদ্ধির ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের হামলার ঘটনা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এসব ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জ্বালানি ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সংঘাত বিস্তৃত হলে তেলবাহী জাহাজের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হতে পারে।
তখন শুধু সরবরাহ কমার ঝুঁকিই তৈরি হবে না; জাহাজ পরিবহনের খরচ এবং যুদ্ধঝুঁকির বিপরীতে বিমার প্রিমিয়ামও বেড়ে যেতে পারে।
ফলে উৎপাদনকারী দেশগুলো স্বাভাবিক মাত্রায় তেল উত্তোলন অব্যাহত রাখলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সেই তেল পৌঁছানো কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়।
কারণ ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আগাম বাজারদর সমন্বয় করেন।
সৌদি আরবের রপ্তানি অবকাঠামো এবং হরমুজ প্রণালি একই সঙ্গে ঝুঁকির মুখে থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সেই আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।

-6ad07fdcc01bc.jpg)




