Logo
Logo
×

খবর ।  শিক্ষা

চুয়েটের আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রভাব দেখছে সরকারের একাংশ

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬। ১২:৫২ পিএম

আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬। ১৪:০৪ পিএম

চুয়েটের আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রভাব দেখছে সরকারের একাংশ

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা ২২ দিন ধরে আন্দোলন চলছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)। এর মধ্যে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম দায়িত্ব নিতে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সোমবার (১২ অক্টোবর) নিয়োগ পাওয়ার ২১ দিন পর ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন নতুন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। এ সময় তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, নতুন উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হবে এবং আগের উপাচার্য আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতে হবে।

এদিকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ না আসায় প্রশ্ন উঠেছে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজনের ধারণা, উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের বক্তব্য, দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।

চুয়েটের একাধিক সূত্রের দাবি, উপাচার্য নিয়োগ ও পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের পারস্পরিক বিরোধের প্রভাব থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে উপাচার্য পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও ক্যাম্পাসে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অন্যদিকে চুয়েটের নিজস্ব শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

উপাচার্য পরিবর্তন ঘিরে যেভাবে শুরু আন্দোলন

চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।

কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই দিনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২১ সেপ্টেম্বর রাতেই বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। তারা উপাচার্যের বাসভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন।

পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক শাটডাউন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে অংশ নেন।

ফলে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চুয়েটে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

আন্দোলনের পেছনে রাজনীতি দেখছেন সরকারের কেউ কেউ

চুয়েটের চলমান সংকট নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজনের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মূলত একটি প্রশাসনিক পদ। কে এই দায়িত্ব পালন করলে বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার সরকারের।

তার মতে, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের সমস্যা কিংবা শিক্ষা কার্যক্রমসংক্রান্ত দাবিতে আন্দোলন করতে পারেন। তবে উপাচার্য নিয়োগের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করা সমীচীন নয়।

সরকারের ওই নীতিনির্ধারকের ধারণা, চুয়েটের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

তিনি আগের দুটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন। গত মে মাসে গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের পেছনেও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বলে মনে করেন তিনি।

তবে চুয়েটের আন্দোলনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।

অন্যদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থেই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।

মঙ্গলবার সকালে আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বলেন, তাদের আন্দোলনের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই। দলীয় রাজনীতির কারণে আন্দোলন হলে কেবল শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এতে অংশ নিত। কিন্তু এখানে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

ওই শিক্ষার্থীর মতে, বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল করা।

সেশনজটের আশঙ্কা, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান শিক্ষার্থীরা

দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চুয়েট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হবে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং সামগ্রিক শিক্ষাজীবনের ওপর তত বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে স্বাভাবিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ কারণে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আগেই সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একাংশও দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফিরতে চান। তবে তাদের দাবি, উপাচার্য নিয়োগসংক্রান্ত সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান ছাড়া স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

চুয়েটের একজন শিক্ষার্থী জানান, দীর্ঘদিন ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় তারা উদ্বিগ্ন। এভাবে অচলাবস্থা চলতে থাকলে সেশনজট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন শিক্ষার্থীরা।

অন্যদিকে সরকারের একাংশ আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা প্রকাশ করলেও শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিকে সম্পূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বলে তুলে ধরছেন।

উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে সমঝোতা না হওয়ায় চুয়েটের অচলাবস্থা আপাতত কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে