প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
বাংলাবাজার পত্রিকা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬। ০১:৩০ পিএম
আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬। ১৬:১৩ পিএম
২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল, লন্ডনের বিখ্যাত কনসার্ট হল ‘ওটু এরেনা’ তখন কানায় কানায় পূর্ণ। হাজার হাজার মানুষের উত্তাল কোলাহল আর অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হচ্ছিল না। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, মাত্র এক পলক দেখার জন্য যুগের সেরা 'কিং অফ পপ'-কে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও ভক্তদের মনে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে হাজির হলেন সেই মহাতারকা। একটি কালো লিমুজিন গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই কণ্ঠশিল্পী। গায়ে মিলিটারি স্টাইলের এমব্রয়ডারি করা জ্যাকেট, পরনে কালো প্যান্ট, চোখে সানগ্লাস—আর মুখে সেই চিরচেনা আন্তরিক হাসি।

মাইকেল জ্যাকসনের, চিরচেনা সেই আন্তরিক হাসির অভিব্যক্তি। ছবিসুত্র: পিনটারেস্ট ডট কম
তাকে দেখামাত্রই গ্যালারি ফেটে পড়ল বাঁধভাঙা উল্লাসে। পুরো ‘ওটু এরেনা জুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল একটাই নাম—“মাইকেল, মাইকেল!” উত্তাল জনসমুদ্র সামলাতে সিকিউরিটির লোকজনের তখন প্রায় নাভিশ্বাস ওঠার দশা। মঞ্চে আবির্ভূত হলেন মাইকেল। মাইক্রোফোনের সামনে কিছু সময় দাঁড়িয়ে কোনো কথা বললেন না, শুধু চারপাশের এই অসামান্য ভালোবাসা আর উন্মাদনা নীরবে উপভোগ করলেন। এরপর লাজুক ও মিষ্টি হাস্যে ভক্তদের উদ্দেশে মৃদুস্বরে বলে উঠলেন—"আই লাভ ইউ!"
সেই কথা শোনার পর ওটু এরেনা অন্দরমহল আবারও কেঁপে উঠল প্রকম্পিত আওয়াজে। আর কেঁপে ওঠবেই বা কেন? দীর্ঘ ৮ বছরের এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গ ও নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে আবার তিনি মঞ্চে পারফর্ম করতে দাঁড়ালেন। ১৯৯৭ সালের পর থেকে যিনি মঞ্চের আলো থেকে দূরে ছিলেন, তার এই ফেরা মানে প্রায় এক যুগের একটা ব্যবধান পেরিয়ে আসা।

পত্রিকার পাতায় মাইকেলের মৃত্যু সংবাদ।

'দ্য কিং ইজ ডেড' মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর সংবাদে ঐতিহাসিক সংবাদপত্রের প্রথম পাতা।

পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর খবরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কভার।
গল্পের শুরু
১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট। ইন্ডিয়ানার গ্যারিতে এক বর্ধিষ্ণু কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারে মাইকেল জ্যাকসনের জন্ম। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারটির কর্তা ও মাইকেলের বাবা জোসেফ ওয়াল্টার জ্যাকসন তার ছেলেদের সংগীত প্রতিভা নিয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন। ছেলেদের দিয়ে গানের দল বানিয়ে আয়ের পথও বের করে ফেলেন তিনি। পাঁচ ভাইকে নিয়ে গড়ে ওঠা সেই ব্যান্ডের নাম ‘জ্যাকসন ফাইভ’, সর্বকনিষ্ঠ মাইকেল সেই দলের প্রাণভোমরা। ধীরে ধীরে ‘জ্যাকসন ফাইভ’ জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল। সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া মাইকেল আলোচনায় আসেন এই ব্যান্ডের কারণেই।

আফ্রো হেয়ারস্টাইলে সত্তরের দশকের তরুণ মাইকেল জ্যাকসন। ছবিসুত্র: পিনটারেস্ট ডট কম
বড় ভাইদের সাথে মঞ্চে তার সরব উপস্থিতি দর্শকদের অভিভূত করে। কে জানতো এই বিস্ময় বালক একদিন পৃথিবীতে সঙ্গীতের জগতে রাজত্ব করবেন!

জ্যাকসন ফাইভ ব্যান্ডের পাঁচ ভাই, মাঝে মাইকেল জ্যাকসন। ছবিসুত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স
জ্যাকসন ফাইভের সাথে থাকাকালে মাইকেল চারটি একক অ্যালবাম রেকর্ড করেন। তখনই হয়তো তিনি অনুধাবন করেছিলেন, তার ভবিষ্যৎ এই ব্যান্ডের সাথে নয়, একক ক্যারিয়ারের জন্য সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। মাঝখানে একটি সিনেমায় কাকতাড়ুয়ার চরিত্রে অভিনয় করে ফেলেন মাইকেল। ‘দ্য উইজ’ নামের সেই সিনেমাটি অবশ্য তেমন ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। ১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় মাইকেলের পঞ্চম একক অ্যালবাম ‘অফ দ্য ওয়াল’। পপ আর ফাংক ধাঁচের অ্যালবামটি সাড়া ফেলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সংগীতাজগতে। স্টিভি ওয়ান্ডার আর পল ম্যাকার্টনির মত বাঘা বাঘা তারকারা এই অ্যালবামের গান লিখেছিলেন।

‘দ্য উইজ’ চলচ্চিত্রে মাইকেল জ্যাকসন। ছবিসুত্র: ওয়েটপেইন্ট ডট কম
তিন বছর বিরতির পর ১৯৮২ সালে মাইকেল ফিরে এলেন নতুন অ্যালবাম নিয়ে। ‘থ্রিলার’ নামের সেই অ্যালবাম সঙ্গীতের ইতিহাসে অনন্য সাধারণ এক মাত্রা যোগ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত অ্যালবামের তালিকার শীর্ষস্থানটি আজও থ্রিলারের দখলে। মোট ১২টি গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়ে ৮টি জিতে নেয় এই মাস্টারপিস। থ্রিলারের সবগুলো গানই জনপ্রিয় হয়েছিল, কিন্তু আলাদা করে টাইটেল ট্র্যাক ‘থ্রিলার’-এর কথা বলতেই হবে। জন ল্যান্ডিসের পরিচালনায় নির্মিত হয় থ্রিলারএর ১৪ মিনিটের মিউজিক ভিডিও। হরর সিনেমার মতো ভিডিওতে জন্মির সাজে হাজির হন খোদ মাইকেল, তার মোহনীয় নাচের ভঙ্গি আর কন্ঠের জাদুতে থ্রিলার আমেরিকায় তোলপাড় ফেলে দেয়।

৮০-এর দশকের পপ সঙ্গীত কে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এক এ্যালবাম। ছবিসুত্র: ডিজাইনমাইনাইট ডট কম
১৯৮৭ সালে মাইকেলের প্রত্যাবর্তন হয় ‘ব্যাড’ অ্যালবামের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে মাইকেলের মুনওয়াক তাকে নৃত্যশিল্পীর মর্যাদা দিয়ে ফেলেছে, থ্রিলারের মিউজিক ভিডিওগুলো তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। মাইকেল চাইতেন তার সব কাজ নিখুঁত হোক। মিউজিক ভিডিও শব্দটি তিনি কখনোই ব্যবহার করতেন না, তার সব গানের ভিডিওকে তিনি একেকটা স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র হিসেবেই বানাতেন। ব্যাড অ্যালবামের টাইটেল ট্র্যাক ‘ব্যাড’ এর ভিডিও বানানোর জন্য তিনি কিংবদন্তীতুল্য চিত্রপরিচালক মার্টিন স্করসেজির শরণাপন্ন হলেন। এবারও বাজিমাত। ব্যাডের ৫টি গান বিলবোর্ডে প্রথম স্থান দখল করল, মাইকেল আবারও তার জাত চেনালেন। কনসার্ট করতে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও’ প্রান্তে ছুটে যেতে লাগলেন তিনি। মঞ্চে তার নাচ-গানে বিমোহিত দর্শক-শ্রোতা অজ্ঞান হয়ে যেতে লাগলো হরহামেশাই! মাইকেল পেয়ে গেলেন তার উপাধি ‘কিং অফ পপ’। এলভিস প্রিসলির একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন তিনি।

১৯৯৪ সালে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে মাইকেল জ্যাকসন ও তার স্ত্রী লিসা মেরি প্রেসলি। ছবিসুত্র: সেলেবিচি ডট কম
ব্যক্তিজীবনে মাইকেল ছিলেন অত্যন্ত লাজুক ও প্রচারবিমুখ, খুব প্রয়োজন না হলে তিনি ক্যামেরার সামনে সাক্ষাৎকার দিতেন না। ভালোবাসতেন মেক্সিকান খাবার, সময় পেলেই বই পড়তেন। পোষা প্রাণীর বাতিক ছিল মাইকেলের। শিম্পাঞ্জী বা অজগর- সবই ছিল তার পোষ্য। মিউজিক ভিডিও নিয়ে মাইকেলের খুঁতখুঁতে স্বভাবের কথা আগেই বলেছি। সবসময় চাইতেন নিজের সেরাটা দিতে। তার বোন জ্যানেট জ্যাকসনকে নিয়ে বানিয়েছিলেন সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিও ‘স্ক্রিম’। ৭ মিলিয়ন ডলার বাজেটের ভিডিওটি সম্পূর্ণ সাদাকালো।

১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সালের বিখ্যাত ব্যাড ট্যুর'-এর ঐতিহাসিক মুহূর্তে জ্যাকসনের সিগনেচার স্টেজ পাওয়ার। ছবি: সংগৃহীত
পঞ্চাশ বছর বয়সী মাইকেলের মৃত্যুর খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যমে। কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। সবাই একসঙ্গে ব্রাউজ করায় ওয়েবট্রাফিকে পড়ে অস্বাভাবিক চাপ। অপ্রত্যাশিত এত ব্যবহারকারী দেখে গুগল ধরেই নেয় তাদের সার্চ ইঞ্জিনে কেউ হামলা করেছে! ইনস্ট্যান্ট মেসেঞ্জার, ইউটিউব, উইকিপিডিয়া সহ অনেক জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের সার্ভার ক্র্যাশ করে। প্রতি মিনিটে ছয় হাজারের বেশি টুইটের চাপ নিতে পারেনি সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট টুইটার। ৪০ মিনিট ওয়েবসাইটটি ছিল ক্র্যাশড অবস্থায়।

২০০৯ সালের ৭ জুলাই লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টেপলস্ সেন্টারে মাইকেলের কফিন বহন করছেন তার ভাইয়েরা। ছবি সূত্র: সিএনএন
পঞ্চাশ বছর বয়সী মাইকেলের মৃত্যুর খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যমে। কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। সবাই একসঙ্গে ব্রাউজ করায় ওয়েবট্রাফিকে পড়ে অস্বাভাবিক চাপ। অপ্রত্যাশিত এত ব্যবহারকারী দেখে গুগল ধরেই নেয় তাদের সার্চ ইঞ্জিনে কেউ হামলা করেছে! ইনস্ট্যান্ট মেসেঞ্জার, ইউটিউব, উইকিপিডিয়া সহ অনেক জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের সার্ভার ক্র্যাশ করে। প্রতি মিনিটে ছয় হাজারের বেশি টুইটের চাপ নিতে পারেনি সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট টুইটার। ৪০ মিনিট ওয়েবসাইটটি ছিল ক্র্যাশড অবস্থায়।

বিশ্ব আর দেখবে না এই অবিস্মরণীয় ভঙ্গিমা।

মাইকেলের কথিত সাবেক প্রেমিকা পপ কুইন ম্যাডোনা বলেন,
“I can’t stop crying over the sad news. I have always admired Michael Jackson. The world has lost one of the greats, but his music will live on forever! My heart goes out to his three children and other members of his family. God bless.”
মাইকেল জ্যাকসনের মতো মহান শিল্পীর আসলেই মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন তার শত কোটি ভক্তের হৃদয়ে, তার গানের মধ্য দিয়ে।
