Logo
Logo
×

লাইফস্কেপ ।  ফ্যাশন

ক্লডিয়া শিফারের গল্প সৌন্দর্যের চেয়েও বড়

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬। ০৪:২৫ পিএম

আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬। ২২:৪২ পিএম

ক্লডিয়া শিফারের গল্প সৌন্দর্যের চেয়েও বড়

ক্লাউডিয়া শিফার হলেন নব্বই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল জার্মান সুপারমডেল, ফ্যাশন ডিজাইনার ও অভিনেত্রী। ১৯৭০ সালের ২৫ আগস্ট জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এই মডেল কার্ল লাগারফেল্ড ও ভারসাচির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের মিউজ হিসেবে কাজ করেছেন এবং হাজারটিরও বেশি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান পেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন। 

ফ্যাশনের ইতিহাসে কিছু মুখ শুধু সুন্দর নয়, তারা একটি সময়কে সংজ্ঞায়িত করে। ১৯৯০ এর দশকের ফ্যাশন বলতেই যে কয়েকটি মুখ প্রথমে মনে আসে, ক্লডিয়া শিফার তাদের অন্যতম। দীর্ঘ স্বর্ণকেশী চুল, নীল চোখ, নিখুঁত মুখাবয়ব এবং এক ধরনের স্বাভাবিক গ্ল্যামার, সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে পরিচিত মডেলদের একজন। ভোগ তাকে সুপারমডেল যুগের অন্যতম স্থায়ী তারকা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

শুরুটা ছিল একেবারেই অন্যরকম

জার্মানির রাইনবার্গে জন্ম নেওয়া ক্লডিয়া শিফার কৈশোরে কখনো পেশাদার মডেল হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ডুসেলডর্ফের একটি নাইটক্লাবে একজন মডেল এজেন্টের নজরে পড়েন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর ফ্যাশন যাত্রা। কিন্তু মডেলিং জগতে তার প্রথম বড় সাফল্য আসে গেস জিন্স-এর মাধ্যমে। ১৯৮৯ সালে ফটোগ্রাফার এলেন ভন আনওয়ের্থ-এর সঙ্গে করা গেস ক্যাম্পেইন তাকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। ক্লডিয়া নিজেই পরে বলেছেন, ওই ক্যাম্পেইনই তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। গেসের ছবিতে তার চেহারায় তৈরি হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট চরিত্র—স্বর্ণকেশী, আত্মবিশ্বাসী, আকর্ষণীয় এবং একই সঙ্গে সহজে মনে থাকার মতো। তখন থেকেই তিনি পরিচিত হতে থাকেন “গেস গার্ল” হিসেবে।

গেস থেকে শ্যানেল

ক্লডিয়ার ক্যারিয়ারের পরবর্তী বড় অধ্যায়ের নাম কার্ল ল্যাগারফেল্ড। গেসের প্রচ্ছদে তাকে দেখার পর ল্যাগারফেল্ড তাকে শ্যানেলের জন্য বেছে নেন। এরপর ক্লডিয়া হয়ে ওঠেন শ্যানেলের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং ল্যাগারফেল্ডের গুরুত্বপূর্ণ মিউজদের একজন। এই সম্পর্কটি শুধু একটি ব্র্যান্ড ও একজন মডেলের পেশাগত সহযোগিতা ছিল না।

ক্লডিয়া নিজেই পরে বলেছেন, কার্ল ল্যাগারফেল্ড তাঁর জীবনে এক ধরনের “ম্যাজিক ডাস্ট” ছড়িয়ে দিয়েছিলেন—একজন লাজুক তরুণীকে আত্মবিশ্বাসী সুপারমডেলে রূপান্তরিত করতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই গেসের “ব্লন্ড বম্বশেল” ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন শ্যানেলের পরিশীলিত ফ্যাশন দুনিয়ার মুখ।

যখন মডেলরাই হয়ে উঠলেন তারকা

ক্লডিয়া শিফার ও সিন্ডি ক্রফোর্ড | রেভলন, ১৯৯২ ছবি: ব্রুস ওয়েবার

১৯৮০-এর শেষ থেকে ১৯৯০-এর দশকে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে একটি বড় পরিবর্তন ঘটছিল। আগের সময়ের মডেলরা মূলত পোশাকের প্রদর্শক ছিলেন। কিন্তু সুপারমডেল যুগে মডেল নিজেই হয়ে উঠলেন ব্র্যান্ডের পরিচয়, প্রচারণার কেন্দ্র এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির তারকা। ক্লডিয়া সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান মুখ। তিনি রানওয়েতে হেটেছেন, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন করেছেন, অসংখ্য ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে এসেছেন এবং টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রেও উপস্থিত হয়েছেন। ক্লডিয়া নিজেও পরবর্তী সময়ে বলেছেন, সেই সময়ের সুপারমডেলদের খ্যাতি শুধু ক্যাটওয়াকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা রকস্টারের মতো জনপ্রিয়তা পেতেন।

ভোগের প্রচ্ছদ থেকে বিশ্বখ্যাতি

ক্লডিয়া শিফারের ক্যারিয়ারে ম্যাগাজিন প্রচ্ছদের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। ভোগ-এর হিসাবে তার ১৬টি ভোগ প্রচ্ছদ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তিনি কাজ করেছেন হেলমুট নিউটন, রিচার্ড অ্যাভেডন, প্যাট্রিক ডেমারশেলিয়ে, স্টিভেন মেইজেল, অ্যানি লেইবোভিটজ সহ ফ্যাশন ফটোগ্রাফির বহু কিংবদন্তির সঙ্গে। মডেলস ডটকমের আর্কাইভে তার কাজের তালিকায় শত শত সম্পাদকীয়, বিজ্ঞাপন, ম্যাগাজিন প্রচ্ছদ এবং রানওয়ে উপস্থিতি রয়েছে। বর্তমানে সাইটটি তাকে “লেজেন্ডস” এবং “আইকনস”—দুই শ্রেণিতেই রেখেছে।

শুধু স্বর্ণকেশী সৌন্দর্য নয়

ক্লডিয়াকে শুধু “ব্লন্ড বম্বশেল” হিসেবে দেখলে তার ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি ছোট করে দেখা হবে। তিনি একদিকে ছিলেন গেসের বাণিজ্যিক তারকা, অন্যদিকে শ্যানেলের মতো উচ্চ ফ্যাশনের মুখ। আবার ভার্সাচে, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কাজেও তিনি নিজের উপস্থিতি তৈরি করেছেন। এই বহুমুখিতাই তাকে তার সময়ের অন্য অনেক মডেলের থেকে আলাদা করেছে। তিনি একটি নির্দিষ্ট ধরনের সৌন্দর্যের মধ্যে আটকে থাকেননি; বরং বিজ্ঞাপন, সম্পাদকীয়, রানওয়ে এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতি, সবখানেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। 

১৯৯৫ সালে শ্যানেল এর ফটোশুটে ক্লডিয়া শিফার | ছবি: কার্ল ল্যাগারফেল্ড

৯০ দশকের সেই দল

ক্লডিয়া শিফারের গল্প আসলে একা কোনো গল্প নয়। নাওমি ক্যাম্পবেল, সিন্ডি ক্রফোর্ড, ক্রিস্টি টার্লিংটন, লিন্ডা ইভানজেলিস্তা—তাঁদের সঙ্গে একই সময়ে কাজ করতে গিয়ে তৈরি হয়েছিল এমন এক প্রজন্ম, যাদের নাম মানুষ পোশাকের ব্র্যান্ডের মতোই চিনত। ক্লডিয়া নিজেই পরে সেই সময়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ৯০-এর দশকের সুপারমডেলরা বিভিন্ন দেশ ও ভিন্ন ভিন্ন চেহারা থেকে এসেও একসঙ্গে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। এ কারণেই “সুপারমডেল” শব্দটির অর্থও বদলে যায়। মডেল আর শুধু মডেল থাকেননি। তারা হয়ে উঠেছিলেন নাম।

ক্যামেরার সামনে থেকে ক্যামেরার পেছনে

ক্লডিয়ার ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফ্যাশনের ইতিহাস সংরক্ষণে তার আগ্রহ। ২০২১ সালে তিনি ডুসেলডর্ফের কুনস্টপালাস্ট জাদুঘরে ১৯৯০-এর দশকের ফ্যাশন ফটোগ্রাফি নিয়ে “ক্যাপটিভেট!” প্রদর্শনী কিউরেট করেন এবং একই সঙ্গে সেই প্রদর্শনীর বই প্রকাশে যুক্ত ছিলেন। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে নারী একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ৯০-এর দশকের ফ্যাশন ইতিহাস তৈরি করেছিলেন, তিনিই পরে সেই সময়ের ছবিগুলো সংগ্রহ, নির্বাচন ও সংরক্ষণের কাজেও যুক্ত হন। অর্থাৎ তিনি শুধু ইতিহাসের অংশ নন—ইতিহাসের একজন সংরক্ষকও। 

আজও কেন ক্লডিয়া প্রাসঙ্গিক?

ক্লডিয়া শিফারের ক্যারিয়ার ৯০-এর দশকে থেমে যায়নি। মডেলস ডটকমের সাম্প্রতিক আর্কাইভে ২০২৫ সালেও তাঁর ডোনা কারান, টমি হিলফিগার, বালেন্সিয়াগা, ভার্সাচে ও ক্লোয়ের মতো ব্র্যান্ডের ক্যাম্পেইনে কাজের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ যে মুখটি ১৯৯০-এর দশকের সুপারমডেল যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছিল, সেটি এখনও সমসাময়িক ফ্যাশনেও প্রাসঙ্গিক।

ফ্যাশন বদলেছে। সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলেছে। ম্যাগাজিনের যুগ বদলে গেছে। কিন্তু কিছু মুখ সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। ক্লডিয়া শিফার তেমনই একটি মুখ।


তথ্যসূত্র: ভোগ, মডেলস ডটকম, ক্লডিয়া শিফারের নিজস্ব সাক্ষাৎকার ও সংশ্লিষ্ট আর্কাইভ। 

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে