প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
ফিউচারিস্টিক স্থাপত্যে যে কারণে অনন্য জাহা হাদিদ
জাহা হাদিদ। ছবি: ব্রিজিত লাকোম্ব
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৩:৪৬ পিএম
আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৮:৪৯ পিএম
যে যুগে স্থাপত্যকলা মানেই ছিল সোজা দেয়াল, চারকোনা ঘরের ইট-পাথরের একঘেয়ে খাঁচা আর জ্যামিতিক সীমানার চেনা ছক—সেই যুগে দাঁড়িয়ে একজন নারী এসে পৃথিবীর মানুষকে দেখালেন অন্য এক দৃশ্য। তিনি ইট, কাঠ আর কনক্রিট দিয়ে তৈরি করলেন নদীর মতো বহমান ঢেউ, বাতাসের মতো গতিময় রেখা আর মহাকাশের মতো অসীমতার অনুভূতি। যাকে দেখে মনে হতো পৃথিবীর অভিকর্ষ বল বুঝি তার বানানো দালানগুলোর কাছে এসে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে! তিনি কেবল একজন স্থপতি ছিলেন না; একাধারে ছিলেন ফ্যাশন ডিজাইনার, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, আধুনিক চিত্রশিল্পী এবং সর্বোপরি এক অদম্য মানসিকতার মূর্ত প্রতীক। সৃজনশীলতা আর প্রযুক্তির মেলবন্ধনকে যিনি এক অলৌকিক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তার নাম—জাহা হাদিদ।

পেইন্টিং এর আদলে ভিট্রা ফায়ার স্টেশনের একটি অভ্যন্তরীণ দৃশ্য। ছবি: ভিত্রা
আজকে যিনি স্থাপত্যের সম্রাজ্ঞী হিসেবে বিশ্বজুড়ে নন্দিত, তার এই সাফল্যের পথটি কিন্তু মোটেই মসৃণ বা কার্পেট বিছানো ছিল না। জীবনজুড়ে বহু কঠিন বাধা আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে তাকে এগোতে হয়েছে। প্রথমত, স্থাপত্যের দুনিয়াটি ছিল পুরোপুরি পুরুষশাসিত এক জগৎ; সেখানে একজন নারী হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা ছিল প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিমে গিয়ে কাজ করার কারণে পদে পদে তার গায়ে লেগেছে ‘বিদেশি’ কিংবা অভিবাসীর ট্যাগ। আর সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার চিন্তাভাবনা! সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি যে ধরনের স্থাপত্যের স্বপ্ন দেখতেন, অনেক সহকর্মী ও সমালোচক সেগুলোকে বলতেন—অতিরিক্ত ব্যয়বহুল, অবিশ্বাস্য এবং অদ্ভুত বাস্তবতাহীন এক কল্পনা। কিন্তু জাহা তো সাধারণ মেধার মানুষ ছিলেন না। কোনো বাঁধাই তাকে থামাতে পারেনি। সামাজিক কুসংস্কার, বর্ণবাদ আর লিঙ্গবৈষম্যকে তিনি ঠিক সেভাবেই দুমড়ে-মুচড়ে জয় করেছিলেন, ঠিক যেভাবে তার তৈরি স্থাপনাগুলো জয় করেছিল পৃথিবীর অভিকর্ষ শক্তিকে! স্থপতি সম্পর্কিত মানুষের শত বছরের প্রচলিত ধারণাকে এক ঝটকায় বদলে দেওয়া এই কিংবদন্তি সত্যি এক অনন্য অধ্যায়।

স্টার্লিং প্রাইজ বিজয়ী স্থাপনা এভেলিন গ্রেস অ্যাকাডেমি। ছবি: আইজিএসএমএজি ডট কম
জাহা হাদিদের আঁকা কোনো বিল্ডিংয়ের নকশা যখন প্রখ্যাত প্রকৌশলীদের টেবিলে আসত, তখন তাদের চোখ কপালে উঠত। খাতা-কলমে জাহার আঁকা সেই বাকযুক্ত, জ্যামিতিক প্রথাভাঙা বিস্ময়গুলোকে বাস্তব রূপ দিতে গিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতেন পৃথিবীর বাঘা বাঘা ইঞ্জিনিয়াররা। কীভাবে সম্ভব কনক্রিট আর গ্লাস দিয়ে এমন একটা দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা, যা দেখতে মনে হয় শূন্যে ভেসে আছে? প্রকৌশলীরা যখন জাহার নকশা দেখে দরদালানের পিলারের হিসাব মেলাতে পারতেন না, তখন জাহা কেবল একগাল হেসে তাদের উত্তর দিতেন। তার সেই বিখ্যাত উক্তি আজ স্থাপত্যের ইতিহাসেও এক চিরন্তন বাণী হয়ে আছে। জাহা বলতেন, "আমি অভিকর্ষকে স্রেফ ভুলে যেতে চাই, আমি চাই আমার স্থাপত্য শূন্যে ভেসে থাকুক।" প্রথাগত নির্মাণ প্রযুক্তিকে টেনে হিঁচড়ে একদম শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়া ছাড়া প্রকৌশলীদের সামনে আর কোনো উপায় থাকত না।

জাহা হাদিদের অনন্য নির্মান বাকু হায়দার আলিয়েভ সেন্টার। ছবি:নিউজ ডট ইয়াহু ডট কম
কিন্তু জাহার এই বাঁধভাঙা কল্পনা আর অসীম সাহসের উৎস কোথায় ছিল? এই গল্পের উত্তর লুকিয়ে আছে তার শৈশবে। ১৯৫০ সালের ৩১ অক্টোবর, ইরাকের ঐতিহাসিক বাগদাদ শহরে জন্ম নেন জাহা। আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত অশান্ত বাগদাদকে দেখলে সেকালের চিত্র কল্পনা করাও কঠিন। পঞ্চাশের দশকের বাগদাদ ছিল এক অন্যরকম শহর—আধুনিকতা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা আর মুক্ত চিন্তার এক প্রাণবন্ত স্বর্গরাজ্য। জাহার জন্ম হয়েছিল এক অত্যন্ত প্রভাবশালী, ধনকুবের ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবারে। তিনি এমন এক মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে নারী ও পুরুষের মধ্যে স্বাধীনতার কোনো কৃত্রিম ভেদাভেদ ছিল না। সে সময় লে কোরবুজিয়ে-র মতো বিশ্বখ্যাত আধুনিক স্থপতিদের কাজের ছোঁয়ায় বাগদাদ শহরটি নতুন করে গড়ে উঠছিল। আধুনিক স্থাপত্যের সেই জোয়ার অত্যন্ত কাছ থেকে দেখে জাহার বালিকা মন শিহরিত হতো।
বাবার বিপুল আর্থিক স্বচ্ছলতা আর প্রগতিশীল মানসিকতার কারণে শৈশবেই পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণের সুযোগ পান জাহা। রোম, প্যারিস কিংবা লন্ডনের শতবর্ষী প্রাসাদ থেকে শুরু করে আধুনিক জাদুঘরগুলো তিনি গভীর চোখে পর্যবেক্ষণ করতেন। তবে তার ভেতরের শিল্পী মনটিকে সবচেয়ে বেশি রূপ দিয়েছিলেন তার মা। জাহার মা ছিলেন একজন দারুণ শিল্পীমনা মানুষ। মায়ের হাত ধরেই ছোটবেলায় জাহার প্রথম হাতেখড়ি হয়েছিল ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে। সাধারণ বয়সের অন্য সব মেয়েরা যখন পুতুল খেলায় ব্যস্ত, তখন জাহা ব্যস্ত থাকতেন নিজের ঘরের ভেতরের আসবাবপত্রের অবস্থান পরিবর্তন করতে, নিজের জামাকাপড় নিজে কাস্টমাইজ করে কাটছাঁট করতে কিংবা অদ্ভুত সব আলপনা আঁকতে। সমবয়সী যেকোনো মেয়ের চেয়ে চিন্তাভাবনা আর রুচিবোধে তিনি ছিলেন অনেকখানি এগিয়ে।

ইতালির রোম শহরে অবস্থিত যাদুঘর ‘Maxxi’ এর ইন্টেরিয়র। ছবি: জাহা হাদিদ আর্কিটেক্টস
বয়সের সাথে সাথে জাহার পড়াশোনার সীমানাও ছড়াতে থাকে। স্কুল ও কলেজের পাঠ শেষ করে তিনি প্রথমে পাড়ি জমান লেবাননে। ভর্তি হন বৈরুতের বিখ্যাত 'আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত'-এ। সেখান থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন গণিত বিষয়ে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, একজন হবু স্থপতির জন্য গণিত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল? প্রকৃতপক্ষে, বৈরুতে শেখা সেই জটিল গণিত, ক্যালকুলাস আর কঠিন জ্যামিতিক সমীকরণই পরবর্তীতে জাহার স্থাপত্যশৈলীর মূল শক্তি হয়ে উঠেছিল। তিনি গণিতের কাঠখোট্টা সংখ্যাগুলোকে আর্টে রূপান্তর করার বিদ্যা শিখে গিয়েছিলেন।
গণিতের পাঠ চুকিয়ে ১৯৭২ সালে জাহা চলে যান স্বপ্নের শহর ব্রিটেনে। ভর্তি হন বিখ্যাত ‘আর্কিটেকচারাল অ্যাসোসিয়েশন স্কুল অব আর্কিটেকচার’-এ। মূলত এখানেই একজন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে আন্তর্জাতিক মানের স্থপতি জাহা হাদিদের আসল রূপান্তর ঘটে। তার অসাধারণ মেধা আর কাজের বৈপ্লবিক ধরণ দেখে স্কুলের শিক্ষকরা স্তম্ভিত হয়ে যেতেন। পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি সেই একই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে বিশ্ববরেণ্য বহু স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতা করেছেন এবং তৈরি করে গেছেন শত শত যোগ্য শিষ্য।
শিক্ষকতা ও চর্চার এই দিনগুলোতে জাহার চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন বিখ্যাত রাশিয়ান সুপ্রিমেটিস্ট চিত্রশিল্পী কাজিমির মালেভিচ। মালেভিচের ক্যানভাসে থাকা বিচ্ছুরিত আকৃতি, ভাসমান জ্যামিতি আর রঙের স্বাধীনতা জাহার মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। জাহা ভাবলেন, মালেভিচ যা এঁকেছেন ক্যানভাসের দুই মাত্রায়, তিনি সেটাকে ফুটিয়ে তুলবেন কনক্রিট, লোহা আর কাঁচের ত্রিমাত্রিক বাস্তবতায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল তার শৈশবে শেখা আরবি ক্যালিগ্রাফির সেই বাঁকানো, সাবলীল আর বহমান রেখাগুলো। এই তিনের অপূর্ব সংমিশ্রণে জন্ম নিল এক সম্পূর্ণ নতুন ধরনের স্থাপত্য শৈলী।

লন্ডন অ্যাকুয়াটিকস সেন্টার। ছবি: ছবি: আর্কিটেক্টস জার্নাল ডট কো ডট ইউকে
জাহা যখন বড় বড় শহরের জন্য বিশাল সব প্রজেক্টের স্কেচ ও থ্রি-ডি মডেল জমা দিতেন, তখন স্থপতি ও সমালোচকরা বাকরুদ্ধ হয়ে যেতেন। অনেকেই তার কাজকে আধুনিক সংজ্ঞায় ফেলার জন্য একে 'নিও-ফিউচারিস্টিক' বা 'ডিকনস্ট্রাকশনিস্ট' নামে আখ্যায়িত করতেন। স্থাপত্য দুনিয়ায় তার এই অবিসংবাদিত প্রভাবের জন্য পরবর্তী সময়ে তার নামের পাশে যুক্ত হয় ‘স্টার্কিটেক্ট’ বা স্থপতিদের মহাতারকা উপাধি। তবে সমস্ত সংজ্ঞা আর অ্যাকাডেমিক পরিভাষাকে ছাপিয়ে জাহার কাজগুলো সবসময়ই হতো একেবারে অদ্বিতীয়, যার সাথে অন্য কারো তুলনা চলে না। তার হাতে আঁকা একটি প্রাথমিক প্রজেক্টের নকশাও সাধারণ কোনো আর্কিটেকচারাল নকশা থাকত না, তা হয়ে উঠত বিশ্বমানের এক একটি চিত্রশিল্প।
পরবর্তীতে পলিট অলিম্পিক অ্যাকুয়াটিকস সেন্টার, চীনের গুয়াংজু ওপেরা হাউস কিংবা আজারবাইজানের হাইদার আলিয়েভ সেন্টারের মতো বিখ্যাত সব অসামান্য স্থাপত্য তৈরি করে তিনি বিশ্বকে চমকে দেন। তিনি প্রমাণ করেন, পুরুষশাসিত এই প্রথাগত বিশ্বে একা লড়াই করেও ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্থায়ী করা যায়। তিনি ইট-পাথরের শক্ত অবকাঠামোকে দিয়েছেন নদীর মতো মিষ্টি বহমানতা আর বাতাসের মতো নিজস্ব স্বাধীনতা। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার সেই অভিকর্ষহীন বিস্ময়কর স্থাপত্যগুলো যুগ যুগ ধরে বলে যাবে এক অপরাজেয় নারীর গল্প—যার নাম জাহা হাদিদ!
