প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
ভারতে ব্রিকস সম্মেলন: এজেন্ডায় কী আছে, কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ
ধনী পশ্চিমা দেশগুলোর দাপট কমাতে ব্রিকসকে এখন একটা বড় জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এবারের সম্মেলনে ডজনেরও বেশি দেশের শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৮:৫০ পিএম
আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৩:৫৮ পিএম
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সম্মেলনের আয়োজন করছেন। পুরো শহরজুড়ে ব্রিকসের নানা ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলছে, আর বড় বড় ভবন ও গোলচত্বরগুলো আলো দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।
ধনী পশ্চিমা দেশগুলোর দাপট কমাতে ব্রিকসকে এখন একটা বড় জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এবারের সম্মেলনে ডজনেরও বেশি দেশের শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
সম্মেলনের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে অতিরিক্ত ৩০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ভিআইপি অতিথিরা যেসব হোটেলে থাকছেন, সেগুলোর আশেপাশের রাস্তায় সাধারণ গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
সম্মেলনে যোগ দিতে শুক্রবারই নয়াদিল্লি পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মোদির সঙ্গে তাদের একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হয়েছে।
সাত বছর পর ভারত সফরে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, যিনি আজ সকালে দিল্লি এসে পৌঁছান।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর—দুই দিনের এই সম্মেলনটি এমন সময়ে হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে আক্রমণ করছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ থামছে না, আর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার একদম এলোমেলো হয়ে গেছে।

ভারতের নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আগে দেশিটর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি সম্বলিত একটি বিশাল বিজ্ঞাপনী ফলকের পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স
তবে ব্রিকসের নিজের ভেতরেও কিছু কোন্দল আছে। ইরান হামলা নিয়ে সদস্যদের ভিন্ন মত, ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান সমর্থিত হুথিদের লড়াই, আর ভারত-চীন সীমান্ত সমস্যা নিয়ে ভেতরে ভেতরে বেশ টানাপোড়েন চলছে।
তাহলে কীভাবে এই জোট তাদের নিজেদের ভেতরের ঝামেলা মেটাবে, আর সম্মেলনে এবার মূল বিষয়ই বা কী হতে যাচ্ছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক:
ব্রিকস আসলে কী?
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা—এই পাঁচ দেশের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে ‘ব্রিকস’ গঠন করা হয়।
২০০৬ সালে এই অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য জোটের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন প্রথম সম্মেলন করে। এর এক বছর পর যোগ দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
২০২৩ সালে নতুন সদস্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।
একই সময়ে আর্জেন্টিনাকেও দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ডিসেম্বরে নির্বাচিত হয়ে তাদের প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই পশ্চিমাবিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর ঘোষণা দেন এবং প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়।
বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা ১১। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ মানুষের বসবাস এই দেশগুলোতে, আর বৈশ্বিক অর্থনীতির (জিডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশ এই জোটের দখলে।
উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর এই জোটের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা। প্রতিবছর পালাক্রমে সদস্য দেশগুলোতে শীর্ষ সম্মেলন হয়। এটি তাদের ১৮তম সম্মেলন।

নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের আগে ১১ সেপ্টেম্বর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স
এবারের সম্মেলনে কারা অংশ নিচ্ছেন?
ব্রিকসের মূল দেশগুলোর বেশিরভাগ শীর্ষ নেতাই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। আছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। শুধু ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা দেশের স্থানীয় নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেননি, তার জায়গায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা।
নতুন যুক্ত হওয়া দেশগুলোর অবস্থাও একই রকম:
- ইরানের পক্ষ থেকে আছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
- মিশরের প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি।
- ইথিওপিয়া থেকে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ।
- ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রেসিডেন্ট প্রাভোবো সুবিয়ানতো।
তবে সৌদি আরব ও আমিরাত থেকে প্রধান রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে:
- সৌদি আরবের পক্ষে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদ।
- আর আমিরাতের পক্ষে এসেছেন আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
অন্যান্য আমন্ত্রিত বিশ্বনেতাদের মধ্যে আছেন:
- মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম
- ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ আর মার্কোস জুনিয়র
- ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী লে মিন হাং
- নাইজেরিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশিম শেত্তিমা
- বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট এভারিস্তে এনদাইশিমিয়ে
- কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পারিয়া
- উগান্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসিকা আলুফো
- উরুগুয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিও লুবেটকিন
- বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি
- কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ
এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদ্রোস আধানোম গেব্রেয়েসুস এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা এই সম্মেলনে উপস্থিত আছেন।
এজেন্ডায় বা মূল আলোচনায় কী থাকছে?
বিশ্বের অর্থনীতির ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর যে একচ্ছত্র প্রভাব আছে, সেটাকে কিছুটা সামলে তোলাই ব্রিকসের মূল লক্ষ্য।
ভারত যেহেতু এবার স্বাগতিক দেশ, তাই এবারের মূল প্রতিপাদ্য হলো, “সংকট মোকাবেলায় সক্ষমতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন।”
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অর্থনীতি চাঙ্গা রাখা
এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তি শেয়ার করার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে।
ফরাসি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নাতিভিসের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেছেন, রাশিয়া ও ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে বিকল্প উপায়ে দেশগুলোর মধ্যে লেনদেন কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে নেতারা কথা বলবেন।
তবে আল জাজিরাকে তিনি বলেছেন, “তারা কিন্তু ডলারকে একদম সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে না।”
দিল্লির এই সম্মেলনে ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল কারেন্সিতে বাণিজ্য লেনদেনের বিষয়ে রাশিয়া কথা বলবে বলে বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তক্ষশীলা ইনস্টিটিউটের গবেষক মনোজ কেওয়ালরামানি বলছেন, “বিশ্বে নানা ধরনের যুদ্ধ ও টানাপোড়েন চলায় সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে স্বাভাবিক থাকে এবং ঝুঁকি কমানো যায়, নেতারা মূলত সেই বিষয়গুলোতেই নজর দিচ্ছেন।”
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার ছয় মাস পর এই সম্মেলন হচ্ছে। গত মে মাসে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এই হামলার বিষয়ে যৌথ কোনো নিন্দা প্রস্তাব পাস করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজে এই সম্মেলনে আছেন, ফলে যুদ্ধ নিয়ে কথা ওঠার সম্ভাবনা বেশি। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটিই তার প্রথম ভারত সফর, আর আট বছর পর কোনো ইরানি প্রেসিডেন্ট ভারতে এলেন।
হংকং ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আলেজান্দ্রো রেয়েস বলেন, “ইরান ব্রিকসের সদস্য। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় সমস্যা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে।”
তবে তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধের কারণে ব্রিকসের দুই সদস্য—ইরান ও আমিরাতের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তাই সম্মেলনে সব দেশের মত মিলিয়ে কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া বেশ কঠিন হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরুর পর ইরানও ছেড়ে কথা বলেনি। গলফ অঞ্চলের একাধিক আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি ও বেসামরিক এলাকায় তারা ক্ষেপণাস্ত্র চালিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে আমিরাতেও। ইরানি হামলায় আমিরাতে এখন পর্যন্ত ১৫ জন মারা গেছেন, যার মধ্যে দুজন সেনা সদস্য ও ১২ জন সাধারণ নাগরিক। এর জেরে আগস্টে ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে আমিরাত।
ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ
সম্মেলনে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
তবে মনোজ কেওয়ালরামানির মতে, ইউক্রেন ইস্যুতে গত কয়েক বছর ধরেই কথা হচ্ছে। এবার হয়তো প্রতিনিধিরা আলোচনা করবেন কীভাবে সব ব্রিকস দেশের স্বার্থ রক্ষা করে এই যুদ্ধের বিষয়টিতে একটি জায়গায় আসা যায়।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে ১৭তম সম্মেলনের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে রাশিয়ার সরাসরি কোনো সমালোচনা করা হয়নি। উল্টো ইউক্রেন কীভাবে রাশিয়ায় হামলা চালিয়েছে, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, “আমেরিকান ও রাশিয়ানরা যেহেতু এখন আলোচনা করছে, তাই আমার মনে হয় না যে এই বছর যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের যৌথ বক্তব্যে বড় কোনো সমস্যা হবে।”
চলতি মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনার মস্কোতে গিয়ে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধ থামাতেই ট্রাম্প এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা যুদ্ধ থামানোর একটা প্রস্তাব নিয়ে পাঠিয়েছে, আর রাশিয়ার কর্মকর্তারাও এই সফরকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ১১ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে পৌঁছান মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। ছবি: ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
এবারের সম্মেলন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জার্মান মার্শাল ফান্ডের প্রতিনিধি ইয়ান লেসার বলছেন, ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক যখন খারাপের দিকে, তখন ব্রিকস সম্মেলনকে পুতিন কাজে লাগাতে চান। এর মাধ্যমে তিনি দেখাতে চান যে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের বড় দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক এখনো খুব ভালো।
তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নীতি নিয়ে অনেক দেশই চিন্তিত। চীন ও রাশিয়া চাইলে সেই সুযোগটা নিয়ে অন্য দেশগুলোকে নিজেদের কাছে টানতে পারে।”
এছাড়া এই সম্মেলনের সময়টাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক দুদিন পরই, অর্থাৎ ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসছেন।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ঝো বো আল জাজিরাকে জানান, ব্রিকস সম্মেলন প্রতি বছরই হয়, তবে সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের ভারত আসাটা বড় ঘটনা।
তিনি বলেন, “বেইজিং ও দিল্লির সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই ঠান্ডা হয়ে ছিল। ফলে শি জিনপিং ও মোদির জন্য নিজেদের মনোমালিন্য মেটানোর এটি একটি দুর্দান্ত সুযোগ।”
সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকট ও চলমান যুদ্ধগুলোর মধ্যে ব্রিকস সম্মেলন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিশ্ব ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
তিনি আরও যোগ করেন, “ভবিষ্যতে ব্রিকসকে দুটি প্রধান সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমটি ব্রাজিল সামনে এনেছে—ডলারের বদলে নিজেদের মুদ্রায় ব্যবসা কীভাবে বাড়ানো যায়। তবে ব্রিকসের সব দেশের অর্থনৈতিক শক্তি সমান না হওয়ায় এটা রাতারাতি সম্ভব নয়।”
“দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বিশ্ব রাজনীতিতে এই জোট কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে। কারণ মূল সদস্য দেশগুলো নিজেরাই এখন নানা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তাই সবাইকে খুশী রেখে একটা সাধারণ বিষয়ে একমত হওয়া তাদের জন্য কঠিন হবে।”
ব্রিকস দেশগুলোর প্রধান বিরোধগুলো কী কী?
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার পর জিওপলিটিক্স বা ভূ-রাজনীতি নিয়ে ব্রিকসের নিজেদের ভেতরের পার্থক্য আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
কেওয়ালরামানি মনে করেন, ব্রিকস কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম না নিয়ে যুদ্ধ নিয়ে কথা বলবে।
“তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম সরাসরি বলবে বলে মনে হয় না। কোনো দেশকে আক্রমণ না করে সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সবার স্বার্থ রক্ষার ওপর জোর দিয়ে একটা সাধারণ বক্তব্য দেওয়া হতে পারে।”
জুলাই মাসে ইয়েমেন সরকার হুথিদের দখলে থাকা সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায়, যাতে ইরান থেকে আসা অস্ত্রবাহী বিমান অবতরণ করতে না পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুপক্ষই সংঘাত এড়িয়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে সায় দিয়েছেন।
সম্প্রতি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সীমান্ত সমস্যা ও বাণিজ্যিক ঘাটতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা থেকেই গেছে।
অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ঝো বো বলছেন, চীন নিজেকে গ্লোবাল সাউথ বা বিকাশমান বিশ্ব ব্যবস্থার নেতা হিসেবে ব্রিকসে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু ভারতসহ অনেকেই চীনকে এই দলের অংশ মনে করে না, তারা চীনকে সুপারপাওয়ার বা মহাপরাশক্তি হিসেবে দেখে।
তবে চীন সবসময় দাবি করে আসছে তারা উদীয়মান দেশগুলোর কাতারেই আছে এবং এই সম্মেলকেও সেভাবেই দেখে।
ব্রিকসের মূল উদ্দেশ্যটা কী?
কেওয়ালরামানি মনে করেন, ভারত ও চীন নিজেদের সীমান্ত সমস্যা আলাদাভাবে মেটানোর চেষ্টা করলেও, ব্রিকসের আসল কাজ কী হবে—তা নিয়ে মতভেদ থেকেই যাবে।
“বেইজিং ব্রিকসকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে গ্লোবাল সাউথকে একত্রিত করতে চায় এবং পশ্চিমাবিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চায়।”
“কিন্তু ভারত ব্রিকসকে দেখে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, যেখানে তারা কারও নিয়ন্ত্রণে না থেকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং পশ্চিমা বিরোধী না হয়েও নতুন অংশীদার তৈরি করতে পারে।”
অন্যদিকে আলেজান্দ্রো রেয়েস বলেন, “রাশিয়া আর চীন ব্রিকসকে আমেরিকার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পছন্দ করলেও ভারত বা অন্য দেশগুলো একে আমেরিকা-বিরোধী জোট বানাতে একদমই আগ্রহী নয়।”
তবে তিনি মনে করেন, ন্যাটোর মতো ব্রিকসের সব বিষয়ে একমত হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
তিনি বলেন, “একে অপরের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই এই দেশগুলো এক হয়েছে। মূল প্রশ্ন এটা নয় যে ব্রিকস সব বিষয়ে একমত হতে পারছে কি না, বরং দেখতে হবে যে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তারা কীভাবে একসঙ্গে কাজের কাজটা করছে।”
পশ্চিমা বিশ্বের কি চিন্তা করা উচিত?
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার একক পররাষ্ট্রনীতির কারণে একদিকে যেমন পুরনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দুর্বল করছেন, অন্যদিকে ব্রিকসের মতো জোটগুলোকে আমেরিকার অর্থনীতির জন্য হুমকি মনে করছেন। তিনি একে ‘আমেরিকা-বিরোধী’ জোট হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন।
তবে কর্নেল ঝো বো মনে করেন, সব পশ্চিমা নেতা ব্রিকসকে আমেরিকা-বিরোধী হিসেবে দেখেন না। তবে বদলে যাওয়া এই বিশ্বে তারা ব্রিকসের দিকে কড়া নজর রাখছেন।
রেয়েস বলেন, ব্রিকস কোনো রাতারাতি আমেরিকা-বিরোধী সামরিক জোট হয়ে যাবে বা ডলার ধ্বংস করে ফেলবে—এমন চিন্তার কোনো কারণ ওয়াশিংটনের নেই।
এমনকি রাশিয়াও সম্প্রতি বলেছে যে তারা ডলারকে পুরোপুরি বিদায় দেওয়ার পক্ষে নয়।
“যুক্তরাষ্ট্রের ভাবা উচিত কেন এতগুলো বড় বড় দেশ ব্রিকসে যোগ দিতে চাইছে। কারণ তারা বাণিজ্যে আরও পথ খোলা রাখতে চায়, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বাড়াতে চায় এবং যেকোনো একক দেশের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক চাপ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে চায়।”
তিনি যোগ করেন, বর্তমানে অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেই আসছে।
“তাই ওয়াশিংটনের বোঝা উচিত, অন্য দেশগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টাকে তারা যদি শত্রুতা হিসেবে দেখে, তবে তা শেষ পর্যন্ত দেশগুলোকে ব্রিকসের দিকেই ঠেলে দেবে।”

