প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
শান্তিতে নোবেলজয়ী কে এই নাভি পিল্লাই?
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম প্রবক্তা নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর ৯ অক্টোবর একটি সমাবেশে বসে আছেন । ছবি: এএফপি
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬। ০২:৩২ পিএম
দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক নাভানেথাম নাভি পিল্লাইকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, আর এর মধ্য দিয়ে তিনি এই পুরস্কার পাওয়া পঞ্চম দক্ষিণ আফ্রিকান হলেন।
৯ অক্টোবর এই ঘোষণার সময় নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি পিল্লাইয়ের প্রশংসা করে বলেছে, তিনি বহু দশক ধরে যেভাবে গণহত্যা আর যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন, তা ছিল “আইনি দৃঢ়তা, ব্যক্তিগত সততা আর অসাধারণ সাহসিকতায়” ভরা।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের পক্ষে লড়াই করা থেকে শুরু করে সম্প্রতি জাতিসংঘের তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা চালানোকে নিশ্চিত করা পর্যন্ত—আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) এই বিচারক বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইনে কাজ করে আসছেন।
কেন তাকে বিশ্বের সর্বোচ্চ শান্তির পুরস্কার দেওয়া হলো, আসুন তা দেখি:
পিল্লাই কে?
নাভানেথাম পিল্লাই, যিনি নাভি পিল্লাই নামেই বেশি পরিচিত, ১৯৪০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশের বর্ণবাদী বিভাজনে থাকা ডারবান শহরে ভারতের তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি সেই প্রদেশের প্রথম নারী হিসেবে নিজের ল ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি দেশটির বহু বর্ণবাদবিরোধী কর্মীর পক্ষে আদালতে আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হন। এরপর তিনি রুয়ান্ডা বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করা হয়েছিল।
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার (ওএইচসিএইচআর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতি সম্প্রতি তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন, যা গত বছর জানিয়েছিল যে গাজায় গণহত্যা চালানোর জন্য ইসরায়েলই দায়ী।
বর্তমানে পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একজন বিচারক, যেখানে তিনি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো গণহত্যার মামলায় দায়িত্ব পালন করছেন।

ইতালিতে রোমা সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই। ছবি: জাতিসংঘ
কোন কাজের জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত?
পিল্লাই তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই নিজ দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলে কাটিয়েছেন। পড়াশোনার সময়েই তিনি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বয়কট ও মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। পরে তিনি ফিলিস নাইডু এবং স্ট্রিনি মুডলির মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় বর্ণবাদবিরোধী নেতাদের আইনি লড়াইয়ে শামিল হন।
১৯৭৩ সালে পিল্লাই এমন একটি আইনি লড়াই লড়েন, যা রোবেন দ্বীপে আটক রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য আইনি সহায়তাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছিল; যেখানে নেলসন ম্যান্ডেলাও বন্দি ছিলেন।
২০১৬ সালে ডিপ্লোম্যাটিক কুরিয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিল্লাই বলেছিলেন, তার শুরুর দিকের মানবাধিকার সংক্রান্ত কাজের ধারা “বর্ণবাদের সময়ে তার নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েই তৈরি হয়েছিল”।
তিনি বলেছিলেন, “আমি বহু প্রতিকূলতাকে নিজের সুবিধায় কাজে লাগিয়েছি; বর্ণবৈষম্যের মামলাগুলো লড়ার জন্যই আমাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন শিখতে হয়েছিল।”
পিল্লাই জাতিসংঘের এমন একটি তদন্ত কমিশনের প্রধান ছিলেন, যা ২০২৫ সালে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে।
সেই রিপোর্টের ওপর দেওয়া এক বিবৃতিতে পিল্লাই জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে এবং “সব ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে” সাধ্যমতো সব কিছু করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার ঘোষণার পর নুরেমবার্গ ফোরামে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রেসিডেন্ট সিলভিয়া ফার্নান্দেজ দে গুরমেন্দি ও নুরেমবার্গ নীতিমালা বিষয়ক আন্তর্জাতিক একাডেমির পরিচালক ক্রিস্টোফ সাফারলিংয়ের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী নাভানেথেম নাভি পিল্লাই (মাঝখানে)। শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল কমিটি তাঁকে এই পুরস্কার দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
কীসের জন্য তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে?
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, “শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অবদানের” জন্য পিল্লাইকে এই সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।
কমিটি তাকে “আমাদের সময়ের আন্তর্জাতিক আইনের মূল নীতিগুলোর অন্যতম মহান রক্ষক” বলে অভিহিত করেছে, যিনি রাষ্ট্র এবং জাতীয় নেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এবং “সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষদের আশার আলো দেখাতে” ভূমিকা রেখেছেন।
রুয়ান্ডা গণহত্যার ট্রাইব্যুনালে পিল্লাই যে ভূমিকা রেখেছিলেন, কমিটি সেটির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেছে, তার ভূমিকার কারণেই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, “ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধ; এমনকি গণহত্যার সমতুল্য হতে পারে”।
কমিটি আরও বলেছে, “একই মামলায় পিল্লাই আরেকটি আইনি নজির গড়তে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন— প্রথমবারের মতো কেবল অপপ্রচার চালানোর অপরাধেই এক আসামিকে গণহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।”
তার এই জয় কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ?
কমিটি জানিয়েছে, এমন একটা সময়ে পিল্লাইকে এই সম্মান দেওয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যখন আন্তর্জাতিক আইন “চরম চাপের মুখে রয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের শিকার হচ্ছে।”
মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক কর্মকর্তারাও একই সুর মিলিয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক বলেছেন, তার এই পুরস্কারটি “একটি স্বীকৃতি ও পুনর্ব্যক্তকরণ যে শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতাই সবচেয়ে জরুরি।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে বলেছেন, “আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের গভীর সংকটের মুহূর্তে” এই পুরস্কারটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা পিল্লাইয়ের “সাহস, সততা ও ন্যায়বিচারের প্রতি আজীবন অঙ্গীকারের” স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কারের প্রশংসা করেছেন।
পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকোন জেরলো বলেছেন, এটি “একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে শান্তি কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং সেইসব সাহসী মানুষের ওপর, যারা এগুলোকে রক্ষা করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।”
উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক গবেষণার অধ্যাপক অশোক সোয়াইন আল জাজিরাকে বলেছেন, পিল্লাইয়ের মনোনয়ন একটি “আনন্দদায়ক চমক” এবং “সম্ভাব্য সেরা পছন্দ”।
তিনি বলেন, নোবেল কমিটি সম্ভবত গণহত্যা ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে পিল্লাইয়ের আজীবন লড়াইয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনবিদের পুরস্কারটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি একটি বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে তিনি শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য, এবং যার প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানাররা “গণহত্যার” শিকার হচ্ছে বলে খারিজ হয়ে যাওয়া মিথ্যা দাবির পক্ষে দেশটির সাথে সংঘাতে জড়িয়েছিল।
তাছাড়া গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, যাকে অনেক সমালোচকই আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখেছিলেন।
এর আগে আইসিসি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
আইসিসি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জবাবে বলেছিল, এটি “একটি নিরপেক্ষ বিচারিক প্রতিষ্ঠান” এবং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাপরাধের শিকার মানুষদের বিরুদ্ধে এক “চরম আঘাত”। আদালত জানিয়েছিল, তারা “কোনো ধরনের বিধিনিষেধ, চাপ বা হুমকির তোয়াক্কা না করেই” নিজেদের কাজ চালিয়ে যাবে।
পিল্লাই কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন?
মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই বিষয়টি পিল্লাইয়ের নজরে আসে বলে মনে হয়েছে; তখন হাততালি দিতে থাকা সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। তাই আমার প্রশ্ন হলো, এটা কি সত্যি?”
তিনি ট্রাম্পের নাম টেনে রসিকতা করে বলেন, “আপনারা যদি আরেকটু জোরে হাততালি দেন, তাহলে আমি হয়তো ট্রাম্পের সঙ্গে এই পুরস্কার ভাগ করে নেব।”
খবরটি নিশ্চিত হওয়ার পর পিল্লাই জানান, তিনি এই পুরস্কারটি “আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার সব মানুষের” প্রতি উৎসর্গ করছেন।
“এই পুরস্কার আমার বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে যে আইনের শাসন, স্বাধীন আদালত এবং নীতিভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো রক্ষার জন্য আমাদের অবশ্যই একতাবদ্ধ হতে হবে।”
এর আগে নোবেল কমিটি জানিয়েছিল, তারা পিল্লাইকে খবরটি জানানোর জন্য ফোনে যোগাযোগ করতে বেগ পাচ্ছিল। কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ভাটনে ফ্রাইডনেস হাসিমুখে বলেন, “নরওয়ের কোনো নম্বর থেকে ফোন আসতে দেখলে দয়া করে ফোনটা তুলুন।”
