প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
নিজ হাতে টেলিস্কোপ বানিয়ে মহাকাশ জয় করছেন জুবায়ের কেওলিন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬। ০৭:১৩ এএম
আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬। ১৮:২৮ পিএম
- শেয়ার
- Messenger
- Telegram
- Threads
আপনি কে?
আমার নাম জুবায়ের কেওলিন। আমি ঢাকার একজন শৌখিন জ্যোতির্বিদ এবং অ্যাস্ট্রোফটো গ্রাফার। আমি নিজের হাতে নকশা করা এবং তৈরি করা টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মহাজাগতিক বস্তুর ছবি তুলি।
সবকিছুর শুরু কীভাবে হয়েছিল?
ছোটবেলা থেকেই মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। আমি ছোটবেলায় স্টার ট্রেক, লস্ট ইন স্পেস, স্টার ওয়ার্স-এর মতো সায়েন্স ফিকশন টিভি শো দেখে বড় হয়েছি। মহাকাশে ভ্রমণের বিষয়টি আমাকে সবসময় শিহরিত করত। আমি প্রচুর সায়েন্স ডকুমেন্টারি দেখতাম, যেগুলোতে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের তোলা ছবি দেখানো হতো। গ্যালাক্সি এবং নেবুলার সেই চোখ ধাঁধানো রঙিন ছবিগুলো আমার অবুঝ মনে গেঁথে গিয়েছিল। স্কুলে আমি খুব একটা ভালো ছাত্র ছিলাম না, তাই নভোচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা আমার কাছে বোকামি মনে হতো। কিন্তু তা আমাকে শেখা থেকে থামাতে পারেনি। মহাকাশে যাওয়ার পথ আমাকে নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়েছিল। আমার মায়ের কিনে দেওয়া একটি শিশুদের বিজ্ঞানের বইয়ে থাকা সাধারণ একটি নকশা অনুসরণ করে, ১২ বছর বয়সে আমি কার্ডবোর্ডের টিউব আর চশমার লেন্স দিয়ে আমার প্রথম টেলিস্কোপটি তৈরি করেছিলাম। আমার মনে আছে, ওটা দিয়ে ‘প্লেয়াদেস’ নক্ষত্রপুঞ্জ দেখার কথা—হাজার হাজার তারা দেখেছিলাম যা খালি চোখে দেখা সম্ভব ছিল না। আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম! তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে বড় হয়ে আরও ভালো একটি টেলিস্কোপ বানাবো, যদিও তখন ভাবিনি যে আমি গ্যালাক্সি বা নেবুলার ছবি তুলব। পরবর্তীতে আমি আমার অন্য একটি প্যাশন—থ্রিডি অ্যানিমেশন এবং ভিএফএক্সের দিকে ঝুঁকি এবং এর মাধ্যমেই ক্যারিয়ার গড়ে তুলি। এই সবকিছুর মাঝে জ্যোতির্বিজ্ঞান কিছুটা আড়ালে পড়ে গিয়েছিল।
আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড কী? আপনি এই কাজগুলো কোথায় শিখেছেন?
আমি বাংলা মাধ্যমের স্কুলে পড়েছি। পড়াশোনায় খুব একটা ভালো না হওয়ায় আমার ফলাফল ভালো ছিল না, তাই মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি। এসএসসি পরীক্ষায় আমি সাধারণ 'এ' গ্রেড পেয়েছিলাম, যেখানে আমার বন্ধুদের অনেকেই 'এ+' বা 'গোল্ডেন এ+' পেয়েছিল। ভালো কোনো কলেজে ভর্তির সুযোগ না থাকায় এক বন্ধুর পরামর্শে আমি জিইডি সম্পন্ন করি। একই সাথে আমি অ্যানিমেশনে আমার ক্যারিয়ার শুরু করি, যা ২০০৪ সালের কথা। এই কাজের প্রতি আমার প্রবল ঝোঁক ছিল এবং আমি এতে বেশ দক্ষতা অর্জন করি। ২২ বছর বয়সের আগেই আমি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাই এবং এই শিল্পমাধ্যমকে জনপ্রিয় করতে স্থানীয়ভাবে একটি আন্দোলনের সূচনা করি। ২০১০ সালে আমি আমার নিজের থ্রিডি অ্যানিমেশন এবং ভিএফএক্স কোম্পানি 'অগ্নিপথ স্টুডিওস' চালু করি। তখন থেকেই অ্যানিমেশন এবং ফিল্ম-মেকিং আমার আয়ের উৎস।
আমি যা কিছু শিখেছি তার সবই ইন্টারনেট এবং বইয়ের সাহায্যে নিজে নিজে। আমি কখনোই বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করিনি, কারণ আমি নিজের মতো করে শেখার অভ্যাস তৈরি করেছিলাম। আমি এটাকে কোনো গ্রেড বা ক্রেডিটের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করতে চাইনি। আমি সমস্যা সমাধান করতে খুব পছন্দ করি। নতুন কোনো সমস্যার উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করার আনন্দই অন্যরকম। এই পদ্ধতিটি আমার ক্ষেত্রে দারুণভাবে কাজ করেছে।
অ্যাস্ট্রোফোটোগ্রাফিতে আপনার যাত্রা এবং অনুপ্রেরণা সম্পর্কে বলুন।
২০১৮ সালে আমি ইলেকট্রনিক্স, রোবোটিক্স এবং থ্রিডি প্রিন্টিং নিয়ে কাজ শুরু করি। হঠাৎ করেই শৈশবের সেই টেলিস্কোপ তৈরির স্বপ্ন পূরণের সুযোগ চলে আসে। আমি গবেষণা শুরু করলাম এবং তখনই জানতে পারলাম যে, অনেকেই তাদের বাড়ির ছাদ থেকে গ্যালাক্সি ও নেবুলার দুর্দান্ত সব ছবি তুলছেন। আগে আমার ধারণা ছিল, এটা কেবল স্পেস টেলিস্কোপ দিয়েই সম্ভব। এই বিষয়টি আমাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকচিত্রের দিকে উদ্বুদ্ধ করে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আমি আমার বাসার ছাদ থেকে সাধারণ একটি মিররলেস ক্যামেরা ও ট্রাইপড ব্যবহার করে গভীর আকাশের একটি বস্তুর প্রথম ছবি তুলি। ছবিটি প্রসেস করার পর যখন নয়েজের ভিড়ে নেবুলার অস্পষ্ট আলো দেখতে পেলাম, তখন আমার সামনে সম্ভাবনার এক নতুন দ্বার খুলে গেল। নিশ্চিত হওয়ার পর যে আমি নিজেই এসব গভীর আকাশের বস্তু ধারণ করতে পারি, আমি বিষয়টি গভীরভাবে শিখতে শুরু করি—মহাজাগতিক গতিবিধি বোঝা থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারণা। ছবি তোলার কৌশল, ইমেজ প্রসেসিং থেকে শুরু করে আলোর দূষণ মোকাবিলা পর্যন্ত অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। আকাশের নক্ষত্র ট্র্যাক করা, দীর্ঘ এক্সপোজারের উপযোগী একটি নির্ভরযোগ্য রিগ তৈরি করা, ক্যামেরাকে মডিফাই করা যাতে এটি নেবুলার আলো শনাক্ত করতে পারে—এই প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি এই জটিলতাগুলোকে ভালোবাসি এবং এই আগ্রহই আমাকে আরও এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে। এর মাঝেই আমি আমার প্রথম ইমেজিং টেলিস্কোপ ডিজাইন করি (৫০০ মিমি ফোকাল লেন্থ)। ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর সকালে আমি টেলিস্কোপের নির্মাণকাজ শেষ করি এবং ওই একই সময়ে হওয়া আংশিক সূর্যগ্রহণের ছবি তুলি। সেখান থেকেই আমার গভীর আকাশের যাত্রা শুরু হয়।
আপনার কাজ এবং এই কাজের কোন বিষয়টি আপনি সবচেয়ে ভালোবাসেন?
মহাকাশের ছবি তোলার প্রতিটি বিষয় আমি ভালোবাসি। চাঁদ, গ্রহ, গ্যালাক্সি বা নেবুলা—সবকিছুর ছবি তুলতেই আমার ভালো লাগে। আমি আমার কৌশল এবং ছবির মান ক্রমাগত উন্নত করতে চাই। আমি চাঁদের বিভিন্ন দশা এবং গ্রহের পৃষ্ঠের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পছন্দ করি। গভীর আকাশের বস্তুর আরও সূক্ষ্ম ও অস্পষ্ট কাঠামো ফুটিয়ে তুলতে এক্সপোজারের সময় বাড়িয়ে যাচ্ছি। এটাকে আমি নিজের ছোটবেলার সত্তার সাথে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি। মহাকাশ অকল্পনীয় বিশাল। এখানে সবসময় নতুন কিছু আবিষ্কার করার আছে। একজন মানুষ সারা জীবন মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও ধারণ করলেও এর রহস্য শেষ হবে না। স্পেস টেলিস্কোপ ও বিশাল মানমন্দির থাকা সত্ত্বেও শৌখিন জ্যোতির্বিদরা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আপনার অনুপ্রেরণা কারা?
গ্যালিলিও গ্যালিলি, জোহানেস কেপলার, উইলিয়াম হার্শেল, চার্লস মেসিয়ারের মতো আদি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাই আমার প্রধান অনুপ্রেরণা। তাদের পথ অনেক কঠিন ছিল, তবুও তারা হাল ছাড়েননি এবং জ্ঞানের সীমানা প্রসারিত করেছিলেন। তারাও নিজের টেলিস্কোপ নিজেরা তৈরি করেছিলেন, তাই তাদের সাথে আমি একাত্মতা বোধ করি। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমি আমাদের মহাবিশ্ব এবং এতে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে চাই।
আপনার সর্বশেষ টেলিস্কোপটি কীভাবে তৈরি করেছেন এবং এতে খরচ কত হয়েছে?
শুরুটা করেছিলাম ডিজাইন থেকে। অনেক চিন্তাভাবনার পর থ্রিডি ক্যাড সফটওয়্যার দিয়ে আমি সব পার্টসের নকশা করি। আমাকে নিশ্চিত করতে হয়েছিল যে পার্টসগুলো যেন নিখুঁতভাবে ফিট হয় এবং মহাকাশের ছবি তোলার মতো নির্ভুলতা প্রদান করে। স্থানীয় এক দোকান থেকে একটি থ্রিডি প্রিন্টার কিনি যা নকশা বাস্তবায়নে খুব সাহায্য করেছে। টেলিস্কোপের টিউবটি তৈরি করেছি হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে কেনা ৪ ও ৫ ইঞ্চির পিভিসি পাইপ দিয়ে। ১০২ মিমি অ্যাপারচার এবং ৯০০ মিমি ফোকাল লেন্থের অ্যাক্রোম্যাটিক ডাবলেট লেন্সটি চীনা একটি অনলাইন শপ থেকে কিনেছি, কারণ এটি নিজে তৈরি করার সামর্থ্য আমার ছিল না। নক্ষত্রগুলোকে নির্ভুলভাবে ফোকাস করার জন্য আমি ফোকাসারের ক্ষেত্রে একটি নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। এটি প্রচলিত র্যাক-অ্যান্ড-পিনিয়ন বা ক্রেফোর্ড ডিজাইনের মতো নয়, বরং লিনিয়ার অ্যাকচুয়েটরের মতো একটি ‘লিড স্ক্রু’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। এটি একটি ছোট স্টেপার মোটর দিয়ে চলে এবং মাইক্রোকন্ট্রোলার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, যা কম্পিউটারের সফটওয়্যারের সাথে সংযুক্ত। এটি ফোকাস হারিয়ে যাওয়া রোধ করে। ইলেকট্রনিক্সের বেশিরভাগ অংশ স্থানীয় অনলাইন শপ থেকে সংগ্রহ করেছি। কাস্টম সার্কিট বোর্ডগুলো আমি বিদেশি একটি অনলাইন সার্ভিস থেকে প্রিন্ট করিয়েছি, যা বেশ সস্তা ছিল। ফোকাসারের নকশা ও নিখুঁত করতে সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে। আমি একটি গাইড-স্কোপও ডিজাইন করেছি, যা মেইন স্কোপের ওপর বসানো থাকে এবং আকাশের গতিবিধি ট্র্যাক করার সময় ‘সাব-আর্কসেকেন্ড’ নির্ভুলতা অর্জনে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ণিমা চাঁদ আকাশে প্রায় ১/২° জায়গা দখল করে, যা প্রায় ১৮০০ আর্কসেকেন্ডের সমান। আমি ক্রমাগত এর গঠন ও কার্যকারিতা উন্নত করছি।
শুধু উপকরণের হিসাব করলে খরচ হয়েছে ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকার মতো। এর বড় অংশই লেন্স ও ইলেকট্রনিক্সে ব্যয় হয়েছে।
মহাজাগতিক বস্তুর ছবি তুলতে আর কী কী ব্যবহার করেন?
টেলিস্কোপ ছাড়াও আমি একটি রোবোটিক ট্র্যাকিং মাউন্ট ব্যবহার করি, যা দেশে না পাওয়ায় বিদেশ থেকে আনিয়েছি। ২০১৯ সালে আমি নিজের একটি রোবোটিক ট্র্যাকিং মাউন্ট বানানোর কাজ শুরু করেছিলাম, কিন্তু আলসেমির কারণে সেটি শেষ করতে পারিনি। আশা করি কোনো একদিন শেষ করতে পারব। উল্লেখ্য, আমার মূল লক্ষ্য সুন্দর ছবি তোলা, আমার কারিগরি দক্ষতা দেখানো নয়। তবে এই তৈরির প্রক্রিয়াটি আমি উপভোগ করি।
শুরুতে আমি একটি সস্তা সেকেন্ড হ্যান্ড ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনে সেটিকে অ্যাস্ট্রো-মডিফাই করেছিলাম। এর বড় অসুবিধা ছিল তাপমাত্রা, কারণ দীর্ঘ এক্সপোজারের সময় ক্যামেরার সেন্সর গরম হয়ে যায়, যা ছবির মান কমিয়ে দেয়। ঢাকার মতো আলোকদূষণের শহরে এই সমস্যা আরও বেশি। তাই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আমি একটি শীতলীকরণ ব্যবস্থাযুক্ত ডেডিকেটেড অ্যাস্ট্রোনমি ক্যামেরা কিনি, যা সেন্সরের তাপমাত্রা শূন্যের নিচে রাখতে পারে। আলোকদূষণ মোকাবিলায় আমি ডুয়াল ন্যারোব্যান্ড ফিল্টার ব্যবহার করি, যা কেবল নেবুলা থেকে নির্গত আলো ক্যামেরায় প্রবেশ করতে দেয়। পুরো সেটআপটি একটি মিনি পিসি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমার টেলিস্কোপ দিয়ে চাঁদ, সূর্য ও গ্রহেরও ছবি তোলা যায়। দুই বছরের বেশি সময় ধরে এটি ব্যবহার করছি এবং এটি এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা করেনি। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে এই পুরো সিস্টেমটিকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কেউ কীভাবে নিজের টেলিস্কোপ তৈরি করতে পারে?
একটি সাধারণ রিফ্র্যাক্টর টেলিস্কোপ আসলে খুবই সহজ যন্ত্র। আপনার একটি দীর্ঘ ফোকাল লেন্থের অবজেক্টিভ লেন্স এবং একটি ছোট ফোকাল লেন্থের আইপিস লেন্স প্রয়োজন। এই দুটির যোগফলই টেলিস্কোপের দৈর্ঘ্য। একে বলা হয় কেপ্লেরিয়ান ডিজাইন। ফটোগ্রাফিক টেলিস্কোপ আরও সহজ, কারণ এতে আইপিসের প্রয়োজন নেই; ছবি সরাসরি ক্যামেরা সেন্সরে পড়ে। তবে ভালো মানের টেলিস্কোপ তৈরির জন্য লেন্সের গুণমান, লেন্স কোটিং, অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন রোধ, ব্যবহারের সুবিধা, ফোকাসারের স্থায়িত্ব এবং সিস্টেমের সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখার মতো অনেক বিষয় মাথায় রাখতে হয়। সংক্ষেপে এর সব খুঁটিনাটি বলা কঠিন, তবে ভবিষ্যতে আমি ওয়ার্কশপ বা অনলাইন টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে এই জ্ঞান শেয়ার করার পরিকল্পনা করছি।
কেউ কীভাবে অ্যাস্ট্রোফোটোগ্রাফি শুরু করতে পারে?
আপনি আপনার স্মার্টফোন এবং একটি ট্রাইপড দিয়েই শুরু করতে পারেন! প্রথম কাজ হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণাগুলো সম্পর্কে জানা। আকাশ কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং ঋতুভেদে আকাশের কোন অংশ দেখা যায় তা শিখুন। যেমন—গ্রীষ্মকালে মিল্কিওয়ে এবং শীতকালে অরিয়ন নক্ষত্রপুঞ্জ ভালোভাবে তোলা যায়। এটি আপনার জ্ঞান বাড়াবে এবং আপনাকে একজন দক্ষ অ্যাস্ট্রোফোটোগ্রাফার হিসেবে গড়ে তুলবে। স্মার্টফোনের পর আপনি ডিএসএলআর বা মিররলেস ক্যামেরায় যেতে পারেন। ৫০ মিমি লেন্সের মতো ছোট ফোকাল লেন্থ দিয়ে শুরু করুন। প্রয়োজন অনুভব করার আগে দামী সরঞ্জাম কিনবেন না। দ্রুতই আপনি বুঝতে পারবেন যে দীর্ঘ সময় ধরে ছবি তোলার জন্য একটি ট্র্যাকিং মাউন্ট প্রয়োজন। একবার ছবি তোলা ও প্রসেস করার প্রক্রিয়া বুঝে গেলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন পরবর্তী ধাপ কী হবে। অ্যাস্ট্রোফোটোগ্রাফিতে অনেক ধৈর্য ও পরিশ্রম প্রয়োজন; সফল হতে হলে আপনাকে পুরো প্রক্রিয়াটি ভালোবাসতে হবে।
বাংলাদেশ থেকে অ্যাস্ট্রোফোটোগ্রাফি করার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?
প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো আলো ও বায়ুদূষণ। ঢাকার ছাদে কাজ করার সময় শহরের আলো এবং বাজে বাতাস ভালো ছবি তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা। পরিষ্কার রাতেও দৃশ্যমানতা খুব কম থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আলোকদূষণমুক্ত এলাকায় যে ছবি তুলতে যে সময় লাগে, ঢাকায় তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি এক্সপোজার সময় প্রয়োজন হয়। আলোকদূষণ মাপার স্কেল হলো 'বোর্টল স্কেল' (০-৯); ঢাকা এই স্কেলে ৬-৭ অবস্থানে আছে। এজন্যই আমি আমাদের অন্ধকার আকাশ রক্ষা করার এবং কৃত্রিম আলোর দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর জোর দিই।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো আবহাওয়া। বাংলাদেশে দীর্ঘ বর্ষাকাল এবং বছরের বেশিরভাগ সময় আকাশ মেঘলা থাকে, যা ছবি তোলার সময় অনেক কমিয়ে দেয়। যদিও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ থেকে রাতের আকাশ খুব চমৎকার দেখা যায়।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো সরঞ্জামের প্রাপ্যতা। আমার অধিকাংশ অ্যাস্ট্রো-গিয়ার বিদেশ থেকে আনতে হয়, যা একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। তবে আশা করছি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রেমী তৈরি হবে এবং স্থানীয় দোকানগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে এই সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে।
আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমি আমার কৌশল উন্নত করে মহাবিশ্বের আরও সুন্দর ছবি তুলতে চাই এবং তা সবার সাথে শেয়ার করতে চাই। জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই এবং নতুনদের মাঝে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চাই। আমার কাজের মাধ্যমে যদি কোনো শিশু অনুপ্রাণিত হয়ে বড় কোনো লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যায়, এমনকি অন্য কোনো গ্রহেও পা রাখে, তবে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব।
ছবি ও ইমেজ ক্রেডিট: জুবায়ের কেওলিন
পোর্ট্রেট ক্রেডিট: সারিকা সিরাজ
