Logo
Logo
×
কেন হারিয়ে গেল নিয়ান্ডারথালরা?

বরফযুগের চরম প্রতিকূলতায়ও টিকে থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল নিয়ান্ডারথালদের। তারপরও একসময় তারা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ

লাইফস্কেপ ।  সভ্যতা-সংস্কৃতি

কেন হারিয়ে গেল নিয়ান্ডারথালরা?

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৫:০৪ পিএম

আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৭:৫০ পিএম

প্রায় ৪০ হাজার বছর আগের কথা। ইউরোপ আর এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে তখন রাজত্ব করত আদিম মানবজাতি নিয়ান্ডারথাল। শক্তসমর্থ গড়ন। বরফযুগের চরম প্রতিকূলতায় টিকে থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। তারপরও তারা একসময় হারিয়ে গেল পৃথিবী থেকে।

অন্যদিকে তাদের সমসাময়িক প্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স, মানে আধুনিক মানুষ, কেবল টিকেই রইল না। ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে।

নিয়ান্ডারথাল আবিষ্কারের প্রায় ১৬০ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের বিলুপ্তির কোনো একক ব্যাখ্যায় এখনো পৌঁছাতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে গত দুই বছরে একের পর এক নতুন গবেষণা সেই পুরনো ধাঁধার কিছু গুরুত্বপূর্ণ টুকরো জুড়ে দিয়েছে। কোনোটা পুরনো তত্ত্ব মজবুত করেছে। কোনোটা আবার পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে প্রচলিত ধারণা। 

২০০৭ সালে রুশ বিজ্ঞান একাডেমির প্রত্নমানববিজ্ঞানীরা প্রথম খননকাজ শুরু করেন চাগিরস্কায়া গুহায়। সেখান থেকে উদ্ধার হয় নিয়ান্ডারথালদের হাড় আর দাঁতের টুকরো। ছবি: বেন্স ভায়োলা/ নিউইয়র্ক টাইমস

অস্ত্রের লড়াইয়ে পিছিয়ে ছিল নিয়ান্ডারথালরা

হোমো সেপিয়েন্সদের টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার ছিল বুদ্ধি আর উদ্ভাবনী শক্তি। তারা বানাতে শিখেছিল হালকা আর দূরপাল্লার অস্ত্র। তির-ধনুক, হালকা বল্লম। ফলে হিংস্র পশুর একেবারে কাছে না গিয়েও নিরাপদ দূরত্ব থেকে শিকার করা যেত।

নিয়ান্ডারথালদের অস্ত্র ছিল উল্টো। ভারী, কাছ থেকে ব্যবহারের উপযোগী। শিকারকে ঘায়েল করতে হলে পশুর একদম গায়ের কাছে যেতে হতো তাদের। এতে ঝুঁকিও ছিল অনেক বেশি। বারবার আহত হওয়া, প্রাণহানি। দীর্ঘমেয়াদে এসবই তাদের জনসংখ্যা কমিয়ে দিয়েছিল বলে মনে করেন গবেষকরা।

শিল্পীর কল্পনায় আঁকা এক নিয়ান্ডারথাল বাবা ও মেয়ের ছবি। রাশিয়ার একটি গুহায় পাওয়া জীবাশ্ম থেকে সংগৃহীত ডিএনএ থেকেই প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে একটি নিয়ান্ডারথাল পরিবারের সন্ধান। ছবি: টম বিয়র্কলুন্ড/ নিউইয়র্ক টাইমস

একাকী এক নিয়ান্ডারথালের গল্প 

২০১৫ সালে ফ্রান্সের রোন উপত্যকার এক গুহা থেকে মিলেছিল একটি নিয়ান্ডারথালের দেহাবশেষ। নাম দেওয়া হয় থোরিন। বছরের পর বছর গবেষণার পর ২০২৪ সালে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোব ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী থোরিনের জিনোম বিশ্লেষণ করে চমকে ওঠেন।

দেখা যায়, থোরিনের জনগোষ্ঠী প্রায় ৫০ হাজার বছর ধরে অন্য কোনো নিয়ান্ডারথাল দলের সঙ্গে জিন বিনিময় করেনি। ফলে তাদের মধ্যে ছিল প্রবল আত্মীয়-বিবাহের ছাপ আর কমে যাওয়া জিনগত বৈচিত্র্য। অথচ একই সময়ে মাত্র কয়েকদিনের হাঁটাপথ দূরে বাস করত আরেকটি নিয়ান্ডারথাল দল। দুটি দল হাজার হাজার বছর পাশাপাশি থেকেও একে অপরের সঙ্গে কার্যত কোনো যোগাযোগ রাখেনি।

এই গবেষণা প্রকাশিত হয় সেল জেনোমিকস সাময়িকীতে। গবেষকদের মতে, ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দলে বাস করাটাই ছিল নিয়ান্ডারথালদের বড় দুর্বলতা। কোনো মহামারি বা দুর্যোগ এলে গোটা দল এক নিমেষে হারিয়ে যেতে পারত।

সামাজিক নেটওয়ার্কই কি আসল রক্ষাকবচ

মন্ট্রিয়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ আরিয়ান বার্কের নেতৃত্বে একটি দল সম্প্রতি ভিন্ন পথে হেঁটেছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিস্তর তথ্য আর প্রাণী বিস্তারের মডেল ব্যবহার করে তারা বিশ্লেষণ করেছে প্রায় ৬০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার বছর আগের ইউরোপকে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয় কোয়াটারনারি সায়েন্স রিভিউস সাময়িকীতে।

ফলাফল বলছে, শুধু জলবায়ু চাপ বা সেপিয়েন্সদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা দিয়ে নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। আসল ফারাক ছিল সংযোগে। সেপিয়েন্সরা এমন সব অঞ্চলে থাকত, যেগুলো ছিল পরস্পরের সঙ্গে অনেক বেশি সংযুক্ত। বিশেষ করে দক্ষিণের উপকূলীয় পথ ধরে। সংকটের সময় এই নেটওয়ার্কই কাজ করত নিরাপত্তা বলয় হিসেবে। খাবার-পানির খোঁজ, বিপদের খবরাখবর, সাময়িক আশ্রয়— সবকিছু আদান-প্রদান হতো এই সূত্র ধরেই।

নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও যোগাযোগ ছিল। হাতিয়ার আর কাঁচামাল বিনিময়ের প্রমাণও মিলেছে। কিন্তু মধ্য আর পূর্ব ইউরোপে সেই যোগাযোগ ছিল অনেক দুর্বল, অনেক সীমিত। জলবায়ু হঠাৎ বদলে গেলে বিচ্ছিন্ন দলগুলো তাই সহজেই ভেঙে পড়ত। 

১৮৫৬ সালে জার্মানির নিয়ান্ডার উপত্যকায় প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ান্ডারথালদের ফসিল বা কঙ্কালের অংশবিশেষ খুঁজে পাওয়া যায়, যা থেকে এদের নামকরণ করা হয় 'নিয়ান্ডারথাল'।

খাদ্যাভ্যাসেও এগিয়ে ছিল সেপিয়েন্সরা

খাবার বাছাইয়েও পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। নিয়ান্ডারথালরা মূলত নির্ভর করত বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী আর ম্যামথের মাংসের ওপর। সেপিয়েন্সরা খেত আরও বৈচিত্র্যময় খাবার। ফলমূল, সামুদ্রিক মাছ, বীজ, ছোট পশুপাখি।

জলবায়ু বদলে বড় পশুর সংখ্যা কমে গেলে সেপিয়েন্সরা সহজেই মানিয়ে নিত অন্য খাবারে। নিয়ান্ডারথালদের সেই নমনীয়তা ছিল না। ফল হিসেবে দেখা দিত দীর্ঘ অনাহার।

জিনগত বৈচিত্র্য নিয়ে নতুন মোড়

দীর্ঘদিন ধরে একটা তত্ত্ব বেশ জোরালো ছিল। আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে আর তার ফলে কমে যাওয়া জিনগত বৈচিত্র্যই নাকি নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির বড় কারণ। থোরিনের গবেষণা এই তত্ত্বকেই সমর্থন করেছিল।

কিন্তু ২০২৬ সালের জুন মাসে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা এই ধারণায় বড় ধাক্কা দেয়। জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের বিবর্তনবিদ আলবা বোসোমস মেসার নেতৃত্বে একদল গবেষক বেলজিয়াম আর ফ্রান্সের দশটি জায়গা থেকে পাওয়া ২৭ জন নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ নিয়ে কাজ করেন।

ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় ৫২ হাজার বছর আগে বসবাসকারী এই নিয়ান্ডারথালরা ছিল বড়সড়, ভালোভাবে সংযুক্ত জনগোষ্ঠী। তাদের মধ্যে আত্মীয়-বিবাহের তেমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। অর্থাৎ, অন্তত উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের এই জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে জিনগত ঘাটতি বিলুপ্তির প্রধান কারণ ছিল না।

গবেষক দল নিজেরাই বলছেন, তাদের ফল প্রচলিত তত্ত্বকে পুরোপুরি নাকচ করে না। তবে নিয়ান্ডারথালরা কেবল জিনগত অবক্ষয়ের কারণেই হারিয়ে গেছে, এই ধারণাকে জোরালো সমর্থন দেয় না তাদের গবেষণা।

দুটো গবেষণা তাহলে কি পরস্পরবিরোধী? আসলে তা নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিয়ান্ডারথালদের অবস্থা অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল। কোথাও তারা ছিল প্রবলভাবে বিচ্ছিন্ন, কোথাও তুলনামূলক সংযুক্ত। বিলুপ্তির কারণও তাই একেক জায়গায় একেক রকম হতে পারে।

ইসরায়েলের কেবারায় পাওয়া নিয়ান্ডারথালের জীবাশ্ম দেহাবশেষ।

মহাকাশ থেকে এল আরেক তত্ত্ব

সবচেয়ে চমকপ্রদ তত্ত্বটা এসেছে মহাকাশবিজ্ঞান থেকে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অগ্নিত মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ২০২৫ সালে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, প্রায় ৪১ হাজার বছর আগে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই ঘটনাকে বলা হয় লাশঁ ঘটনা।

সে সময় পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র এখনকার তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ শক্তিশালী ছিল। মেরু পুরোপুরি না উল্টালেও তা ব্যাপকভাবে সরে গিয়েছিল, বিশেষ করে ইউরোপের ওপর দিয়ে। এর ফলে মহাজাগতিক আর অতিবেগুনি বিকিরণ অনেক বেশি পরিমাণে ঢুকে পড়েছিল বায়ুমণ্ডলে।

গবেষকদের ধারণা, এই তীব্র বিকিরণ সামলাতে সেপিয়েন্সরা কিছুটা এগিয়ে ছিল। শরীরের মাপে বানানো পোশাক, গুহায় আশ্রয় নেওয়ার অভ্যাস তাদের বাড়তি সুরক্ষা দিয়েছিল বলে মনে করেন গবেষকরা। সেই সময় সেপিয়েন্সদের বসতিতে গেরুয়া রঙের ব্যবহারও বেড়ে গিয়েছিল উল্লেখযোগ্যভাবে, যা রোদ থেকে চামড়া বাঁচাতে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা গবেষকদের।

এই তত্ত্ব এখনো বিতর্কের মধ্যে আছে। প্রমাণও এখনো সীমিত। কিন্তু এটা দেখিয়ে দেয়, নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তি নিয়ে গবেষণা এখনো থেমে নেই। বরং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কোণ থেকে খোঁজা হচ্ছে উত্তর।

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, হোমো সেপিয়েন্সদের আবির্ভাবের কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে যায় নিয়ান্ডারথালরা। ছবি: বিবিসি

তবে কি তারা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে

এত কিছুর পরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। নিয়ান্ডারথালরা কি সত্যিই একদম মুছে গেছে পৃথিবী থেকে?

আধুনিক জিনোম বিজ্ঞান বলছে, না। আফ্রিকার বাইরের মানুষদের শরীরে আজও এক থেকে দুই শতাংশ নিয়ান্ডারথাল জিন রয়ে গেছে। ধারণা করা হয়, সেপিয়েন্সদের বিপুল জনসংখ্যার ভিড়ে নিয়ান্ডারথালরা প্রজাতি হিসেবে হারিয়ে গেলেও, তাদের জিনগত উত্তরাধিকার মিশে গেছে আমাদের মধ্যেই।

নিয়ান্ডারথালদের বিদায় কেবল একটা প্রজাতির হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটা টিকে থাকার এক কঠিন পাঠও বটে। শরীরে শক্তিশালী হওয়ার চেয়েও বেশি জরুরি বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। নিয়ান্ডারথালদের ইতিহাস বারবার সেই সত্যটাই মনে করিয়ে দেয় আমাদের।

বিজ্ঞানীরা এখনো এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান খুঁজছেন। আর প্রতিটি নতুন গবেষণা যেন একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিচ্ছে, আমাদের নিজেদের প্রজাতির টিকে থাকার গল্পটাও ঠিক কতটা অনিশ্চিত ছিল।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে