প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
নটরাজের তাণ্ডব থেকে নৃত্যের আবির্ভাব
রীতি, রূপ আর মুদ্রার মেলবন্ধন—শাস্ত্রীয় নৃত্যের অনন্য রূপায়ণ
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৫:১০ পিএম
আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ১৩:১৭ পিএম
তিনি স্বয়ংভূ, স্বাধীন ও অবিনশ্বর। তার পরতে পরতে রহস্য; পরনে কেবল ব্যাঘ্রছাল, আর ঊর্ধ্বাংশ সম্পূর্ণ নগ্ন। জটাজাল মোড়ানো মাথায় শোভা পাচ্ছে পবিত্র অর্ধচন্দ্র, আর কপালে উন্মোচিত তৃতীয় নেত্র—যা নিমিষেই ভস্ম করে দিতে পারে সমস্ত সৃষ্টি। গলায় পেঁচিয়ে রয়েছে বিষধর সাপ, আর বুকে ঝুলে আছে কঙ্কালের মালা। কঠোর তপস্যা ও সাধনায় যিনি অর্জন করেছেন অসীম ও অপার শক্তি।
তিনিই মহাপ্রলয়ের মহাশক্তি, ধ্বংসের শেষ অধিপতি। মহাপ্রলয়ের সেই মহাভীষণ মুহূর্তে বিষাণ ও ডমরুর গম্ভীর ধ্বনিতে যিনি সূচনা করেন নতুন বিনাশের। যখন তিনি উগ্র ও ভয়ঙ্কর, তখন তিনি ‘রুদ্র’; আর যখন তিনি পরম কল্যাণময়, তখন তিনি শান্ত ও সুন্দর ‘শঙ্কর’। হিন্দু পুরাণ ও দর্শনের প্রধান তিন দেবতার অন্যতম, সেই মহাদেব বা শিবের রূপ ও শক্তির প্রকাশ বড়োই অদ্ভুত ও রহস্যাবৃত।
দক্ষকন্যা সতীর সঙ্গেই বাঁধে মহাদেবের পবিত্র বিবাহ বন্ধন। কিন্তু এক বিশাল মহাযজ্ঞে পিতা দক্ষ যখন সবার সামনে শিবকে অপমান ও নিন্দা করেন, স্বামীর নিম্দা সহ্য করতে না পেরে সতী যজ্ঞের আগুনে দেহত্যাগ করেন।
প্রিয়তমা স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদ পেতেই ক্রুদ্ধ মহাদেবের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে; তিনি নিজের জটা ছিন্নভিন্ন করে ফেলেন এবং তার চোখ থেকে প্লাবনের মতো গলে পড়তে থাকে অশ্রুর ধারা। সতীর সেই প্রাণহীন দেহ কাঁধে নিয়ে শুরু হয় তার প্রলয়ংকর তাণ্ডবনৃত্য—যে নৃত্যের ঝাপটায় কেঁপে ওঠে পুরো সৃষ্টিজগত।

স্ত্রীর দেহ কাঁধে শিব। ছবি:সংগৃহীত
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাদেবের এই তাণ্ডব থেকেই সৃষ্টি হয়েছে নৃত্যের। প্রাচীন কাল থেকেই নৃত্য ও সঙ্গীতের শিল্পকলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মহাদেবের নাম। তার সঙ্গেই গভীরভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে ধ্রুপদী ধারার দুটি বিখ্যাত নৃত্যরূপ—‘তাণ্ডব’ ও ‘লাস্য’।

শিব এর তাণ্ডবনৃত্য। ছবি: অ্যামাজন ডট ইন
তাণ্ডব ধ্বংসাত্মক ও পুরুষালী নৃত্য। লাস্যকে তাণ্ডবের নারীসুলভ বিকল্প নৃত্য মনে করা হয়। তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য যথাক্রমে ধ্বংস ও সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
নৃত্যের ধারণা সৃষ্টির পর থেকেই বিভিন্ন কৌশল ও অনুশীলনের ফলে এর অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। মিশরীয়রা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে নাচের প্রচলন শুরু করে। প্রাচীন গ্রিসে নাচ ছিল অপরিহার্য, যার ঐতিহ্য সংরক্ষণে পরবর্তীতে গ্রীক থিয়েটার নির্মিত হয়। রেনেসাঁ যুগের শুরুর পর নৃত্যের অনেক নতুন শৈলী প্রবর্তিত হয় যা আধুনিক নৃত্যের প্রচলন ঘটায়।
নৃত্য
মানুষের মনের ভাব বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রকাশ করাকে নৃত্য বলে। নৃত্য ও ভাষা কাজ করে একসূত্রে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে, আচার-অনুষ্ঠানে, যুদ্ধরীতিতে এমনকি আত্মরক্ষায়ও নাচের বহুবিধ ব্যবহার পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ সালের মিশরীয় দেয়াল চিত্রে এবং নয় হাজার বছরের প্রাচীনতম ভারতীয় গুহা চিত্রে নৃত্যকলার বিভিন্ন ভঙ্গি প্রদর্শিত রয়েছে। দেয়াল চিত্রে খোদিত সেসব ভঙ্গি থেকে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, ভূতপূর্ব কিংবদন্তি কাহিনী পরিবেশনের জন্যই ঐ চিত্রগুলো খোদাই করা হয়েছিল।

প্রাচীন স্থপত্যে নৃত্যের নিদর্শন। ছবি:ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম
লিখিত বর্ণমালা প্রচলনের আগে নৃত্যকলার মাধ্যমেই ঐতিহাসিক গল্পসমগ্র বংশ পরম্পরায় চলে আসতো। এখনও নৃত্যকলার এই ব্যবহার ব্রাজিলীয় চিরহরিৎ বনাঞ্চলের সংস্কৃতি হতে কালাহারি মরুভূমির সংস্কৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত। ভারতীয় নৃত্যকলা হচ্ছে প্রাচীন নৃত্যকলার মধ্যে অন্যতম। খ্রিস্টপূ্র্ব প্রথম সহস্রাব্দের বহু ভারতীয় গ্রন্থে ভারতীয় নৃত্যকলার বিষয়ে বর্ণনা পাওয়া যায় যেগুলোর ভেতর নৃত্যকলার প্রধান ৮টি শৈলী উল্লেখযোগ্য।
ওড়িশি
৮টি ধ্রপদী নৃত্যশৈলীর মধ্যে অন্যতম হলো ওড়িশা রাজ্যের একটি শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলী, ওড়িশি। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য উড়িষ্যার একটি হিন্দু মন্দির থেকে এই নৃত্যের উৎপত্তি বলে ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে ‘উদয়গিরির‘ পর্বতে নির্মিত বিভিন্ন খোদাইচিত্র থেকে এই নৃত্যের প্রাচীনত্ব প্রমাণিত হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাখ্যান, আধ্যাত্মিক গল্প ও দেবদেবীর শক্তির ঐতিহ্য এ নৃত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো। ঐতিহ্যগতভাবে ওড়িশি একটি বর্ণনামূলক নৃত্য, যেখানে শিল্পীরা পৌরাণিক কাহিনী বা প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য অভিনয় ও নৃত্যের বিভিন্ন মুদ্রার মাধ্যমে প্রদর্শন করতো।

ওড়িশি নৃত্যশৈলী । ছবিসুত্র : কালের কণ্ঠ
কত্থক
স্বর্গের অপ্সরাদের নৃত্য হিসেবে পরিচিত কত্থক নৃত্য প্রাচীন উত্তর ভারতের যাযাবর সম্প্রদায় থেকে উদ্ভুত। কত্থক শব্দটি এসেছে বৈদিক শব্দ ‘কথা‘ থেকে, যার অর্থ গল্প। গল্পের বর্ণনায় দেবদেবীর মাহাত্ম্যাবলী পরিবেশন হলো এই নৃত্যের বিশেষত্ব। প্রধানত কৃষ্ণের জন্ম, শৈশব ও রাধা কৃষ্ণের লীলা কাহিনীই রূপায়িত হতো এই নাচের মাধ্যমে। ব্রিটিশ আমলে রাজদরবারে এই নৃত্যের অবমাননার ফলে বেশ কিছুকাল কত্থক নৃত্যের চর্চা হ্রাস পেলেও পরবর্তীতে লখনৌ এর আসাফুদ্দৌলা ও ওয়াজীদ আলী শাহ এর দরবারে কত্থক নৃত্যের পুনরায় বিকাশ ঘটে।

কত্থক নৃত্য প্রদর্শন । ছবি: কথা ডান্স থিয়েটার
কথাকলি
মূকাভিনয় ও ভাবপ্রকাশের এক অপূর্ব শিল্পরূপ হলো কথাকলি নৃত্য, যা প্রায় তিনশ বছরের প্রাচীন এক ধ্রুপদী ঐতিহ্য এবং ১৭ শতকে ভারতের কেরালা রাজ্যে এর উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গীতিনাট্য ও মূকাভিনয়ের নানা দ্যোতনা ধারণ করে মঞ্চে পরিবেশিত এই নৃত্যের মাধ্যমে মূলত মহাকাব্য ও পুরাণের অমর গাথাগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষ শিল্পীরাই প্রধানত এই নৃত্যশৈলী পরিবেশন করে থাকেন। মুখাভিনেয়, বর্ণিল রঙ, নজরকাড়া প্রকাশভঙ্গি, জমকালো পোশাক, ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত, নাটক এবং নাচের এই সুচারু ও বর্ণাঢ্য সংমিশ্রণই কথাকলিকে অন্য যেকোনো নৃত্যশৈলী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অতুলনীয় করে তুলেছে।

মুখোশ বেশে কথাকলি নৃত্যের প্রদর্শন। ছবি: এই সময় অনলাইন
কুচিপুড়ি
ছন্দময় অঙ্গভঙ্গি, নান্দনিক মুদ্রা, অভিব্যক্তি ও মূকাভিনয়ের অনন্য সমন্বয়—কুচিপুড়ি নৃত্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের কৃষ্ণা জেলার কুচিপুড়ি গ্রামকে এই ধ্রুপদী নৃত্যশৈলীর জন্মভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কুচিপুড়ির বিকাশের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৭শ শতকের দিকে তীর্থ নারায়ণ জাতী ও তাঁর শিষ্য সিদ্ধেন্দ্র যোগী এই নৃত্যশৈলীর বিভিন্ন মুদ্রা ও পরিবেশনার রীতিকে সুসংগঠিত ও নিয়মবদ্ধ করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে কুচিপুড়ি ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র ধ্রুপদী নৃত্যশৈলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের অন্যান্য শাস্ত্রীয় নৃত্যের মতো কুচিপুড়ির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় বিশ্বাস, মন্দিরকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও ঐতিহ্য। নৃত্য, অভিনয়, সংগীত ও কাহিনির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পরীতি মূলত পৌরাণিক ও ধর্মীয় আখ্যানকে জীবন্ত করে তোলে।
কুচিপুড়ির ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এর প্রাথমিক পরিবেশনায় শিল্পীরা ছিলেন প্রায় সবাই পুরুষ। বিশেষত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের শিল্পীরা চরিত্র অনুযায়ী পোশাক ও সাজসজ্জা গ্রহণ করে একই পরিবেশনায় নারী ও পুরুষ—উভয় চরিত্রেই অভিনয় করতেন। ফলে নৃত্যের সঙ্গে অভিনয় ও চরিত্রাভিনয়ের একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে কুচিপুড়ির পরিবেশনায় এসেছে নানা পরিবর্তন। আজ নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে এই নৃত্য পরিবেশন করেন। এর ছন্দ, মুদ্রা, অভিনয় ও আধ্যাত্মিক আবেদনের সমন্বয়ে কুচিপুড়ি এখন শুধু ভারতের ঐতিহ্যের অংশ নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত একটি ধ্রুপদী নৃত্যশৈলী।

কুচিপুড়ি নৃত্যের প্রদর্শন। ছবি: বঙ্গ দর্শন
ভরতনাট্যম
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের সংস্কৃতির এক অনন্য ও দীপ্তিময় শাস্ত্রীয় নৃত্য হলো ভরতনাট্যম, যার নামকরণের পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক ধারা; অনেকে মনে করেন ভরত নামক মুনি এই নৃত্যের প্রবর্তন করেছিলেন বলেই এর নাম হয়েছে ‘ভরতনাট্যম’, যদিও এই মতবাদে কিছু দ্বিমতও রয়েছে। প্রাচীনকালে এই নৃত্য মূলত দেবদাসীরা পরিবেশন করতেন এবং পরবর্তীতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি দাসীআটম, চিন্নমেলম, ভোগমেলম ও তাঞ্জোরী নামে চর্চা ও বিকশিত হয়ে এসেছে। সময়ের পরিক্রমায় প্রথাগত ক্রমবিবর্তনের এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এই নৃত্যকলা আজ ভারতবর্ষের শিল্পাঙ্গনে এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি ও অনন্য উচ্চতা লাভ করেছে।

ভরতনাট্যম নৃত্যভঙ্গিমা। ছবি: সংগৃহীত
মণিপুরী
ভারতের পূর্বাঞ্চলের ভারত-মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত মণিপুর রাজ্যের একটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্যশৈলী মণিপুরী নৃত্য। কথিত আছে, রাজা ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নাদেশে এই নৃত্যের পোশাকের নির্দেশ পেয়েছিলেন। এই পোশাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জড়ি জড়ানো মাথার চূড়া এবং মুখের উপর পাতলা জালের মতো সাদা কাপড়ের আবরণ, একে মাইখুম বলে। ঘাঘরার নিম্নভাগে কাপড়ের ভিতর বেত দিয়ে শক্ত করা থাকে। ঘাঘরার এই পরিবেশনকে ‘কুমিন‘ বলে। ১৯১৯ সালে সিলেটের মাছিমপুর গ্রামে মণিপুরদের পরিবেশিত এই রাসনৃত্য দেখে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিমোহিত হন এবং ঐতিহ্যবাহী এই নৃত্যকে তিনি বিশ্ব দরবারে তুলে আনেন শান্তিনিকেতনে মণিপুর নৃত্য প্রবর্তনের মাধ্যমে।

মণিপুর রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যশৈলী। ছবি : ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম
মোহিনীঅট্টম
সৌন্দর্য, কোমলতা ও মুগ্ধকর দেহভঙ্গির নান্দনিক প্রকাশ—মোহিনীঅট্টম দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যের একটি ঐতিহ্যবাহী ধ্রুপদী নৃত্যশৈলী। এর পরিবেশনায় কোমল পদক্ষেপ, দোলায়িত শরীরের ভঙ্গি, সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি ও ছন্দময় অঙ্গসঞ্চালনের মাধ্যমে এক অনন্য সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। ‘মোহিনীঅট্টম’ শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত— ‘মোহিনী’ ও ‘অট্টম’। ‘মোহিনী’ অর্থ মোহনীয় বা মুগ্ধকারিণী নারী এবং ‘অট্টম’ অর্থ নৃত্য বা দেহভঙ্গির প্রকাশ। সেই অর্থে মোহিনীঅট্টমকে বলা যায়— ‘মুগ্ধকারিণীর নৃত্য’। নামের মধ্যেই এই নৃত্যশৈলীর কোমল ও আকর্ষণীয় সৌন্দর্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মোহিনীঅট্টমের চর্চা ও বিকাশে কেরালার রাজসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে রাজা স্বাতী তিরুনলের পৃষ্ঠপোষকতায় এই নৃত্যশৈলী নতুন মাত্রা লাভ করে এবং এর পরিবেশনা ও সংগীতের কাঠামো আরও সমৃদ্ধ হয়। মোহিনীঅট্টমের নৃত্যভঙ্গিতে রয়েছে প্রায় চল্লিশটি মৌলিক অঙ্গসঞ্চালন বা ভঙ্গি। এই পৃথক ভঙ্গিগুলোকে একত্রে বলা হয় ‘অটভুকল’। কোমল ও ছন্দময় এই অঙ্গভঙ্গিগুলোর সমন্বয়েই মোহিনীঅট্টমের নিজস্ব নৃত্যভাষা গড়ে উঠেছে। নারীত্বের সৌন্দর্য, কোমল অভিব্যক্তি ও মাধুর্যময় ছন্দের অপূর্ব সমন্বয়ে মোহিনীঅট্টম ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের জগতে একটি স্বতন্ত্র ও নান্দনিক শিল্পরূপ হিসেবে আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

মোহিনীঅট্টম নৃত্যের একটি অঙ্গভঙ্গি। ছবি: থিয়েটার অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস একাডেমি
সত্ৰীয়া
সত্ৰীয়া নৃত্যের ‘সত্ৰীয়া’ শব্দটি ‘সত্ৰ’ থেকে এসেছে। আনুমানিক প্রায় ১৫ শতকে মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব প্রতিষ্ঠিত এই নৃত্য আসামে খ্যাতি লাভ করে। পরম্পরাগতভাবে এ নৃত্য শুধুমাত্র পুরুষের উপবেশনায় সীমিত ছিল। তবে বর্তমানে এ নৃত্যে নারীশিল্পীর দক্ষতারও প্রমাণ মেলে। ২০০০ সালের ১৫ই নভেম্বর সত্রীয়া নৃত্যকে ভারতবর্ষের অন্যতম নৃত্যশৈলীর মর্যাদা দেওয়া হয়।
সত্রীয়া নৃত্য পরিবেশনে পুরুষ শিল্পী। ছবি: প্রিন্টারেস্ট
সময়ের ক্রমবিবর্তনে নৃত্যশিল্প অভূতপূর্ব বিকাশ লাভ করেছে। বর্তমানে নৃত্য গুটিকয়েক শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক নৃত্যে ব্যালে, মোশিং, সাম্বা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে আমাদের সংস্কৃতি ও বিনোদনে। এর মাঝে উপজাতীয় নৃত্যও নিজ মহিমায় জায়গা করে নিয়েছে এখনকার মানুষের হৃদয়ে। নৃত্য এমন একটি শিল্প যার নির্দিষ্ট ভাষার প্রয়োজন হয় না। মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম মূহুর্ত থেকে নৃত্য সামাজিক মিলানায়তন, ধর্মানুষ্ঠান, আনন্দ, কর্মদক্ষতা এবং বিনোদনের অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আমাদের অস্তিত্বে মিশে রয়েছে।
