অরুণেন্দু দাস নামটা শুনে যদি আপনি একটু থমকে যান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাংলা গানের ইতিহাসে তিনি এমন এক মানুষ, যিনি অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তাঁর গান দিয়ে, কিন্তু নিজের নামটাকে কখনো সামনে আনেননি। তবু একটু ভাবুন তো—
“ভালোবাসি তোমায় তাই জানাই গানে…”
অথবা,
“যাস কোথা তুই, কীসের এত তাড়া?”
কিংবা,
“সারা রাত আমি হই শুধু আমার…”
এই গানগুলো নিশ্চয়ই আপনার পরিচিত। হয়তো বহুবার শুনেছেন, গুনগুনও করেছেন। অথচ এই গানগুলোর পেছনে যে মানুষটি ছিলেন, সেই অরুণেন্দু দাসকে আমরা কজনই বা চিনি?
বাংলা গানের ইতিহাসে তিনি এক বিস্ময়। নব্বইয়ের দশকে কলকাতায় যখন সুমন চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্তরা জীবনমুখী গানের নতুন ধারা তৈরি করছিলেন, তখন অনেকেই জানতেন না—অরুণেন্দু দাস সেই পথের যাত্রী হয়ে উঠেছিলেন প্রায় চার দশক আগেই। ১৯৫৬ সাল থেকেই তিনি গিটার হাতে নিজের কথা, নিজের সময় আর নিজের অনুভূতির গান লিখছিলেন। বাংলা ভাষার প্রথম গিটারভিত্তিক সিঙ্গার-সংরাইটার বলা হয় তাঁকে।
কলেজে আর্কিটেকচার পড়ার সময় পাশ্চাত্যের ফোক সংগীতের প্রেমে পড়েন তিনি। পল সাইমন, লিওনার্ড কোহেন কিংবা সেই সময়ের গীতিকেন্দ্রিক সংগীত তাঁর ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। গিটার হাতে তিনি বাংলা ভাষায় নতুন ধরনের গান লেখা শুরু করেন। কখনো বিদেশি গানের বাংলা রূপান্তর, কখনো সম্পূর্ণ নিজের কথা ও সুর। কিন্তু সময়টা তাঁর পক্ষে ছিল না।
তখন কলকাতার আকাশজুড়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কিংবা শ্যামল মিত্রদের সোনালি যুগ। সেই সময়ের শ্রোতারা গিটার হাতে এক তরুণের ব্যক্তিগত কথামালা শুনতে প্রস্তুত ছিলেন না।
ফলে তাঁর গান থেকে যায় কলেজের অনুষ্ঠান, বন্ধুদের আড্ডা আর সীমিত পরিসরের শ্রোতাদের মধ্যেই।
এরপর ষাটের দশকের শেষদিকে তিনি চলে যান ইংল্যান্ডে। সেখানেই আরও গভীরভাবে পরিচিত হন ইউরোপ ও আমেরিকার ফোক ধারার সঙ্গে। তাঁর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ গান রচিত হয় সেই সময়েই। বাংলা ভাষায় ব্যক্তিগত অনুভূতি, নাগরিক জীবন, প্রশ্ন, প্রতিবাদ আর একাকীত্বকে গানে রূপ দেওয়ার যে ধারা পরে জনপ্রিয় হয়, অরুণেন্দু দাস অনেক আগেই তার বীজ বপন করেছিলেন।
বব ডিলানের বিখ্যাত ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’-এর প্রথম বাংলা রূপান্তরও করেছিলেন তিনিই।
তাঁর ভাষায়—
“আরও কত পথ বলো হাঁটলে মানুষ,
তবে সে মানুষ হবে?”
তবু তিনি কখনো আলো চাননি। গান ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সাধনা। নিজের আনন্দে লিখেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে বসে গেয়েছেন। খ্যাতি, বাজার বা প্রতিষ্ঠার কোনো দৌড়ে তাঁকে দেখা যায়নি।
সম্ভবত তাই তাঁর নাম আরও আড়ালেই থেকে যেত, যদি না গৌতম চট্টোপাধ্যায় তাঁর সন্ধান পেতেন।
নব্বইয়ের দশকে মহীনের ঘোড়াগুলি যখন নতুনভাবে ফিরে আসে, তখন তাদের চারটি সংকলন অ্যালবামেই স্থান পায় অরুণেন্দু দাসের গান। ১৯৯৫ সালের ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ থেকে শুরু করে পরবর্তী অ্যালবামগুলো সবখানেই ছড়িয়ে ছিল তাঁর সৃষ্টি।
গৌতম চট্টোপাধ্যায় একবার লিখেছিলেন—
“অরুণদা সেই কবেকার আগেকার এক নাগরিক চারণ। আমাদের সব্বার আগে, ঘোড়াদেরও আগে এগিয়েছিল তাঁর গান।”
এই একটি বাক্যই হয়তো অরুণেন্দু দাসের পরিচয় সবচেয়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরে।
২০০৪ সালে তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র অ্যালবাম—‘অরুণদার গান’। আজও সেটিই তাঁর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ গানের সংকলন। ইউটিউবে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি ভিডিওতে তাঁকে দেখা যায় গিটার হাতে বন্ধুদের আড্ডায় গান গাইতে। সেখানেও নেই কোনো মঞ্চের চাকচিক্য, নেই তারকাসুলভ উপস্থিতি আছেন শুধু একজন মানুষ আর তাঁর গান।
২০১৫ সালে মৌসুমী ভৌমিকের উদ্যোগে লন্ডনে আয়োজন করা হয়েছিল তাঁর গান নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান। পরে নির্মাতা ঋতম সরকার তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেন।
অরুণেন্দু দাস কখনো মূলধারার নায়ক হয়ে ওঠেননি। কিন্তু বাংলা গানের ইতিহাসে তিনি সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা সময়ের অনেক আগে এসে ভবিষ্যতের দরজায় কড়া নেড়েছিলেন।
আজ তাঁর নাম হয়তো খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। কিন্তু তাঁর গানের ভেতর দিয়ে তিনি এখনও বেঁচে আছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, আড্ডা থেকে আড্ডায়, এক গিটার আর কয়েকটি সহজ কথার মধ্যে।