প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
আব্বাসউদ্দীন আহমদ। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
বাংলা সংগীতের ইতিহাস এক বিশাল সমুদ্রের মতো, যেখানে অজস্র সুরের নদী এসে মিশেছে। কিন্তু সেই সমুদ্রে এমন কিছু আলোকবর্তিকা থাকেন, যাঁরা কোনো নির্দিষ্ট ধারার গণ্ডিতে নিজেকে বেঁধে রাখেননি। তাঁরা নিজেই হয়ে ওঠেন একটি আস্ত সংস্কৃতির সমার্থক শব্দ। আব্বাসউদ্দীন আহমদ তেমনই এক কালজয়ী বটবৃক্ষ। যিনি বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-নালা আর খেটে-খাওয়া মানুষের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত সুখ-দুঃখের গানকে গ্রামীণ অন্দরমহল থেকে তুলে এনে পৌঁছে দিয়েছিলেন কলকাতার ড্রয়িংরুম ও আন্তর্জাতিক বিশ্বমঞ্চে।
তাঁর কণ্ঠে 'ভাওয়াইয়া' কিংবা 'ভাটিয়ালি' শুধু কোনো লোকগান ছিল না; তা ছিল সাত-চল্লিশ পূর্ব ও পরবর্তী বাংলার কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন ও আত্মপরিচয়ের দলিল।

বলরামপুরের সেই বালক: শিকড়ের টানে সুরের খোঁজে
১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের কুচবিহারের তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্বাসউদ্দীন। বাবা জাফর আলী আহমদ ছিলেন অঞ্চলের এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনজীবী। স্বাভাবিকভাবেই বনেদি পরিবারের ইচ্ছা ছিল ছেলে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কোনো নামী সরকারি চাকরি বা ওকালতি পেশায় থিতু হবে।
কিন্তু নিয়তি যার কাঁধে বাংলার লোকসংগীতের পুনর্জন্মের ভার সঁপে দিয়েছিল, তাকে কি আর চার দেয়ালের আইনি বইয়ে আটকে রাখা যায়? শৈশব থেকেই আব্বাসউদ্দীনের মন পড়ে থাকত ঘরের বাইরে। তোর্ষা নদীর পাড়, গরুর গাড়ির চাকার কচকচানি শব্দ আর মৈষালদের (মহিষের রাখাল) উদাসী সুর তাঁর কিশোর মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বনাম প্রকৃতির পাঠশালা
স্কুলজীবনেই তাঁর সহজাত গায়কী সবার নজর কাড়ে। কুচবিহারের সুনীতি একাডেমি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ পাস করেন তিনি। বিএ পড়ার সময় কলকাতার রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) ভর্তি হলেও গানের টানে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় ইতি টানেন। কলকাতায় গিয়ে তিনি ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর মতো শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপালের কাছে তালিম নেন। তবে আব্বাসউদ্দীন নিজেই তাঁর আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন, তাঁর প্রকৃত শিক্ষালয় ছিল উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনজীবন এবং সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ।

সামাজিক সংকোচ ভেঙে প্রথম মুসলিম রেকর্ডধারী শিল্পী
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে গান-বাজনাকে ভালো চোখে দেখা হতো না। এমনকি যে দু-একজন মুসলিম শিল্পী গান গাইতেন, তাঁরা সমাজে নিন্দার ভয়ে ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন (যেমন: কে মল্লিক)।
ঐতিহাসিক মোড়: আব্বাসউদ্দীন আহমদ ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলিম শিল্পী, যিনি ১৯৩০-এর দশকে সমস্ত সামাজিক ট্যাবু এবং সংকোচ ভেঙে নিজের আসল নামে গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশ করেন। তাঁর এই একটি সাহসী পদক্ষেপ তৎকালীন মুসলিম সমাজের তরুণদের সংগীত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আসার পথ উম্মুক্ত করে দেয়। তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন সামাজিক নবজাগরণের এক নির্ভীক অগ্রদূত।

নজরুল-আব্বাসউদ্দীন যুগলবন্দি: ইসলামী গানের সূচনা
কলকাতার বিখ্যাত ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ (HMV) রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর আব্বাসউদ্দীনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেখানে তাঁর পরিচয় ও নিবিড় বন্ধুত্ব হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে।
একদিন আড্ডার ছলে আব্বাসউদ্দীন নজরুলকে বলেছিলেন, "কবিদা, কাওয়ালি বা গজল তো অনেকেই গায়। বাঙালি মুসলমানদের জন্য বাংলায় এমন কিছু গান লিখুন না, যা তারা ঘরে ঘরে গাইতে পারে।" নজরুলের হৃদয় ছুঁয়ে গেল সেই কথা। তিনি তৎক্ষণাৎ পানের খিলিতে ঠোঁট চেপে লিখে ফেললেন বাংলা সংস্কৃতির চিরন্তন সেই গান:
"ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।"
আব্বাসউদ্দীনের জাদুকরী কণ্ঠে রেকর্ড হওয়া এই গানটি আজও বিশ্বজুড়ে বাঙালি মুসলমানদের ঈদের প্রধান আবহসংগীত। শুধু এটিই নয়, 'ত্রিশুলধারী' নজরুলকে দিয়ে একের পর এক কালজয়ী ইসলামী গান ও নাথ (যেমন: 'তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে') লিখিয়ে ও সুর করিয়ে তা নিজের কণ্ঠে ধারণ করেন আব্বাসউদ্দীন।

ভাওয়াইয়া ও লোকসংগীতের বিশ্বায়ন
আব্বাসউদ্দীন দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন, আধুনিক ও ধ্রুপদী গানের চেয়েও বাংলার আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে তার লোকসংগীতে। তিনি উত্তর বাংলার তিস্তা, তোর্ষা আর ধরলার অববাহিকায় প্রচলিত 'ভাওয়াইয়া' ও 'চটকা' গানকে মূলধারার সংগীতে প্রতিষ্ঠা করার ব্রত নেন।
তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা কালজয়ী কিছু গান:
ওকি গাড়িয়াল ভাই
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে
আল্লা মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই
নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে
ভাষার প্রশ্নে আপসহীন সত্তা
ভাওয়াইয়ার প্রধান সৌন্দর্য ছিল এর মাটির গন্ধমাখা আঞ্চলিক শব্দ ও সরলতা। একবার কলকাতার রেকর্ড কোম্পানির কর্তারা শহুরে শ্রোতাদের সুবিধার্থে গানের কিছু আঞ্চলিক শব্দ পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আব্বাসউদ্দীন এতে তীব্র কষ্ট পান এবং সাফ জানিয়ে দেন—লোকগানের প্রাণ তার নিজস্ব ভাষায়। শব্দ বদলে দিলে গান তার আত্মা হারাবে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানির কর্তারা তাঁর অনড় সিদ্ধান্তের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন।
ভাওয়াইয়া ছাড়াও তিনি ভাটিয়ালি, জারি, সারি, মুর্শিদি, মার্সিয়া, দেহতত্ত্ব ও পালাগানেও সমান দক্ষতার পরিচয় দেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগে অতিরিক্ত বার্তা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ঘুরে ঘুরে বিলুপ্তপ্রায় লোকগান সংগ্রহ করতে থাকেন।

বিশ্বমঞ্চে বাংলার মাটির সুর
বাংলা লোকসংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাওয়ার একক কৃতিত্ব আব্বাসউদ্দীন আহমদের। ১৯৫০-এর দশকে তিনি ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সংগীত সম্মেলন এবং পরবর্তীতে ইউরোপের আন্তর্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলনে পাকিস্তানের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রতিনিধিত্ব করেন। সুদূর জার্মানি ও আমেরিকার শ্রোতারা যখন তাঁর কণ্ঠে নদীর ঢেউ আর গাড়িয়ালের আকুলতা শুনতেন, তখন ভাষার প্রাচীর ভেঙে তাঁরাও অশ্রুসিক্ত হতেন।
উত্তরাধিকার এবং চিরন্তন বিদায়
আব্বাসউদ্দীন আহমদের সুরের ধারা কেবল তাঁর জীবনকালেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হয়েছে। তাঁরই সুযোগ্য সন্তান—প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফিরদৌসী রহমান, বিচারপতি ও লোকসংগীত অনুরাগী মুস্তাফা কামাল এবং বিশিষ্ট লোকসংগীত গবেষক ও শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।
১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই সুরের জাদুকর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু গান কখনো মরে না।
আজও উত্তরবঙ্গের ধূসর ধূলিওড়ানো মেঠো পথ ধরে যখন কোনো গরুর গাড়ি যায়, আর দূর থেকে কোনো কণ্ঠ গেয়ে ওঠে—‘ওকি গাড়িয়াল ভাই...’, তখন মনে হয় আব্বাসউদ্দীন আহমদ হারিয়ে যাননি। তিনি মৈষালের বাঁশিতে, গাড়িয়ালের গানে আর বাংলার নদীর কলতানে আজও অমর হয়ে আছেন। তিনি কোনো একক শিল্পী নন, তিনি নিজেই বাংলা লোকসংগীতের একটি সোনালী যুগ।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থাবলী :
১. আমার শিল্পীজীবনের কথা — আব্বাসউদ্দীন আহমদ (তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, যেখানে তৎকালীন সমাজ ও সংগীত জীবনের নিখুঁত চিত্র রয়েছে)।

২. আব্বাসউদ্দীন আহমদ: জীবন ও কর্ম — বাংলা একাডেমি পত্রিকা ও লোকসংগীত আর্কাইভ।
৩. কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দীন আহমদ: সুরের মিতালী — মোস্তফা জামান আব্বাসী লিখিত প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণ।
৪. বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাস — ড. আশরাফ সিদ্দিকী।
