প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
গ্যালারিজুড়ে তীব্র দুয়োধ্বনি, ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান আর চিৎকার। ম্যাচের প্রথম এক ঘণ্টা লিভারপুল সমর্থকদের এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই খেলতে হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটিকে। আর্থিক অনিয়মের বিতর্কে জর্জরিত দলটিকে মানসিক চাপে ফেলতে কোনো সুযোগই ছাড়েননি অ্যানফিল্ডের দর্শকরা। তবে ম্যাচের শেষ দিকে পুরো দৃশ্যই বদলে যায়। লিভারপুল সমর্থকদের গর্জন ছাপিয়ে স্টেডিয়ামজুড়ে তখন শোনা যাচ্ছিল সিটির অল্পসংখ্যক সমর্থকের বিজয়গান।
রবিবার (১১ অক্টোবর) ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লিভারপুলের মাঠে ৩-০ গোলের দাপুটে জয় পেয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। মাঠের বাইরের বিতর্ক ও প্রবল সমালোচনার মধ্যে এই জয় দলটির জন্য বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে।
আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় সম্প্রতি স্বাধীন কমিশনের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। তবে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে ক্লাবটি। বিতর্কের প্রভাব পড়েছে মাঠের পরিবেশেও। অ্যানফিল্ডে লিভারপুল সমর্থকদের তীব্র বিরোধিতা ছিল তারই প্রতিফলন।
প্রথম এক ঘণ্টায় ম্যাচ ছিল অনেকটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তবে ৬২ মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে লিভারপুলের রায়ান গ্রাভেনবার্খ মাঠ ছাড়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ৬৫ মিনিটে আর্লিং হলান্ডের গোলে এগিয়ে যায় সিটি। তিন মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন জেরেমি ডোকু। ৭৮ মিনিটে রায়ান শেরকির গোলে জয় নিশ্চিত করে সফরকারীরা।
শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি সিটির কোচ এন্টসো মারেস্কা। কোচিং স্টাফদের জড়িয়ে ধরে উদযাপন করেন তিনি। এরপর খেলোয়াড়দের নিয়ে এগিয়ে যান গ্যালারিতে থাকা সিটির সমর্থকদের কাছে। সমর্থকদের গান ও স্লোগানের সঙ্গে মিশে যায় পুরো দলের উচ্ছ্বাস।
ম্যাচের পর মারেস্কা বলেন, মাঠের বাইরের বিতর্ক বন্ধ করা তাদের হাতে নেই। তবে নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে সেই কোলাহলকে ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তার ভাষায়, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাইরের কোলাহলের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিতে হয়, তা আমাদের শিখতে হবে। এই কোলাহল সব সময় থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদেরও নিজেদের আওয়াজ তৈরি করতে হবে। আর সেই আওয়াজ হলো ম্যাচ জেতা, যেমনটা আজ আমরা করেছি।’
ম্যাচ শেষে অ্যানফিল্ডের পরিবেশ পাল্টে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘খেলা শেষ হওয়ার পর আমাদের সমর্থকরাই গান গাইছিলেন। অর্থাৎ তখন আওয়াজটা আমাদের দিক থেকেই আসছিল, লিভারপুলের দিক থেকে নয়।’
তবে অ্যানফিল্ডে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, সামনের ম্যাচগুলোতেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে মনে করেন সিটি কোচ। আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রতিপক্ষের মাঠে এমন বিরূপ পরিবেশ মোকাবিলা করতে হতে পারে দলটিকে।
মারেস্কা বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রতিপক্ষের মাঠে প্রতিটি ম্যাচেই এ ধরনের আওয়াজ শুনতে হবে। তাই এসব পরিস্থিতি সামলানোর কৌশল শিখতে হবে। একই সঙ্গে নিজেদের কণ্ঠও আরও জোরালো করতে হবে।’
তার মতে, মাঠের বাইরের সমালোচনার সবচেয়ে কার্যকর জবাব হতে পারে ম্যাচের ফল।
‘আমাদের আওয়াজ বলতে বোঝায়, ম্যাচ শেষে কারা গান গাইছে? এই মুহূর্তে সেটিই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
শুধু ফুটবলার কিংবা কোচিং স্টাফ নন, কঠিন সময়ে দলের পাশে দাঁড়াতে অ্যানফিল্ডে উপস্থিত ছিলেন ম্যানচেস্টার সিটির প্রধান নির্বাহী, ফুটবল পরিচালকসহ ক্লাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
মারেস্কার মতে, সংকটের মুহূর্তে পুরো ক্লাবের ঐক্যবদ্ধ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম। ম্যাচের গুরুত্ব বিবেচনায়, বিশেষ করে লিভারপুলের মাঠে অ্যানফিল্ডে এমন একটি ম্যাচে, ক্লাবের সবার একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্তটি ভালো ছিল। এই মুহূর্তে আমাদের এমন ঐক্যই প্রয়োজন।’
গত দুই সপ্তাহ ধরে আর্থিক অনিয়মের রায় ও এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ঘিরে সিটিকে নানা ধরনের চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। এর মধ্যেও ফুটবলাররা যেভাবে নিজেদের মনোযোগ মাঠের খেলায় ধরে রেখেছেন, তাতে সন্তুষ্ট কোচ।
মারেস্কা বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহে যা ঘটেছে, তার পর খেলোয়াড়দের জন্য এই ম্যাচ মোটেও সহজ ছিল না। তবে আমার মনে হয়, তারা পুরো পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে সামলেছে।’
লিভারপুলের বিপক্ষে জয়কে পুরো ক্লাবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘এই মুহূর্তে আমাদের সবার জন্য আজকের মতো একটি জয় প্রয়োজন ছিল। এটা কোচিং স্টাফদের জন্য ভালো, খেলোয়াড়দের জন্য ভালো, সমর্থকদের জন্যও ভালো। একই সঙ্গে পুরো ক্লাবের জন্যও এই জয় গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও আপিলের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে রাজি হননি সিটি কোচ।
তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি ম্যাচের প্রস্তুতি নিতে এবং ম্যাচ জিততে। আগেও অনেকবার বলেছি, আশা করি আমরা আপিলে জিতলে তখন এই পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে পারব।’
মাঠের বাইরের বিতর্ক যতই তীব্র হোক, প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির পারফরম্যান্সে এখন পর্যন্ত তার প্রভাব পড়েনি। মৌসুমের প্রথম ছয় ম্যাচের সবকটিতে জয় তুলে নিয়ে পূর্ণ ১৮ পয়েন্টসহ তালিকার শীর্ষে রয়েছে দলটি।
সিটির চেয়ে তিন পয়েন্ট পিছিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে আর্সেনাল।
অ্যানফিল্ডে লিভারপুলকে তিন গোলে হারিয়ে তাই শুধু গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্টই পায়নি ম্যানচেস্টার সিটি, মাঠের বাইরের বিতর্কের মধ্যেও নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে মারেস্কার দল।
