Logo
Logo
×

লাইফস্কেপ ।  মিউজিক

জিমি হেনড্রিক্সকে কি সত্যিই অপহরণ করা হয়েছিল? রহস্যে ঢাকা এক অজানা অধ্যায়

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬। ০১:৪১ পিএম

আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬। ১৭:২৫ পিএম

জিমি হেনড্রিক্সকে কি সত্যিই অপহরণ করা হয়েছিল? রহস্যে ঢাকা এক অজানা অধ্যায়

বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে গিটার বাজানোর সংজ্ঞাই যেন বদলে দিয়েছিলেন জিমি হেনড্রিক্স। ষাটের দশকের শেষভাগে তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় গিটারবাদকদের একজন। কিন্তু তাঁর জীবন যেমন ছিল অসাধারণ সাফল্যে ভরা, তেমনি ছিল নানা বিতর্ক, আসক্তি এবং রহস্যে ঘেরা কিছু ঘটনা। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অথচ সবচেয়ে কম নিশ্চিত হওয়া ঘটনাগুলোর একটি ১৯৬৯ সালে তাঁর কথিত অপহরণ।

ঘটনাটির কোনো পুলিশি নথি নেই, নেই আদালতের রেকর্ড বা সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন। তবুও ২০১১ সালে প্রকাশিত একটি স্মৃতিকথা এই রহস্যকে আবারও আলোচনায় নিয়ে আসে।

হেরোইনের খোঁজে নাইটক্লাবে

১৯৬৯ সালে জিমি হেনড্রিক্স তাঁর ক্যারিয়ারের শীর্ষে। তাঁর ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় তিনি হেরোইনে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। অনেক সময় অন্য কাউকে না পাঠিয়ে নিজেই মাদক সংগ্রহ করতে বের হতেন।

সেই সূত্রেই এক রাতে তিনি নিউইয়র্কের স্যালভেশন নামের একটি নাইটক্লাবে যান। ক্লাবটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জন রবার্টস যিনি পরে নিজেকে নিউইয়র্কের মাফিয়া জগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন।

স্মৃতিকথায় উঠে আসে অপহরণের দাবি

২০১১ সালে প্রকাশিত জন রবার্টসের স্মৃতিকথা আমেরিকান ডেসপারাডো-তে প্রথমবারের মতো দাবি করা হয়, ওই রাতেই জিমি হেনড্রিক্সকে অপহরণ করা হয়েছিল।

রবার্টসের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্লাবে থাকা দুই ইতালীয় তরুণ হেরোইন কিনতে আসা হেনড্রিক্সকে চিনে ফেলে। এরপর তারা তাঁকে অপহরণ করে আর্থিক সুবিধা আদায়ের পরিকল্পনা করে।

তবে তাদের লক্ষ্য ছিল না প্রচলিত অর্থে মুক্তিপণ আদায়। বরং তারা হেনড্রিক্সের ম্যানেজার মাইকেল জেফ্রির কাছে থাকা শিল্পীর চুক্তিপত্র নিজেদের হাতে নিতে চেয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, সেই চুক্তির বিনিময়ে বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়া সম্ভব হবে।

'তাকে ছেড়ে দাও, না হলে ফল ভালো হবে না'

রবার্টস দাবি করেন, খবর পাওয়ার পর তিনি ও তাঁর এক সহযোগী অপহরণকারীদের খুঁজে বের করেন। এরপর স্পষ্ট হুমকি দেওয়া হয় জিমি হেনড্রিক্সকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে, অন্যথায় ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।

রবার্টসের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় দুই দিন পর হেনড্রিক্সকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

আরও বিস্ময়কর দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, মুক্তির সময় হেনড্রিক্স এতটাই মাদকের প্রভাবে ছিলেন যে হয়তো তিনি নিজেই বুঝতে পারেননি তিনি অপহরণের শিকার হয়েছিলেন।

ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। রবার্টসের দাবি, কয়েক দিন পর তিনি অপহরণকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তি হিসেবে মারধরও করেন।

সত্য নাকি গল্প?

এই দাবি প্রায় চার দশক জনসমক্ষে আসেইনি। ২০১১ সালে স্মৃতিকথা প্রকাশের পর ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

বইটির সহলেখক অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইভান রাইটও শুরুতে পুরো ঘটনাকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি লেখেন, দীর্ঘ গবেষণা এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর তাঁর কাছে জন রবার্টসের বর্ণনাটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে।

তবুও তিনি স্বীকার করেন, ঘটনাটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার মতো কোনো চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

কেন রয়ে গেছে ধোঁয়াশা?

এই কথিত অপহরণ নিয়ে গবেষক, সংগীত ইতিহাসবিদ এবং জিমি হেনড্রিক্সের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে আজও মতভেদ রয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় কারণ, ঘটনার পক্ষে কোনো পুলিশ রিপোর্ট, আদালতের নথি, তদন্ত সংস্থার নথি কিংবা নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক সংবাদপ্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জীবদ্দশায় জিমি হেনড্রিক্স নিজেও কখনো প্রকাশ্যে এমন কোনো অপহরণের কথা উল্লেখ করেননি।

ফলে এটি ইতিহাসের নিশ্চিত তথ্য নয়; বরং একটি বহুল আলোচিত কিন্তু অপ্রমাণিত দাবি হিসেবেই বিবেচিত হয়।

কিংবদন্তির অসমাপ্ত গল্প

এই কথিত ঘটনার কিছু সময়ের মধ্যেই জিমি হেনড্রিক্সের জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৭০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর অকালপ্রয়াণ সংগীতজগতে সৃষ্টি করে অপূরণীয় শূন্যতা।

জিমি হেনড্রিক্সকে ঘিরে অসংখ্য গল্প, গুজব ও রহস্যের মধ্যে ১৯৬৯ সালের এই কথিত অপহরণের ঘটনাও আজ ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায়। সত্যিই কি তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল, নাকি এটি অপরাধজগতের এক নাটকীয় স্মৃতিচারণ তার নির্ভরযোগ্য উত্তর হয়তো আর কখনোই জানা যাবে না।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে