প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০১ পিএম
ছবিসূত্র: ক্রিস্টোফ আরশাম্বল্ট ২০২৩ সালে বালমেইন স্প্রিং সামার প্যারিস ফ্যাশন উইক রানওয়ে তে তোলা ।
ফ্যাশনের ঝলমলে ও দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটে, যাঁরা কোনো রকম উচ্চবাচ্য বা বিতর্ক ছাড়াই নিজেদের একটি স্থায়ী আসন তৈরি করে নেন। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁদের উপস্থিতি শব্দের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। তাঁরা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো মাত্রই কোনো সংলাপ ছাড়াই যেন একটি সম্পূর্ণ গল্প তৈরি হয়ে যায়। স্পেনের বিলবাও শহর থেকে উঠে আসা বিশ্বখ্যাত সুপারমডেল জন কোর্তাজারেনা ঠিক তেমনি একজন ব্যতিক্রমী এবং জাদুকরী ব্যক্তিত্ব।
সাধারণত ফ্যাশন জগৎ মানেই যেখানে গ্ল্যামার, জাঁকজমক আর নানা রকম আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে জন কোর্তাজারেণা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বিগত দুই দশক ধরে তিনি পুরুষ ফ্যাশনের সংজ্ঞাকে প্রতিনিয়ত পুনর্নির্মাণ করে চলেছেন।
অনন্য বৈশিষ্ট্য ও ফ্যাশন জগতে প্রভাব
জন কোর্তাজারেনাকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও সেরা পুরুষ মডেলদের তালিকায় স্থান দেওয়ার পেছনে অনেকগুলো অনন্য গুণ কাজ করেছে:
আকর্ষণীয় উচ্চতা এবং ক্যাটওয়াকে তাঁর আত্মবিশ্বাসী হাঁটার ভঙ্গি সহজেই সবার নজর কাড়ে। ক্যামেরার দিকে তাঁর তাকানোর ভঙ্গি এতটাই তীক্ষ্ণ যে, তা যেকোনো স্থিরচিত্রকে জীবন্ত করে তোলে।
তিনি অতিরিক্ত অঙ্গভঙ্গি না করেও মুখাবয়বের সামান্য পরিবর্তনে তিনি গভীর আবেগ ফুটিয়ে তুলতে পারেন। অসাধারণ ও আভিজাত্যপূর্ণ উপস্থিতিতে যেকোনো পোশাকেই তিনি নিজেকে অত্যন্ত সাবলীলতার সাথে উপস্থাপন করতে সক্ষম হতেন ।

সাধারণ জীবন ও আকস্মিক শুরু
১৯৮৫ সালের ১৯ মে স্পেনের বাস্ক কাউন্টির বিলবাও শহরে জন কোর্তাজারেণার জন্ম। শৈশবে বা কৈশোরে তাঁর আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই জীবন ছিল। মজার ব্যাপার হলো, ছোটবেলায় তাঁর লক্ষ্য বা স্বপ্ন কখনোই মডেলিং করা বা গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করা ছিল না। তিনি লাইমলাইটের আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন।
তবে ভাগ্য তাঁর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। ২০০৩ সালে, যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর, তিনি তাঁর এক বন্ধুর সাথে স্পেনের বার্সেলোনায় একটি ফ্যাশন শো দেখতে যান। সেখানে দর্শক সারিতে থাকা অবস্থায় একজন ফ্যাশন স্কাউটের (মডেলিং এজেন্সির প্রতিনিধি) জহুরি চোখ তাঁর ওপর পড়ে। জনের অনন্য শারীরিক গঠন এবং ব্যক্তিত্ব দেখে সেই স্কাউট তাঁকে মডেলিং ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তাব দেন।
এই একটি মাত্র দুর্ঘটনাবশত ঘটনাই জনের জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। এজেন্সির সাথে যুক্ত হওয়ার পর অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্পেনের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র ইউরোপের বড় বড় ফ্যাশন হাউসের নজর কেড়ে নেন। তাঁর সহজাত প্রতিভা এবং ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক থাকার ক্ষমতা তাঁকে খুব দ্রুতই ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ সারিতে নিয়ে আসে।

টম ফোর্ড এবং বিশ্বমঞ্চে উত্থানের গল্প
জন কোর্তাজারেণার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক মোড় আসে যখন বিশ্বখ্যাত ও কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনার টম ফোর্ড এর সাথে তাঁর কাজ শুরু হয়। টম ফোর্ড ছিলেন একজন খাঁটি জহুরি, যিনি জনের ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাকে শতভাগ কাজে লাগাতে পেরেছিলেন।
টম ফোর্ডের বিভিন্ন এক্সক্লুসিভ ক্যাম্পেইন ও বিজ্ঞাপনে জনের উপস্থিতি এতটাই শক্তিশালী ও আবেদনময়ী ছিল যে, রাতারাতি তিনি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন ও কাঙ্ক্ষিত পুরুষ মডেলে পরিণত হন। টম ফোর্ড যেন জনের জন্য মেন্টর বা গুরুর মতো ছিলেন, আর জন ছিলেন ফোর্ডের অন্যতম প্রধান 'মিউজ' বা অনুপ্রেরণা।
ফ্যাশন সমালোচকদের মতে, টম ফোর্ড ও জন কোর্তাজারেণার এই যুগান্তকারী ও সৃজনশীল সহযোগিতা আধুনিক পুরুষ ফ্যাশনের ক্ষেত্রে একটি নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করেছিল। তাঁদের একসঙ্গে করা কাজগুলো পুরুষালি সৌন্দর্য, ক্লাসিক ফ্যাশন এবং আধুনিক আভিজাত্যের এক নিখুঁত সংমিশ্রণ হিসেবে আজও সমাদৃত।
বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন হাউসগুলোর বিশ্বস্ত মুখ
টম ফোর্ডের সাথে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পাওয়ার পর, পৃথিবীর প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় এবং বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর প্রথম পছন্দে পরিণত হন জন কোর্তাজারেণা। গ্লোবাল র্যাম্প থেকে শুরু করে বড় বড় বিলবোর্ড—সবখানেই ছিল তাঁর রাজকীয় উপস্থিতি।
বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন হাউস টম ফোর্ড এর প্রধান মিউজ হিসেবে তিনি বছরের পর বছর ধরে তাদের এক্সক্লুসিভ সুট, সানগ্লাস এবং সুগন্ধির আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপনে প্রধান মডেল হিসেবে কাজ করেছেন, যা ব্র্যান্ডটিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল। এরপর ইতালীয় ফ্যাশন জায়ান্ট ডলসে অ্যান্ড গাব্বানা এর সাথে কাজ করার সময় তিনি তাদের ভূমধ্যসাগরীয় পুরুষালি ঐতিহ্য এবং আভিজাত্যকে দারুণভাবে ক্যামেরার সামনে ফুটিয়ে তোলেন।
ফ্যাশন দুনিয়ার আরেক কিংবদন্তি জর্জিও আরমানি এর ক্লাসিক্যাল হাই-এন্ড টেইলরিং ও ফরমাল পোশাকের বিজ্ঞাপনে জনের পরিশীলিত লুক দারুণ প্রশংসিত হয়। অন্যদিকে, সাহসী, গ্ল্যামারাস ও বৈচিত্র্যময় ফ্যাশনের জন্য পরিচিত ব্র্যান্ড ভার্সাচি এর সাথে কাজ করার সময় তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক লুকে হাজির হয়ে নিজের বহুমুখী যোগ্যতার প্রমাণ দেন। এছাড়া ফরাসি অভিজাত হাউস চ্যানেল এর প্রধান ডিজাইনার কার্ল ল্যাগারফেল্ডের অধীনে বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ ফ্যাশন শো এবং গ্লোবাল ক্যাম্পেইনে তিনি রানওয়ে কাঁপিয়েছেন।
কেবল এই নামী ব্র্যান্ডগুলোই নয়, এর পাশাপাশি তিনি রবার্তো কাভালি, হুগো বস, ডিজেল এবং বিশ্বখ্যাত রিটেল ব্র্যান্ড জারা এর মতো ভিন্ন ভিন্ন ধারার ব্র্যান্ডের সাথেও অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছেন। একই সাথে ভোগ, জিকিউ, এল অফিসিয়াল এর মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোর প্রচ্ছদে বা কাভার ফটোতে তাঁর ছবি নিয়মিত ও সগর্বে স্থান পেয়েছে।

অভিনয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
জন কোর্তাজারেণা নিজেকে কেবল স্থিরচিত্র বা র্যাম্প ওয়াকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। একজন সফল মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি অভিনয়ের জগতেও পা রাখেন। ২০০৯ সালে তাঁর মেন্টর টম ফোর্ডের পরিচালনায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র 'এ সিঙ্গেল ম্যান’ -এ একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর বড় পর্দায় অভিষেক হয়। তাঁর সহজাত অভিনয় সমালোচকদের বেশ প্রশংসা কুড়ায়। পরবর্তীতে তিনি বেশ কিছু স্প্যানিশ ও আন্তর্জাতিক টিভি সিরিজ এবং চলচ্চিত্রে (যেমন: কোয়ান্টিকো, হাই সি,) অভিনয় করে নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি জন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বেশ সোচ্চার। তিনি পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস-এর সাথে যুক্ত থেকে মহাসাগর রক্ষা এবং প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রচারণামূলক কাজ করে যাচ্ছেন।
ফ্যাশন জগতে তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার
ফ্যাশনের দুনিয়ায় মডেলদের ক্যারিয়ার সাধারণত খুব দীর্ঘ হয় না, বিশেষ করে পুরুষ মডেলদের ক্ষেত্রে। কিন্তু জন কোর্তাজারেণা এখানে একটি বড় ব্যতিক্রম। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে অবস্থান করছেন। তিনি নতুন প্রজন্মের মডেলদের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ যে, কীভাবে অহংকারহীন থেকে, কঠোর পরিশ্রম এবং নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে বছরের পর বছর সাফল্য ধরে রাখা যায়।

জন কোর্তাজারেণা প্রমাণ করেছেন যে ফ্যাশন মানে কেবল দামি পোশাক পরা নয়, ফ্যাশন হলো পোশাকের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিত্ব, সংস্কৃতি এবং আত্মবিশ্বাসকে নীরব ভাষায় ফুটিয়ে তোলা। আর এই নীরব বিপ্লবের কারণেই তিনি ফ্যাশন ইতিহাসের পাতায় একজন অমর আইকন হিসেবে থেকে যাবেন।
