প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ এএম
২০২৬ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালের বিরতিতে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছবি: বাংলাবাজার
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বের নানা সংস্কৃতি, ভাষা ও সংগীতেরও এক মিলনমেলা। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে প্রকাশ্যে এসেছে একটি সম্ভাব্য সংগীত অ্যালবামের গানের তালিকা, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় শিল্পীরা একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন।
ছবি: ফিফাতালিকার প্রথম গান 'গোলস'। এতে কণ্ঠ দিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার লিসা, ব্রাজিলের আনিত্তা এবং নাইজেরিয়ার রেমা। এরপর রয়েছে ‘গেম টাইম’, যেখানে একসঙ্গে গেয়েছেন ফিউচার ও টাইলা। ‘ইলুমিনেট’ গানে কণ্ঠ মিলিয়েছেন জেসি রেয়েজ ও এলিয়ানা, আর ‘ইকো’ গানে রয়েছেন লাতিন সংগীতের কিংবদন্তি ড্যাডি ইয়াঙ্কি ও জ্যামাইকান শিল্পী শেনসিয়া।
অ্যালবামের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গান ‘পোর এয়া’, যেখানে অংশ নিয়েছেন লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলেস ও বেলিন্ডা। তিন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ঐক্যকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে ‘থ্রি নেশনস’ গানটিকে। এতে কণ্ঠ দিয়েছেন টুয়েন্টি ওয়ান স্যাভেজ, নাতা কানো এবং ফ্রেঞ্চ মন্টানা।
এ ছাড়া রয়েছে ‘নো প্লেস লাইক হোম’, যেখানে একসঙ্গে গেয়েছেন মেজর লেজার, নেলি ফুর্তাদো ও ডেভিডো। কিংবদন্তি ব্যান্ড দ্য রোলিং স্টোনসের পরিবেশনায় রয়েছে ‘ইন দ্য স্টারস (রিমিক্স)’। ‘শো মি’ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন আইরা স্টার ও ল্যাট্টো, আর মেক্সিকোর সংস্কৃতিকে উদযাপন করে রয়েছে আলেহান্দ্রো ফের্নান্দেজের ‘মি মেক্সিকো লিন্দো’।
অ্যালবামের অন্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ব্লেসিংস’, যেখানে অংশ নিয়েছেন স্টর্মজি, ফ্রাইডে ও অ্যাঞ্জেল; ‘এনার্জি’, যেখানে রয়েছেন আভা ম্যাক্স ও বিআইএ; ‘লাইটার’, যেখানে কণ্ঠ দিয়েছেন জেলি রোল ও কারিন লিওন; ‘সির সির’, যেখানে একসঙ্গে গেয়েছেন নোরা ফাতেহি, ভেজিড্রিম ও সঞ্জয়; ‘পার্তিদাসো’, শিল্পী ড্যানি ওশেন; ‘চ্যাম্পিয়ন’, আইশোস্পিড; ‘লাভ অলওয়েজ উইন্স’, যেখানে রয়েছেন শ্যাগি, সিমাফাঙ্ক ও জেমা; এবং সবশেষে শাকিরা ও বার্না বয়ের গাওয়া ‘দাই দাই’।
এই সম্ভাব্য অ্যালবামে পপ, রক, হিপ–হপ, আফ্রোবিট, লাতিন, রেগে ও আঞ্চলিক সংগীতের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের একত্র করার মাধ্যমে বিশ্বকাপের বৈশ্বিক চেতনাকে সংগীতের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিশ্বকাপের সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ক বহু পুরোনো। প্রতিটি আসরেই একটি বা একাধিক গান কোটি মানুষের আবেগের অংশ হয়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের সম্ভাব্য এই অ্যালবামও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারে।
ছবি: ফ‘ডাই ডাই’ বিশ্বকাপের নতুন সংগীত পরিচয়
২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান ‘ডাই ডাই’। গানটি গেয়েছেন কলম্বিয়ার বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী শাকিরা এবং নাইজেরিয়ার আফ্রোবিটস তারকা বার্না বয়।
গানটিতে লাতিন পপ, আফ্রিকান ছন্দ ও আধুনিক পপ সংগীতের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের ঐক্য, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং উদ্যাপনের বার্তা তুলে ধরাই ছিল গানটির মূল উদ্দেশ্য। গানটির আয়ের একটি অংশ শিশুদের শিক্ষা ও খেলাধুলার উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ মধ্যবিরতির সংগীতানুষ্ঠান
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ফাইনালে প্রথমবারের মতো মধ্যবিরতির বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান।
এই অনুষ্ঠানের সৃজনশীল পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন ব্রিটিশ ব্যান্ড কোল্ডপ্লে-এর প্রধান কণ্ঠশিল্পী ক্রিস মার্টিন। ফুটবল, সংগীত এবং বিনোদনকে এক মঞ্চে নিয়ে আসার লক্ষ্যেই এই আয়োজন করা হয়।
ছবি: গেটি ইমেজেসএই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে যাঁরা গান পরিবেশন করেন
ম্যাডোনা
বিটিএস
জাস্টিন বিবার
শাকিরা
বার্না বয়
ক্রিস মার্টিন
পিএস–২২ শিশু কোরাস
‘দ্য মাম্পেটস’-এর ব্যান্ড
অর্কেস্ট্রা পরিচালনা করেন গুস্তাভো দুদামেল।
মোট প্রায় ১১ মিনিটের পরিবেশনা হলেও পুরো মধ্যবিরতি প্রায় ২৭ মিনিট স্থায়ী হয়, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম।
ছবি: গেটি ইমেজেসউদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংগীতের রঙ
মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বসংগীতের এক ঝাঁক তারকা অংশ নেন।
শাকিরা ও বার্না বয় প্রথমবারের মতো ‘ডাই ডাই’ গানটি সরাসরি পরিবেশন করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন—
আলেহান্দ্রো ফের্নান্দেজ
বেলিন্ডা
ড্যানি ওশান
জে বালভিন
লিলা ডাউনস
লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলেস
মানা
টাইলা
ছবি: গেটি ইমেজেসফাইনালের আগে সমাপনী অনুষ্ঠানে যাঁরা ছিলেন
ফাইনাল শুরুর আগে এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন—
পোস্ট ম্যালোন
স্বে লি
জেনিফার হাডসন
রবি উইলিয়ামস
নিকোল শেরজিঙ্গার
লরা পাওসিনি
আইশোস্পিড
রবি উইলিয়ামস, নিকোল শেরজিঙ্গার ও লরা পাওসিনি যৌথভাবে ফিফার অফিসিয়াল সংগীত ‘ডিজায়ার’ পরিবেশন করেন। পোস্ট ম্যালোন ও স্বে লি পরিবেশন করেন তাঁদের জনপ্রিয় গান ‘সানফ্লাওয়ার’।
শিল্পীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
শাকিরা (কলম্বিয়া)
বিশ্বখ্যাত লাতিন পপ শিল্পী। ২০১০ সালের ‘ওয়াকা ওয়াকা’ এবং ২০১৪ সালের ‘লা লা লা’-এর পর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও অফিসিয়াল গানের শিল্পী হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েন। তিনটি বিশ্বকাপের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।

বার্না বয় (নাইজেরিয়া)
গ্র্যামি পুরস্কারজয়ী আফ্রোবিটস শিল্পী। আধুনিক আফ্রিকান সংগীতকে বৈশ্বিক পর্যায়ে জনপ্রিয় করে তোলার অন্যতম প্রধান মুখ।
ছবি: ডেইলি পোস্টম্যাডোনা (যুক্তরাষ্ট্র)
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী পপ শিল্পী। বিশ্বকাপের প্রথম মধ্যবিরতির অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী পরিবেশনা করে নতুন ইতিহাসের অংশ হন।
ছবি: বিলবোর্ডবিটিএস (দক্ষিণ কোরিয়া)
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় কে-পপ ব্যান্ডগুলোর একটি। তাঁদের পরিবেশিত ‘ডায়নামাইট’ স্টেডিয়ামজুড়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দেয়।
ছবি : সংগৃহীতজাস্টিন বিবার (কানাডা)
শৈশবেই আন্তর্জাতিক তারকাখ্যাতি পাওয়া এই শিল্পী বিশ্বকাপের মঞ্চে বিশেষ অ্যাকুস্টিক পরিবেশনা করেন।
ছবি: এএফপিক্রিস মার্টিন (যুক্তরাজ্য)
বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড কোল্ডপ্লের প্রধান কণ্ঠশিল্পী। ২০২৬ বিশ্বকাপের মধ্যবিরতির পুরো অনুষ্ঠানটি তাঁর তত্ত্বাবধানেই পরিকল্পিত হয়।
ছবি: ইথান মিলারকেন বিশ্বকাপে সংগীতের গুরুত্ব বাড়ছে?
ফিফা এখন বিশ্বকাপকে কেবল ফুটবল প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, একটি বৈশ্বিক বিনোদন উৎসব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তাই বিশ্বসেরা সংগীতশিল্পীদের এক মঞ্চে এনে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলোতেও সংগীত আরও বড় ভূমিকা পালন করবে। কারণ বর্তমান প্রজন্ম শুধু খেলা নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাও চায়।
অফিসিয়াল বিশ্বকাপের গান
শাকিরা, বার্না বয়
মধ্যবিরতির সংগীতানুষ্ঠান
ম্যাডোনা, বিটিএস, জাস্টিন বিবার, শাকিরা, বার্না বয়, ক্রিস মার্টিন
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
শাকিরা, বার্না বয়, জে বালভিন, বেলিন্ডা, ড্যানি ওশান, মানা, টাইলা
সমাপনী অনুষ্ঠান
পোস্ট ম্যালোন, স্বে লি, জেনিফার হাডসন, রবি উইলিয়ামস, নিকোল শেরজিঙ্গার, লরা পাওসিনি, আইশোস্পিড
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবল ও সংগীত এখন একই মুদ্রার দুই পিঠ। মাঠে যেমন ছিল রুদ্ধশ্বাস লড়াই, তেমনি মঞ্চে ছিল বিশ্বের সেরা শিল্পীদের পরিবেশনা। এই আয়োজন বিশ্বকাপকে শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও সংগীতের সবচেয়ে বড় মিলনমেলায় পরিণত করেছে।
