Logo
Logo
×

লাইফস্কেপ ।  ফ্যাশন

দেশীয় ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে ব্র্যান্ড হয়ে উঠল

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬। ০২:৩৬ পিএম

আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬। ১৩:৩৮ পিএম

দেশীয় ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে ব্র্যান্ড হয়ে উঠল

একসময় যেসব বুটিক হাউসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ছোট পরিসরে, নিছক ভালোবাসা আর সৃজনশীলতার হাত ধরে, সময়ের পরিক্রমায় সেগুলোর অনেকই আজ দেশের শীর্ষ ফ্যাশন ব্র্যান্ড। দেশীয় তাঁত, হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী নকশা আর আধুনিক নান্দনিকতার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান শুধু পোশাক বিক্রি করছে না, বরং বহন করছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের গল্প। ক্রমবর্ধমান চাহিদা, পরিবর্তিত ভোক্তা-রুচি এবং উদ্যোক্তাদের নিরবচ্ছিন্ন উদ্ভাবনী প্রচেষ্টায় দেশীয় ফ্যাশন আজ একটি শক্তিশালী শিল্পখাতে পরিণত হয়েছে।

আধুনিক দেশীয় ফ্যাশন শোরুম বা ক্রেতাদের ভিড়। ছবি: আবু রাইয়ান

ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের ফ্যাশন বাজারের আকার ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অথচ এক দশক আগেও এই বাজারের পরিমাণ ছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এই বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধি শুধু ব্যবসার সম্প্রসারণ নয়, বরং দেশীয় ফ্যাশনের প্রতি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসারও প্রতিফলন।

স্বাধীনতার পর দেশীয় পোশাককে নতুন পরিচয়ে তুলে ধরার পথিকৃৎ ছিল রূপায়ণ, নিপুণ এবং পরে আড়ং। এরপর কারিকা, কুমুদিনী, সেতুলী, জয়া, শুকসারি, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান দেশজ শিল্প ও পোশাককে আধুনিক রূপে উপস্থাপন করে। আশির দশকে এই ধারা আরও বিস্তৃত হয়, আর দেশীয় ফ্যাশন ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত শিল্পে রূপ নিতে শুরু করে।

নারায়ণগঞ্জের বিসিক জামদানি পল্লিতে জামদানি বুননের দৃশ্য। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

দেশীয় কাপড়, তাঁতের বুনন, প্রাকৃতিক রং, লোকজ মোটিফ এবং সমসাময়িক নকশার সৃজনশীল সমন্বয়ে ফ্যাশনে আসে নতুন মাত্রা। একসময় উৎসবকেন্দ্রিক এই পোশাক আজ দৈনন্দিন জীবন, করপোরেট পরিবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতিফলন থাকায় দেশীয় পোশাক এখন কেবল একটি পোশাক নয়, বরং আত্মপরিচয়ের প্রকাশ।

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান একদল স্বপ্নবান তরুণ উদ্যোক্তার। তারা বিশ্বাস করেছিলেন, দেশীয় কাপড় দিয়েও আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাশন তৈরি সম্ভব। সেই বিশ্বাসই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। একসময় বিদেশি পোশাকের প্রতি ঝোঁক থাকা অনেক ক্রেতাই এখন দেশীয় ব্র্যান্ডের পোশাককে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আড়ং, অঞ্জন'স, নিপুণ, কে-ক্র্যাফট, রঙ, সাদাকালো, দেশাল, বিবিয়ানা, নগরদোলা, প্রবর্তনা ও বাংলার মেলার মতো প্রতিষ্ঠান আজ শুধু পরিচিত নাম নয়, বরং দেশের ফ্যাশন শিল্পের শক্তিশালী ব্র্যান্ড। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।

ব্লক প্রিন্ট, বাটিক, হ্যান্ড ব্লক, কারুশিল্প। ছবি: সংগৃহীত 

দেশীয় ফ্যাশনের এই উত্থান মানুষের কেনাকাটার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন এনেছে। আগে ঈদ বা পূজার মতো বড় উৎসবেই নতুন পোশাক কেনার প্রচলন থাকলেও এখন পয়লা বৈশাখ, বসন্ত, বিয়ে, করপোরেট অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে দেশীয় পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। ভোক্তাদের এই পরিবর্তিত রুচির পেছনে রয়েছে উন্নত মান, বৈচিত্র্যময় নকশা, সৃজনশীল ব্র্যান্ডিং এবং দেশীয় ঐতিহ্যের আধুনিক উপস্থাপন।

তবে এই শিল্পের সম্ভাবনা আরও অনেক বড়। সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সরকারের নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় ফ্যাশন শিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শো, প্রদর্শনী ও বাণিজ্য মেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্তভাবে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।

পয়লা বৈশাখ বা উৎসবে দেশীয় পোশাক। ছবি: সংগৃহীত 

একসময় যে দেশীয় বুটিক হাউসগুলো ছিল সীমিত পরিসরের উদ্যোগ, আজ সেগুলো দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা এই ব্র্যান্ডগুলো শুধু বাংলাদেশের ফ্যাশন শিল্পকেই সমৃদ্ধ করছে না, বরং বিশ্বদরবারে 'মেড ইন বাংলাদেশ' পরিচয়ের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে।

রানওয়ে, ফ্যাশন প্রদর্শনী বা টেক্সটাইল এক্সপো। ছবি: সংগৃহীত

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে