প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বরের সেই রাতটি আজও সংগীত ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি ছিলেন শান্তির দূত, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন শিল্পী জন লেনন। কিন্তু সেই মানুষটিকেই গুলি করেছিল তারই এক ভক্ত, মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যান।
ঘটনার চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবুও একটি প্রশ্ন আজও মানুষকে ভাবায় কীভাবে একজন ভক্ত তার আইডলের হত্যাকারী হয়ে উঠতে পারে? এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়। এটি আসক্তি, মানসিক সংকট, পরিচয়ের খোঁজ এবং খ্যাতির অন্ধকার দিকের গল্প।
জন লেনন: একজন শিল্পীর চেয়ে বেশি কিছু
ষাটের দশকে দ্য বিটলস যখন বিশ্বজুড়ে সংগীতের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছিল, তখন জন লেনন হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর। তার গান শুধু বিনোদন ছিল না; ছিল প্রতিবাদ, শান্তি এবং পরিবর্তনের আহ্বান।
“গিভ পিস আ চান্স”, “ইমাজিন” কিংবা “ওয়ার্কিং ক্লাস হিরো” এসব গান তাকে শুধু একজন গায়ক নয়, একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মুখপাত্রে পরিণত করেছিল।
বিশ্বজুড়ে অসংখ্য তরুণের মতো মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যানও জন লেননের ভক্ত হয়ে ওঠেন। কিন্তু অনেক সময় ভক্তি যখন বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।
একজন নিঃসঙ্গ মানুষের গল্প
মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যানের জীবন ছিল জটিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি একধরনের একাকীত্ব ও আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিলেন। বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায়ই নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করতেন। অন্যদিকে বিখ্যাত মানুষদের জীবন তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যেসব মানুষ নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে পান না, তারা অনেক সময় কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিকে নিজেদের আশা, স্বপ্ন বা আদেশ বা আদর্শের প্রতীক বানিয়ে ফেলেন। চ্যাপম্যানের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটিই ঘটেছিল। প্রথমে তিনি জন লেননকে অনুসরণ করতেন। পরে তাকে আদর্শ মনে করতে শুরু করেন। আর ধীরে ধীরে সেই আদর্শই তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
একটি বইয়ের সঙ্গে অস্বাভাবিক সম্পর্ক
চ্যাপম্যানের জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল একটি বই “দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই”। উপন্যাসটির নায়ক হোল্ডেন কলফিল্ড সমাজের মানুষদের “ফোনি” বা ভণ্ড বলে মনে করত।
বইটি লাখো পাঠকের কাছে একটি সাহিত্যকর্ম হলেও চ্যাপম্যানের কাছে এটি হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অংশ। তিনি ধীরে ধীরে ভাবতে শুরু করেন যে পৃথিবী ভণ্ডামিতে ভরা। আর তার চোখে জন লেননও সেই ভণ্ডামির প্রতীক হয়ে ওঠেন।
“ইমাজিন নো পজেশন্স” গান গাওয়া একজন মানুষ কেন বিলাসবহুল জীবনযাপন করবেন? চ্যাপম্যান এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বাস্তবতার চেয়ে নিজের কল্পনার জগতে বেশি ডুবে যেতে থাকেন।
যখন ভক্তি ঘৃণায় রূপ নেয়
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় “আইডিয়ালাইজেশন অ্যান্ড ডিভ্যালুয়েশন”। অর্থাৎ, প্রথমে কাউকে অসাধারণ ও নিখুঁত ভাবা, তারপর হঠাৎ তাকে সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে দেখা।
চ্যাপম্যানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। একসময় তিনি যে মানুষটিকে শ্রদ্ধা করতেন, ধীরে ধীরে তাকেই ঘৃণা করতে শুরু করেন। তবে এই ঘৃণার কেন্দ্রবিন্দুতে হয়তো জন লেনন ছিলেন না। বরং নিজের ব্যর্থতা, হতাশা এবং পরিচয় সংকটের প্রতিফলনই তিনি লেননের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছিলেন।
সেই দিন: ৮ ডিসেম্বর ১৯৮০
সেদিন সকাল থেকেই চ্যাপম্যান দ্য ডাকোটা ভবনের সামনে অবস্থান করছিলেন। তার কাছে ছিল একটি রিভলভার এবং জন লেননের একটি অ্যালবাম।
সন্ধ্যায় জন লেনন যখন স্টুডিওতে যাওয়ার জন্য বের হন, তখন চ্যাপম্যান তার কাছে অটোগ্রাফ চান। লেনন হাসিমুখে স্বাক্ষর দেন। সেই মুহূর্তের একটি ছবি তোলা হয়। ছবিটিতে দেখা যায় একজন বিশ্বখ্যাত শিল্পী এবং তার এক ভক্ত। কেউ জানত না, কয়েক ঘণ্টা পর ইতিহাসের গতিপথ বদলে যাবে।
রাতের দিকে স্টুডিও থেকে ফিরে আসার পর জন লেনন ভবনের প্রবেশপথের দিকে হাঁটছিলেন। ঠিক তখনই চ্যাপম্যান গুলি চালান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবী হারায় তার অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পীকে।
হত্যার পরের অদ্ভুত দৃশ্য
সাধারণত অপরাধীরা পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যান করেননি। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তার হাতে ছিল “দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই”। যেন বাস্তব পৃথিবী আর তার কল্পনার জগত এক হয়ে গিয়েছিল।
যে প্রশ্নের উত্তর আজও খোঁজা হয়
চ্যাপম্যান কি শুধু একজন খুনি? নাকি তিনি একজন গভীরভাবে অসুস্থ ও বিচ্ছিন্ন মানুষ ছিলেন? এই প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক এখনও চলমান।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার জন লেননকে হত্যা করার পেছনে কোনো একক কারণ ছিল না। এটি ছিল মানসিক অস্থিরতা, পরিচয় সংকট, সেলিব্রিটি-আসক্তি, ব্যক্তিগত হতাশা এবং বিকৃত বিশ্বাসের জটিল সমন্বয়।
জন লেননের মৃত্যু শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু ছিল না। এটি ছিল এমন একটি মুহূর্ত, যা দেখিয়ে দিয়েছিল খ্যাতি কতটা শক্তিশালী, আবার কতটা ভঙ্গুর।
আর মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যানের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় কখনও কখনও সবচেয়ে বড় বিপদ আসে ঘৃণা থেকে নয়, অন্ধ ভক্তি থেকে। কারণ ভক্তি যখন বাস্তবতা হারিয়ে ফেলে, তখন ভালোবাসা আর আসক্তির মাঝখানের সীমারেখাটিও মুছে যেতে শুরু করে।
