প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল যুগ সংগীত মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। গীত, বাদ্য ও নৃত্যের সমন্বয়ে সৃষ্ট এই শিল্পকলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং মানব আত্মার পরম খোরাক ও জীবন চলার পথের পাথেয়ও। শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের মতে, সংগীতের চেয়ে মধুর ও আবেদনময়ী আর কিছু নেই।
অতীতের পথচলা প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন ভাষার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি, তখন মানুষ সুর ও আকার-ইঙ্গিতে মনের ভাব প্রকাশ করত। আনন্দ, উৎসব, শোক কিংবা প্রকৃতির রোষানল থেকে বাঁচতে আদিম মানুষ সুরের আশ্রয় নিয়েছিল। সভ্যতার কালচক্রে সিন্ধু সভ্যতা, বৈদিক যুগ পেরিয়ে সংগীত মানুষের সংস্কৃতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিগন্ত বর্তমানে সংগীত সমাজের সর্বস্তরে পরিব্যাপ্ত। মানুষের সুখ-দুঃখে, অবসরে ও সংকটে এটি বিশ্বস্ত সঙ্গী। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে নজরুলের গান বা স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশাত্মবোধক গান মানুষের মনে যুগিয়েছে অদম্য সাহস। মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা আধুনিক মনস্তত্ত্বে সংগীত ‘মিউজিক থেরাপি’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি মানুষের মস্তিষ্ককে ডোপামিন জুগিয়ে মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ দূর করে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সন্ত্রাস দমন, সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণ, ঐতিহ্য রক্ষা এবং আত্মকর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও সংগীত আজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সংগীতের মোহিনী শক্তি জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা কাল নিরপেক্ষ। এটি মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় এবং অসৎ পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। সুরের এই জাদুকরী ভাষা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত। পরিশেষে বলা যায়, মানব জীবনের শুরুতে যার জন্ম, বর্তমানে যার অবাধ বিচরণ এবং ভবিষ্যতে সুশীল সমাজের অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, সংগীতের স্থিতিকাল ও জয়যাত্রা ততদিনই বহমান থাকবে।
প্লেটো বলেছেন, সংগীত মহাবিশ্বকে একটি আত্মা, মনকে ডানা, কল্পনাকে উড়াল এবং জীবন ও সবকিছুর আনন্দ দেয়।
সংগীত একটি অতি পরিচিত বিষয়। এটি মানুষের অনুভূতির অন্যতম প্রকাশ। আনন্দ, দুঃখ, আশা কিংবা ভালোবাসা সব ধরনের অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সংগীত মানুষের সমাজ ও সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি মানুষকে নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে এবং অন্যদের কাছে নিজের সত্তাকে প্রকাশ করার সুযোগ দেয়। পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক নানা অনুষ্ঠানেও সংগীতের ব্যবহার দেখা যায়।
আমেরিকান সংগীতে ইউরোপীয় ও আফ্রিকান প্রভাব
নেটিভ আমেরিকান সংগীত মূলত কণ্ঠের সুর এবং পারকাশন বা তালবাদ্যের ওপর গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই সংগীত শুধু বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত হতো না; বরং গল্প বলা, আচার-অনুষ্ঠান পালন এবং ধর্মীয় কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় বিশ্বাস করত যে সংগীতের মাধ্যমে তারা প্রকৃতি ও অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তাদের অনুষ্ঠানে ড্রাম, বাঁশি এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো, যা পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত।
লুথার স্ট্যান্ডিং বেয়ার বলেন, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের নিজস্ব সুর রয়েছে, আর আদিবাসীরা সেই সুরের সাথেই তাদের জীবনকে মিলিয়ে নেয়।
আমেরিকান সংগীতের বিকাশে ইউরোপীয় অভিবাসী এবং আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রণেই আজকের আমেরিকান সংগীতের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয়রা তাদের লোকগান, ব্যালাড এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমেরিকায় নিয়ে আসে। অন্যদিকে আফ্রিকানরা তাদের শক্তিশালী কণ্ঠসংগীত, ছন্দ এবং কল-এন্ড-রেসপন্স পদ্ধতির ঐতিহ্য নিয়ে আসে।
আফ্রিকান-আমেরিকানদের শ্রমের গান এবং আধ্যাত্মিক সংগীত হলো আমেরিকার মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক অনন্য সুর। কঠোর পরিশ্রমের সময় গাওয়া আফ্রিকান শ্রমের গানগুলো পরবর্তীতে আফ্রিকান-আমেরিকান সংগীতের ভিত্তি হয়ে ওঠে। এই সাংস্কৃতিক মিশ্রণ থেকেই আমেরিকান জনপ্রিয় সংগীতের অনেক ধারা গড়ে উঠেছে।
আমেরিকায় জনপ্রিয় সংগীতের উত্থান ও প্রযুক্তির ছোঁয়া
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের বিস্তারও নতুন মাত্রা লাভ করে। শিট মিউজিক বা স্বরলিপির বই গান আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। পরে ফোনোগ্রাফ, রেকর্ড এবং রেডিওর আবির্ভাব মানুষের কাছে সংগীতকে আরও সহজলভ্য করে তোলে।
এই সময়ে জ্যাজ সংগীতের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জ্যাজ সংগীত মূলত গৃহযুদ্ধের পর সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত ব্রাস বা পিতলের বাদ্যযন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আফ্রিকান-আমেরিকানরা এসব বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করে বাজাতে শুরু করে এবং নিউ অরলিন্সের বার, ক্লাব ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিবেশন করত। এই ব্যাপারে লুই আর্মস্ট্রং-এর মতে, ‘জ্যাজ হলো জীবনের ছন্দ। এটি এমন এক সংগীত যা প্রতিটি মুহূর্তকে বাঁচিয়ে তোলে।’ জ্যাজ সংগীত শুধু আমেরিকাতেই নয়, বিশ্বজুড়েও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং আমেরিকার বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরতে সাহায্য করে।
ফ্রিডরিখ নিচে বলেন, সংগীত ছাড়া জীবন একটি ভুল হতো।
সংগীত রেকর্ড ও বিতরণের পদ্ধতি সমাজে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটায়। বিংশ শতাব্দীতে জনপ্রিয় সংগীত নৃত্য, বিনোদন এবং বহুসংস্কৃতিবাদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনা যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি সংগীতের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমান যুগে সংগীত কেবল সুরের সমাহার নয়; এটি সংস্কৃতি, সামাজিক পরিচয় এবং মানুষের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সংগীত যেমন অতীতের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে, তেমনি ভবিষ্যতের পথও নির্দেশ করে। তাই সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে সংগীতের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ এবং তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
