প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬। ০৩:২৭ পিএম
আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৬। ১৫:৩০ পিএম
নিজের জন্মদিন ঘটা করে উদযাপন করেন না ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। ভক্ত-অনুরাগীরাই নানা আয়োজন করেন তাকে ঘিরে। জন্মদিনের আগের বিকেলটাও পূর্বাচলের একটি ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডায় কাটিয়েছেন ‘নগর বাউল’খ্যাত এই সংগীতশিল্পী। গান, সংগীতের পরিবর্তন, এআই, প্রয়াত সহশিল্পীদের স্মৃতি ও জীবনবোধ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
আশির দশকের তরুণ জেমস আর ২০২৬ সালের জেমসের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন কি না এমন প্রশ্নে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। শুধু মাথায় আগের চেয়ে চুল কিছুটা কমে গেছে এ ছাড়া আর কিছু না।’
বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে পূর্বাচলের ওই ক্লাবে পৌঁছান জেমস। চোখে কালো সানগ্লাস, পরনে হালকা কালো টি-শার্ট ও জলপাই রঙের ট্রাউজার। সবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে পরিচিত হন। এরপর শুরু হয় ছবি তোলা।
ছবি তোলার একপর্যায়ে সবাইকে থামিয়ে গোঁফটা পাকিয়ে নেন তিনি। এরপর জানতে চান, ‘কেমন দেখাচ্ছে?’ চেয়ার টেনে বসে আবার মজা করে বলেন, ‘এই চেহারা নিয়ে এর চেয়ে আর ভালো ছবি হবে না।’
এরই মধ্যে একটি কেক নিয়ে হাজির হন আয়োজকদের একজন। আগাম জন্মদিন উদযাপনে যোগ দেন জেমসও। এরপর শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রায় ২০ মিনিট ধরে বিভিন্ন প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দেন তিনি। কথার ফাঁকে ছিল হাস্যরসও।
গান আসে নিজের মতো
অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা জেমস। কীভাবে এত গান তৈরি করেছেন জানতে চাইলে বলেন, গান তৈরির পেছনে সব সময় পরিকল্পনা বা হিসাব-নিকাশ থাকে না।
‘অত ভেবেচিন্তে বা পরিকল্পনা করে হয়নি। গান তৈরির একটা হিট অব দ্য মোমেন্ট আছে। ন্যাচারালি চলে আসে, আর গান তৈরি হয়ে যায়। জোরাজুরি করে সৃষ্টিশীল কিছু হয় না।’
গানের সংগীতায়োজন নিয়েও খুব জটিলভাবে ভাবেন না তিনি। প্রথমে একটি গানের মৌলিক কাঠামো তৈরি করেন, পরে সেটি ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায়।
জেমস বলেন, ‘একটা গানকে সলিড বা টাইট কিছু হিসেবে না রেখে ফ্রেমটিকে লুজ রাখার চেষ্টা করি, যেন মূলভাব ঠিক রেখে প্রয়োজনে পরিবর্তন করা যায়।’
তার গান কখনো সুরের ওপর কথা বসিয়ে, কখনো আবার কথার ওপর সুর বসিয়ে তৈরি হয়েছে। তবে কথা ও সুর একসঙ্গে চলে আসে এমন গানই তার বেশি পছন্দ।
‘বাচ্চু ভাইয়ের ওপর ভীষণ রাগ হয়’
আড্ডায় উঠে আসে প্রয়াত সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর প্রসঙ্গ। তাকে স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেমস।
‘এবির সঙ্গে কাটানো সময়গুলোকে খুব মিস করি। তার সঙ্গে আলাপ শুরু হওয়া মানেই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাবে। তিনি খুবই আড্ডাবাজ ও মজার মানুষ ছিলেন।’
চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল বলে জানান জেমস। দুজনের দীর্ঘদিনের পথচলা ও সম্পর্কের রসায়ন ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘এই লোকটাকে আমি সবসময় মিস করি। কোনো কারণ ছাড়াই হুট করে এভাবে চলে যাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে বাচ্চু ভাইয়ের ওপর ভীষণ রাগও হয়।’
টেলিফোনে আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে শেষ কথোপকথনের প্রসঙ্গ উঠলেও সেই আলাপের বিস্তারিত জানাননি জেমস।
স্মরণ করেন কবি শামসুর রাহমানকেও। কবির ‘উত্তর’ কবিতা থেকে গাওয়া ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেবো’ গানটি তার প্রিয়। শামসুর রাহমান তার জন্য আরও কয়েকটি গান লিখেছিলেন। তবে সেগুলো আর সুর করা বা রেকর্ডিং করা সম্ভব হয়নি।
প্রয়াত গিটারিস্ট নিলয় দাশ ও সংগীত পরিচালক লাকী আখান্দের কথাও উঠে আসে আলোচনায়।
হারিয়ে গেছে স্টুডিওর আড্ডা
আশির দশকের সংগীতচর্চার পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে জেমস ফিরে যান সেই সময়ের স্টুডিও সংস্কৃতিতে।
তার ভাষায়, তখন মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে স্টুডিওতে নিয়মিত দেখা হতো। রিলাক্স পরিবেশে আড্ডা, গল্প এবং সংগীত নিয়ে ভাবনা বিনিময়ের আলাদা গুরুত্ব ছিল।
একজনের রেকর্ডিংয়ের সময় অন্যজন স্টুডিওতে উপস্থিত থাকতেন। জেমসের রেকর্ডিংয়ে আসতেন আইয়ুব বাচ্চু, আবার বাচ্চুর রেকর্ডিংয়ের সময় সেখানে যেতেন জেমস।
পরস্পরের কাজ দেখা, আড্ডা দেওয়া এবং সংগীত নিয়ে ভাবনা বিনিময়ের সেই পরিবেশ এখন অনেকটাই বদলে গেছে বলে মনে করেন তিনি।
‘বর্তমানে সেই স্টুডিও কালচার উঠে গেছে। সবাই ল্যাপটপ নিয়ে হোম স্টুডিও তৈরি করে নিজেদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।’
‘লাভের চিন্তা থেকে মিউজিক করা যাবে না’
বর্তমান সংগীতচর্চা ও নতুন প্রজন্ম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রযুক্তির পরিবর্তনের প্রসঙ্গও তোলেন জেমস। তার মতে, সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন মেনে নিতে হবে। তবে শিল্প টিকে থাকার ক্ষেত্রে ভালোবাসা ও প্যাশনের গুরুত্ব থেকেই যায়।
এআইয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রযুক্তির কারণে অনেক কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো শিল্প হারিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়লেও মানুষের ভালোবাসা ও প্যাশনের কারণে তা টিকে থাকতে পারে।
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কারণে এখন গান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজলভ্য। পুরোনো ও নতুন গান সহজেই শুনতে পারছেন শ্রোতারা। জেমসের মতে, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া গানই আগামী ২০ বছর মানুষকে গান শোনানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
তবে সহজলভ্যতার কারণে অনেক সময় কোনো কিছুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমে যায় বলেও মনে করেন তিনি। এখন অনেকে পুরো গানও শোনেন না।
সংগীতচর্চার মূল প্রেরণা হিসেবে ভালোবাসা ও প্যাশনের ওপর জোর দিয়ে জেমস বলেন, ‘যা কিছু করতে হবে, কেবল প্যাশন ও ভালোবাসা থেকেই করতে হবে। কোনো লাভের চিন্তা থেকে মিউজিক করা যাবে না। কিছু যদি নিজ থেকেই এসে যায় তো ভালো, কিন্তু লাভের আশা করলে হতাশ হতে হবে।’
নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের কাজের প্রতিও ইতিবাচক তিনি। নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ভালো সংগীত তৈরি করতে পারলে সেটি গ্রহণে আপত্তি নেই তার।
‘এখন এআইয়ের যুগ। তরুণ মিউজিশিয়ানরা যদি সুন্দরভাবে কাজ তৈরি করতে এআই বা নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারে, তবে অবশ্যই তাদের সেটা করা উচিত। নতুন যেকোনো ভালো প্রযুক্তি গ্রহণ করায় কোনো ভুল নেই।’
‘সংস্কৃতি নদীর মতো’
সংগীতের স্বাধীনতা নিয়েও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন জেমস। তার মতে, গান মানুষের শোনা ও গাওয়ার জন্য। মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো বিভিন্ন জায়গায় গান গাইবে এতে বাধা দেওয়া উচিত নয়।
‘সংস্কৃতি নদীর মতো একে আপন গতিতে বইতে দিতে হয়।’
জীবনকে ‘টেক ইট ইজি’
জীবনকে কীভাবে দেখেন প্রশ্নের উত্তরে জেমসের সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘টেক ইট ইজি।’
একজন শিল্পীর সামাজিক দায়িত্বের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমাজের অসংগতি নিয়ে কেউ কথা বলতে চাইলে বলতে পারেন। তবে সেটি নির্ভর করবে তার নিজস্ব উপলব্ধি ও বোধের ওপর।
‘আমি একজন ইন্টারটেইনার, মানুষকে আনন্দ দিতে এসেছি।’
সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের ক্ষেত্রেও তার পরামর্শ, সবাইকে একসঙ্গে ভালো করার বড় কোনো লক্ষ্য নেওয়ার চেয়ে প্রত্যেকে নিজের এবং নিজের আশপাশের মানুষের ভালো করার চেষ্টা করতে পারেন। তাতে স্বাভাবিকভাবেই সমাজেরও উপকার হবে।
জীবনে কী পেয়েছেন, কী পাননি এমন হিসাবও করেন না জেমস। তার কাছে জীবনটা পুরোপুরিই আনন্দের। অপ্রাপ্তি নিয়ে ভাবেননি, কোনো আক্ষেপও পুষে রাখেননি।
বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের পরিসর ছাড়িয়ে জেমস নিজেই একটি বড় পরিচয়ে পরিণত হয়েছেন। এই জনপ্রিয়তা ও প্রত্যাশা তার ওপর কোনো চাপ তৈরি করে কি না এমন প্রশ্নে হেসে বলেন, ‘এই চাপের কারণেই তো আপাতত গানবাজনা করছি না। চাপমুক্ত হলে আবার নতুন গান নিয়ে ভাবব।’
নতুন গান নিয়ে তাড়াহুড়ো নেই
নতুন গান নিয়ে আপাতত কোনো তাড়াহুড়ো নেই জেমসের। তবে সংগীতচর্চা থেমে নেই। এখনো সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন স্টুডিওতে নিয়মিত অনুশীলন করেন। গাড়িতে যাতায়াতের সময়ও গান শোনেন।
প্রায় ২০ মিনিটের প্রশ্নোত্তর শেষে পাশের কক্ষে আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়। সবাই সেখানে বসেছেন কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখছিলেন জেমস। নাশতা শেষে সবাইকে নিয়ে কেক কাটেন।
মুখে হাসি, কথায় রসিকতা পুরো সময়জুড়েই ছিল তার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিদায়ের প্রস্তুতি নেন ‘নগর বাউল’। একে একে সবাই তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। গাড়িতে ওঠার আগে সবার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলেন, ‘ভালো থাকিস।’
