প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০১:৫৯ পিএম
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে ঘিরে সমালোচনা ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ভাষণের শুরুতেই সৃষ্টি হয় নজিরবিহীন উত্তেজনা। তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু প্রতিনিধি ও কূটনীতিক কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
নেতানিয়াহু যখন মঞ্চে উঠে বক্তব্য শুরু করেন, তখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের হল থেকে একের পর এক প্রতিনিধি বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। স্পিকার উপস্থিত প্রতিনিধিদের শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত অল্প কয়েকজন ইসরায়েলি প্রতিনিধি দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানান।
ওয়াকআউটের মধ্যেই নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যান। যারা তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হলে যদি আরও কোনো ‘নৈতিক কাপুরুষ’ থেকে থাকেন, তাহলে তারাও যেন বেরিয়ে যান।
পেজার হাতে তুলে পুরোনো হামলার প্রসঙ্গ
ভাষণের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি ছিল নেতানিয়াহুর হাতে একটি পেজার তুলে ধরা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে লেবাননের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সদস্যদের ব্যবহৃত পেজার বিস্ফোরণের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিতে তিনি এটি ব্যবহার করেন।
পেজারটি হাতে তুলে নেতানিয়াহু বলেন, হিজবুল্লাহ সদস্যদের নিশ্চয়ই ওই পেজারগুলোর কথা মনে আছে।
২০২৪ সালের ওই ঘটনায় হিজবুল্লাহ সদস্যদের ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক পেজার বিস্ফোরিত হয়। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন এবং বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হন। ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং ইসরায়েলের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সংঘাতকে আরও তীব্র করে।
‘সাত ফ্রন্টে’ যুদ্ধের দাবি
নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে গত কয়েক বছরে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে জোরালো সাফাই দেন। তাঁর দাবি, গত তিন বছরে ইসরায়েলি সেনারা সাতটি ফ্রন্টে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লড়েছে।
জাতিসংঘের তুলনামূলকভাবে ফাঁকা গ্যালারির দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, নিউ জার্সির আকারের কোনো দেশ কি তিন বছর ধরে সাতটি ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে?
তিনি আরও দাবি করেন, ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় দেশটি তার প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত করেছে।
ইরানকে ঘিরে নেতানিয়াহুর কঠোর বক্তব্য
ভাষণের বড় একটি অংশজুড়ে ইরানকে আক্রমণ করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। ইরানের শাসনব্যবস্থাকে তিনি ‘ঘাতক স্বৈরাচার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দাবি করেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ফলে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন, তা তিনি রক্ষা করেছেন।
অন্যদিকে, জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধিদলও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় প্রতিবাদ জানায়। ফাঁকা ডেস্কে নিহত কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলেইমানির ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা নীরব প্রতিবাদ করে।
এরদোয়ান, মামদানি ও ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা
নিজের বক্তব্যে শুধু ইরান বা হিজবুল্লাহ নয়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানেরও সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু। তিনি এরদোয়ানকে ‘স্বৈরাচার’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ তোলেন।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও আক্রমণ করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। মামদানির বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেন, তাঁর নির্বাচনের পর নিউইয়র্কের অনেক ইহুদি নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না।
তবে এসব অভিযোগ নেতানিয়াহুর নিজস্ব বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ; সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ফ্রান্স ও ব্রিটেনেরও সমালোচনা করেন তিনি। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ এবং ইসরায়েল নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানের প্রসঙ্গ টেনে নেতানিয়াহু দুই দেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন।
সংক্ষিপ্ত সফরে নিউইয়র্কে নেতানিয়াহু
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে গেছেন নেতানিয়াহু। সফরটি সংক্ষিপ্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দ্রুত দেশে ফেরার প্রস্তুতি রয়েছে তাঁর।
জাতিসংঘের মঞ্চে তাঁর ভাষণ এমন এক সময়ে হলো, যখন গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র মতপার্থক্য চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর ভাষণ যেমন ইসরায়েলের সামরিক অবস্থানের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেছে, তেমনি ওয়াকআউট ও প্রতিবাদও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর বক্তব্য ঘিরে গভীর বিভাজনের চিত্র সামনে এনেছে।





