Logo
Logo
×

খবর ।  বিদেশ

বছরে মানুষ নষ্ট করে ১৩২ কেজি খাবার, শীর্ষে মালদ্বীপ

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ০৪:২০ পিএম

আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ১৮:১১ পিএম

বছরে মানুষ নষ্ট করে ১৩২ কেজি খাবার, শীর্ষে মালদ্বীপ

বিশ্বে ভোক্তাদের জন্য যে পরিমাণ খাবার বাজার, রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়। সহজ হিসাবে, প্রতি পাঁচ ভাগ খাবারের প্রায় এক ভাগ আর মানুষের পেটে পৌঁছায় না।

২০২২ সালে খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ি মিলিয়ে বিশ্বে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার অপচয় হয়েছে। মাথাপিছু হিসাবে এর পরিমাণ বছরে প্রায় ১৩২ কেজি।

একদিকে বিপুল এই অপচয়, অন্যদিকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনো পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। ২০২৫ সালে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রতি ১৩ জনে প্রায় একজন পর্যাপ্ত খাবার পায়নি।

ক্ষুধা কমছে, কিন্তু সংকট কাটেনি

বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা টানা তৃতীয় বছরের মতো কমেছে। ২০২৫ সালে ক্ষুধার হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে যা ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

সংখ্যার হিসাবে ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ এবং ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ কম মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল।

তবে পরিস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক বলার সুযোগ নেই। কারণ কোভিড-১৯ মহামারির আগের ২০১৯ সালের তুলনায় এখনো প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত।

বিশ্বের অঞ্চলগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষ রয়েছে আফ্রিকায়। ২০২৫ সালে মহাদেশটির প্রায় ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে। অর্থাৎ আফ্রিকার প্রতি পাঁচজনের একজন এবং বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই এই মহাদেশের বাসিন্দা।

এশিয়ায় একই সময়ে প্রায় ২৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল, যা এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ বা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকেও সংকটের একই চিত্র উঠে এসেছে। অপুষ্টির হার, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্টান্টিং, ওয়াস্টিং এবং শিশুমৃত্যু—এই চার সূচকের ভিত্তিতে দেশগুলোর ক্ষুধা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়।

সূচকে ৩৫ থেকে ৪৯ দশমিক ৯ স্কোরকে ‘উদ্বেগজনক’ বা অ্যালার্মিং পর্যায় হিসেবে ধরা হয়। ২০২৬ সালে আটটি দেশের পরিস্থিতি এই পর্যায়ে রয়েছে, যার সাতটিই আফ্রিকায়।

পর্যাপ্ত তথ্য থাকা ১২২টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে সোমালিয়া। দেশটির স্কোর ৪৭। এরপর রয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, চাদ ও মাদাগাস্কার।

সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনেও ক্ষুধার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সংঘাত ও পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় কয়েকটি দেশের জন্য পূর্ণাঙ্গ স্কোর নির্ধারণ সম্ভব হয়নি।

এদিকে বিশ্বে উৎপাদিত খাবারের বড় একটি অংশ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাচ্ছে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে উৎপাদিত খাবারের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল কাটার পর থেকে খুচরা দোকানে পৌঁছানোর আগের বিভিন্ন ধাপে নষ্ট হয়। গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এই ক্ষতি ঘটে। ফলমূল ও শাকসবজির মতো দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যে ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

খুচরা বাজারে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাওয়া এই খাবারের বার্ষিক বাজারমূল্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

এরপর খাবার দোকান, রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়িতে পৌঁছানোর পরও বড় অংশ অপচয় হয়। ২০২২ সালে ভোক্তাদের জন্য উপলব্ধ খাবারের প্রায় ১৯ শতাংশ বা ১০৫ কোটি টন শেষ পর্যন্ত ফেলে দেওয়া হয়েছে।

এই বিপুল পরিমাণ খাবার পরিবহন করতে হলে ২০ টন ধারণক্ষমতার প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাক লাগবে।

অপচয়ের বড় অংশই বাসাবাড়িতে

বিশ্বের খাদ্য অপচয়ের সবচেয়ে বড় উৎস বাসাবাড়ি। খুচরা বিক্রি, খাদ্যসেবা ও বাসাবাড়ি পর্যায়ে যে খাবার নষ্ট হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশই আসে ঘর থেকে।

রেস্তোরাঁ, হোটেল, ক্যানটিনসহ খাদ্যসেবা খাতের অংশ প্রায় ২৮ শতাংশ। আর খুচরা দোকান ও সুপারমার্কেটের অংশ প্রায় ১২ শতাংশ।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যা দিয়ে এই অপচয় ভাগ করলে বছরে মাথাপিছু প্রায় ১৩২ কেজি খাবার নষ্ট হয়। এর মধ্যে শুধু বাসাবাড়িতেই মাথাপিছু প্রায় ৭৯ কেজি খাবার অপচয় হচ্ছে। বাকি অংশ আসে খাদ্যসেবা ও খুচরা বিক্রয় খাত থেকে।

তবে দেশভেদে ঘরোয়া খাদ্য অপচয়ের পরিমাণে বড় পার্থক্য রয়েছে।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির হিসাবে, মাথাপিছু ঘরোয়া খাদ্য অপচয়ে সবচেয়ে ওপরে রয়েছে মালদ্বীপ। দেশটিতে বছরে মাথাপিছু প্রায় ২০৭ কেজি খাবার বাসাবাড়িতে নষ্ট হয়।

এরপর সিশেলসে মাথাপিছু প্রায় ১৮৩ কেজি, সিরিয়া ও তিউনিসিয়ায় ১৭২ কেজি করে, মিসরে ১৬৩ কেজি এবং ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে প্রায় ১৬০ কেজি খাবার নষ্ট হওয়ার হিসাব রয়েছে।

তবে এসব দেশের তথ্যের মান ও সংগ্রহপদ্ধতি এক নয়। কোনো কোনো দেশের হিসাব জাতীয় পর্যায়ের সরাসরি তথ্য থেকে এসেছে, আবার কোথাও নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চলের গবেষণা থেকে জাতীয় অনুমান করা হয়েছে। ফলে দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করার সময় এই সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপের পর পাকিস্তানে বাসাবাড়িতে বছরে মাথাপিছু প্রায় ১৩০ কেজি খাবার নষ্ট হয়। আফগানিস্তানে এই পরিমাণ ১২৭ কেজি। বাংলাদেশে প্রায় ৮২ কেজি, শ্রীলঙ্কায় ৭৬ কেজি এবং ভারতে ৫৫ কেজি।

এই অঞ্চলে তুলনামূলক কম ঘরোয়া খাদ্য অপচয় হয় ভুটানে; মাথাপিছু বছরে প্রায় ১৯ কেজি।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যেও বড় ব্যবধান রয়েছে। স্পেনে বাসাবাড়িতে মাথাপিছু বছরে প্রায় ৬১ কেজি খাবার নষ্ট হয়। স্লোভেনিয়ায় তা প্রায় ৩৬ কেজি।

উষ্ণ আবহাওয়ার অনেক দেশে খাবার অপচয়ের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাজা ও দ্রুত পচনশীল খাদ্যের বেশি ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত রেফ্রিজারেশন বা কোল্ড-চেইন সুবিধার অভাবকে বিবেচনা করা হয়। তবে শুধু আবহাওয়া দিয়েই কোনো দেশের খাদ্য অপচয়ের মাত্রা ব্যাখ্যা করা যায় না।

খাবার নষ্ট হওয়ার মূল্য শুধু অর্থের অঙ্কেও সীমাবদ্ধ নয়।

জাতিসংঘের হিসাবে, খাদ্য হারানো ও অপচয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। যে খাবার শেষ পর্যন্ত কেউ খায় না, সেটি উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, সার, শ্রম ও জ্বালানিও কার্যত অপচয় হয়।

বিশ্বের কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ এমন খাবার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, যা শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়। পুরোনো বৈশ্বিক হিসাবে এই জমির পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর—যা আয়তনে কানাডার চেয়েও বড়।

জলবায়ুতেও এর প্রভাব বড়। বিশ্বে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের আনুমানিক ৮ থেকে ১০ শতাংশের সঙ্গে খাদ্য হারানো ও অপচয়ের সম্পর্ক রয়েছে।

খাবার ভাগাড়ে জমে পচলে মিথেন তৈরি হয়। স্বল্পমেয়াদে পৃথিবী উষ্ণ করার ক্ষেত্রে মিথেন কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস।

ফলে খাদ্য অপচয় কমানো শুধু ক্ষুধা মোকাবিলার প্রশ্ন নয়। এটি অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো, কৃষিজমি ও পানি সাশ্রয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সীমিত করারও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে