অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুটি মামলার আসামি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান কাতারে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে কাতারে কখন, কীভাবে এবং কোন কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তার করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।
গ্রেপ্তারের খবর দুদক কীভাবে পেয়েছে, জানতে চাইলে আকতারুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। দুদকের সচিব সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবেন।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই শেখ আব্দুল হান্নান ও তার স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করে দুদক।
সংস্থাটির উপপরিচালক মো. তানজির হাসিব সরকার বাদী হয়ে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ মামলা দুটি দায়ের করেন।
দুদকের অনুসন্ধানে শেখ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায় বলে অভিযোগ করা হয়।
পাশাপাশি তার নামে থাকা ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনে সংস্থাটি।
দুদকের দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে তিনি এসব সম্পদ অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপন করেছেন।
এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়।
অন্য মামলায় শেখ আব্দুল হান্নানের স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯১ লাখ ৯০ হাজার ৩০৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।
তাহমিদার নামে থাকা ৩২টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ১৮ লাখ ১৯ হাজার ৯২৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথাও জানায় দুদক।
সংস্থাটির অভিযোগ, স্বামীর সহায়তায় এসব সম্পদ অর্জন করেন তাহমিদা। এ কারণে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় শেখ আব্দুল হান্নানকেও আসামি করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে কাতার ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে হান্নানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সম্পদের তথ্য পাওয়ার দাবিও করা হয়। এ ছাড়া কানাডায় তার সন্তানদের নামে বিপুল সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়ার কথা জানায় সংস্থাটি। এসব সম্পদের বিস্তারিত তথ্য তদন্তে যাচাই করার কথা বলা হয়েছিল।
বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের আদেশ
দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যে ২০২৫ সালের ৫ মে শেখ আব্দুল হান্নান, তার স্ত্রী তাহমিদা বেগম এবং ছেলে শেখ লাবিব হান্নানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।
পরদিন দুদকের আবেদনে হান্নানের জমি, বাড়ি ও তিনটি ফ্ল্যাট জব্দের পাশাপাশি ছয়টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়।
একই বছরের ২৪ মে হান্নান, তার স্ত্রী ও ছেলের নামে থাকা মোট ৩৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেন আদালত।
এরপর ১১ নভেম্বর হান্নানের সহযোগী সানজিদা আক্তারের নামে থাকা দুটি ফ্ল্যাট জব্দ এবং ১০টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া হয়।
দুদকের অভিযোগ ছিল, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ গোপন করতে সানজিদার নামে ফ্ল্যাট দুটি কিনেছিলেন হান্নান।
চলতি বছরের ৩০ মার্চ হান্নান ও তার স্ত্রীর আয়কর নথি জব্দের আদেশ দেন আদালত।
সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় হান্নানের নামে থাকা ৩৪ শতাংশ জমি ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়। দুদকের আবেদনে জমিটির দলিলমূল্য ১৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়।
শেখ আব্দুল হান্নান ২০২১ সালের ১২ জুন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ১১ জুন তিনি অবসরে যান।
এরপর একই বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।