বাংলার লোককথা, ছড়া, প্রবাদ আর রূপকথায় শিয়াল একটি পরিচিত চরিত্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকের প্রজন্মের অধিকাংশ মানুষ জীবনে একটি প্রকৃত খেকশিয়ালও দেখেনি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, গ্রামাঞ্চলে যাকে আমরা সাধারণত 'পাতি শিয়াল' বলে ডাকি, সেটি আসলে খেকশিয়াল নয়।
বাংলাদেশে শিয়ালজাতীয় প্রাণীর মধ্যে একমাত্র প্রকৃত শিয়াল হলো খেকশিয়াল। আর যে প্রাণীকে অধিকাংশ মানুষ শিয়াল মনে করেন, সেটি হলো সোনালি শৃগাল। এ দুটি প্রাণী একই গোত্রভুক্ত হলেও আলাদা প্রজাতি এবং তাদের গঠন, স্বভাব ও বাসস্থানেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
খেকশিয়াল ও সোনালি শৃগালের পার্থক্য
খেকশিয়াল আকারে ছোট, মুখ সরু ও সূচালো, কান বড় এবং লেজ লম্বা ও ঝুঁটিযুক্ত। লেজের শেষ অংশ সাধারণত কালো রঙের হয়। অন্যদিকে সোনালি শৃগাল তুলনামূলক বড়, শরীর শক্তপোক্ত এবং দেখতে অনেকটা কুকুরের মতো। এ কারণে অনেক সময় মানুষ এ দুটিকে গুলিয়ে ফেলে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সোনালি শৃগালকে ভুল করে ‘পাতি শিয়াল’ নামে ডাকা হলেও প্রাণীবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি প্রকৃত শিয়াল নয়।
বাংলাদেশের একমাত্র প্রকৃত শিয়াল
খেকশিয়াল মূলত উন্মুক্ত তৃণভূমি, চরাঞ্চল, ঝোপঝাড় এবং শুষ্ক সমতল এলাকায় বসবাস করে। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর দেখা মিললেও বর্তমানে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
এরা সাধারণত সন্ধ্যা ও রাতের দিকে বেশি সক্রিয় থাকে। খাদ্য হিসেবে ইঁদুর, ছোট সরীসৃপ, পোকামাকড়, পাখির ডিম, ছোট পাখি এবং বিভিন্ন ফল খায়। কৃষিজমিতে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে খেকশিয়াল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কেন কমে যাচ্ছে খেকশিয়াল?
বাংলাদেশে খেকশিয়ালের অস্তিত্ব আজ বড় সংকটের মুখে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের বাংলাদেশের লাল তালিকায় খেকশিয়ালকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণগুলো হলো—
উন্মুক্ত তৃণভূমি ও ঝোপঝাড় দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া
কৃষিজমি, বসতি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে আবাসস্থল নষ্ট হওয়া
খাদ্যের সংকট
মানুষের হাতে নির্বিচারে হত্যা
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি
পরিবেশগত পরিবর্তন ও বিচ্ছিন্ন আবাসস্থল
অনেক এলাকায় এখনও কুসংস্কার বা ভুল ধারণার কারণে খেকশিয়ালকে ক্ষতিকর প্রাণী মনে করে হত্যা করা হয়। অথচ মানুষের জন্য এটি উপকারী একটি বন্যপ্রাণী।
প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী
খেকশিয়াল শুধু ইঁদুর শিকারই করে না, অনেক সময় মৃত প্রাণীর দেহও খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে ভূমিকা রাখে। ফলে রোগজীবাণুর বিস্তার কমাতেও এটি পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রে খেকশিয়ালের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংরক্ষণে কী করা দরকার?
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, খেকশিয়ালকে টিকিয়ে রাখতে হলে—
উন্মুক্ত তৃণভূমি ও প্রাকৃতিক ঝোপঝাড় সংরক্ষণ করতে হবে।
অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী হত্যা বন্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খেকশিয়ালের বর্তমান অবস্থা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ চালাতে হবে।
স্থানীয় জনগণকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে হবে।
শুধু গল্পে নয়, প্রকৃতিতেও থাকুক খেকশিয়াল
একটি প্রাণী হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রজাতির বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেকশিয়াল বাংলাদেশের একমাত্র প্রকৃত শিয়াল। অথচ আজ সেটিই আমাদের চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
যদি এখনই কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো খেকশিয়ালকে শুধু বইয়ের ছবি কিংবা পুরোনো লোককথার মধ্যেই খুঁজে পাবে।