Logo
Logo
×

খবর ।  অফবিট

ফোন হারালে প্রথম ৩০ মিনিটে যা করবেন

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬। ০৬:৫৭ এএম

আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬। ০৬:৫৭ এএম

ফোন হারালে প্রথম ৩০ মিনিটে যা করবেন

মোবাইল ফোন হারানো বা চুরি যাওয়ার পর প্রথম ৩০ মিনিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ফোনের ভেতরেই এখন ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত ছবি, নথি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের তথ্য থাকে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শুধু ফোন নয়, ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তাই ফোন হারানোর পর প্রথম কাজ নতুন ফোন কেনার চিন্তা নয়; বরং পুরোনো ফোন ও এর সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগুলো দ্রুত সুরক্ষিত করা।

প্রথম ৫ মিনিটে ফোনে কল দিন

অন্য একটি ফোন থেকে নিজের নম্বরে কল করুন। ফোনটি হয়তো চুরি হয়নি, কাছাকাছি কোথাও পড়ে থাকতে পারে। কোনো সৎ ব্যক্তি ফোনটি পেয়ে থাকলে তিনি তা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

তবে ফোনের অবস্থান অপরিচিত বা সন্দেহজনক জায়গায় দেখালে একা সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করা ঠিক নয়। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে।

এরপর দ্রুত ফোনটির অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করুন।

অ্যান্ড্রয়েড ফোন হলে

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে গুগলের ‘ফাইন্ড হাব’ ব্যবহার করে হারানো ফোনের অবস্থান দেখা, শব্দ বাজানো, ফোনটি তালাবদ্ধ করা এবং প্রয়োজন হলে দূর থেকে তথ্য মুছে ফেলা যায়। ফোনে গুগল হিসাব যুক্ত থাকলে এবং প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো চালু থাকলে অন্য ফোন বা কম্পিউটার থেকেও এটি ব্যবহার করা সম্ভব।

ফোনের অবস্থান পাওয়া গেলে কাছাকাছি থাকলে শব্দ বাজিয়ে খুঁজে দেখা যায়। আর ফোনটি হারিয়ে গেছে বা চুরি হয়েছে নিশ্চিত হলে সেটিকে হারানো হিসেবে চিহ্নিত করে তালাবদ্ধ করা যায়। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অবস্থানের এনক্রিপ্ট করা তথ্যও হারানো ফোন শনাক্ত করতে কাজে লাগতে পারে।

আইফোন হলে

আইফোন হারিয়ে গেলে অন্য অ্যাপল যন্ত্র থেকে ‘ফাইন্ড মাই’ অথবা আইক্লাউডের যন্ত্র খোঁজার সুবিধা ব্যবহার করে ফোনের অবস্থান দেখা এবং সেটিকে হারানো হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। হারানো হিসেবে চিহ্নিত করলে ফোনটি পাসকোড দিয়ে তালাবদ্ধ হয় এবং অ্যাপল পে-তে থাকা অর্থ পরিশোধের কার্ড স্থগিত করা হয়।

অ্যাপলের তথ্য অনুযায়ী, আইক্লাউডের যন্ত্র খোঁজার পাতায় প্রবেশের জন্য আলাদা যাচাইকরণ কোড প্রয়োজন হয় না। ফলে বিশ্বস্ত যন্ত্রটিই হারিয়ে গেলেও দ্রুত ফোনটিকে হারানো হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব।

ফোনে আগে থেকেই চুরি-প্রতিরোধ ব্যবস্থা চালু থাকলে নিরাপত্তা আরও বাড়ে। এ ক্ষেত্রে হারানো মোড বন্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও মুখ বা আঙুলের পরিচয় যাচাই প্রয়োজন হতে পারে।

৫ থেকে ১০ মিনিট: সিম বন্ধ করুন

ফোন হারানোর পর দ্রুত সিম কার্ড বন্ধ করা জরুরি। কারণ ফোন নম্বরে ব্যাংক, বিভিন্ন আর্থিক সেবা ও অনলাইন হিসাবের যাচাইকরণ কোড আসতে পারে।

অন্য নম্বর থেকে মোবাইল অপারেটরের গ্রাহকসেবায় যোগাযোগ করে সিম সাময়িকভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন। পরে পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে একই নম্বরের নতুন সিম নেওয়া যাবে।

ফোনটি তালাবদ্ধ থাকলেও সিম অন্য যন্ত্রে ব্যবহার করার সুযোগ থাকলে প্রতারক আপনার নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন হিসাব দখলের চেষ্টা করতে পারে।

১০ থেকে ১৫ মিনিট: আর্থিক হিসাব সুরক্ষিত করুন

ফোনে বিকাশ, নগদ, রকেট বা কোনো ব্যাংকের হিসাব যুক্ত থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকসেবায় যোগাযোগ করুন।

বিশেষ করে ফোনটি যদি তালাবিহীন অবস্থায় চুরি হয়ে থাকে, অথবা চোর আপনার পর্দার গোপন নম্বর জানে, তাহলে দেরি করা উচিত নয়।

প্রয়োজনে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব সাময়িকভাবে বন্ধ বা সুরক্ষিত করুন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক লেনদেন পরীক্ষা করুন। কোনো অচেনা লেনদেন দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে জানান।

১৫ থেকে ২০ মিনিট: গুগল ও অ্যাপল হিসাব পরীক্ষা করুন

গুগল বা অ্যাপল হিসাবের সঙ্গে ফোনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যুক্ত থাকে। ই-মেইল, ছবি, ফোন নম্বর, মেঘভিত্তিক সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন হিসাব পুনরুদ্ধারের সুবিধা এসব হিসাবের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে।

তবে ফোনটি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চললে সঙ্গে সঙ্গে মূল হিসাব থেকে যন্ত্রটি সরিয়ে ফেলা উচিত নয়।

বিশেষ করে আইফোনের ক্ষেত্রে অ্যাপল জানিয়েছে, ‘ফাইন্ড মাই’ থেকে চুরি যাওয়া ফোন সরিয়ে দিলে সক্রিয়করণ তালা উঠে যেতে পারে। এতে চোরের জন্য ফোনটি পুনরায় ব্যবহার বা বিক্রি করা সহজ হতে পারে। এমনকি ফোন দূর থেকে মুছে ফেললেও সেটিকে ‘ফাইন্ড মাই’ থেকে সরানো উচিত নয়।

প্রথমে ফোনটিকে হারানো হিসেবে চিহ্নিত করুন। এরপর অন্য যন্ত্র থেকে হিসাবের নিরাপত্তা পরীক্ষা করুন। অচেনা প্রবেশ বা পরিবর্তন দেখা গেলে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে অপরিচিত যন্ত্রের প্রবেশাধিকার বন্ধ করুন।

২০ থেকে ২৫ মিনিট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-মেইল সুরক্ষিত করুন

ফোনে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, জিমেইল কিংবা অফিসের বিভিন্ন যোগাযোগের হিসাব খোলা থাকতে পারে।

অন্য যন্ত্র থেকে এসব হিসাবে প্রবেশ করে সক্রিয় প্রবেশাধিকার পরীক্ষা করুন। সন্দেহ থাকলে চুরি যাওয়া ফোন থেকে হিসাবগুলো বের করে দিন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।

এর মধ্যে ই-মেইলকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ অনেক অনলাইন হিসাবের পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের সুযোগ ই-মেইলের মাধ্যমে পাওয়া যায়। ই-মেইলে কেউ প্রবেশ করতে পারলে একে একে অন্য হিসাবেও প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।

২৫ থেকে ৩০ মিনিট: আইএমইআই নম্বর সংগ্রহ করে অভিযোগ করুন

প্রতিটি মোবাইল ফোনের আলাদা আইএমইআই নম্বর থাকে। দুই সিমের ফোনে সাধারণত দুটি আইএমইআই নম্বর থাকতে পারে।

ফোনের বাক্স, ক্রয়ের রসিদ বা আগে সংরক্ষণ করে রাখা তথ্য থেকে এই নম্বর পাওয়া যেতে পারে। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ক্ষেত্রে গুগলের ফাইন্ড হাব থেকেও আইএমইআই নম্বর দেখা যায়।

বাংলাদেশে হারানো বা চুরি যাওয়া ফোনের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সময় আইএমইআই নম্বর, ফোনের মডেল, রং, মোবাইল নম্বর এবং ঘটনার সময় ও স্থান সঙ্গে রাখা ভালো।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের জাতীয় যন্ত্র পরিচয় নিবন্ধন ব্যবস্থায় আইএমইআই নম্বর দিয়ে ফোনের বৈধতা ও হারানো বা চুরি হিসেবে প্রতিবেদন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা যায়।

কখন ফোনের তথ্য মুছে ফেলবেন

অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোন দুই ধরনের ফোনেই দূর থেকে তথ্য মুছে ফেলার সুবিধা রয়েছে। তবে এটিকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।

আগে ফোনের অবস্থান শনাক্ত ও সেটিকে তালাবদ্ধ করার চেষ্টা করুন। ফোন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম এবং এর ভেতরে থাকা তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হলে দূর থেকে তথ্য মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

গুগল জানিয়েছে, অ্যান্ড্রয়েড ফোন দূর থেকে মুছে দেওয়ার পর সেটির অবস্থান আর ফাইন্ড হাবে দেখা যাবে না।

অন্যদিকে আইওএস ১৫ বা পরবর্তী সংস্করণের সমর্থিত আইফোন দূর থেকে মুছে দেওয়ার পরও ‘ফাইন্ড মাই’ দিয়ে অবস্থান শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে ফোনটি ‘ফাইন্ড মাই’ থেকে সরানো যাবে না, কারণ এতে সক্রিয়করণ তালা উঠে যেতে পারে।

অর্থাৎ ফোনের তথ্য মুছে ফেলা এবং হিসাব থেকে ফোন সরিয়ে ফেলা এক বিষয় নয়।

ফোন তালাবিহীন অবস্থায় চুরি হলে ঝুঁকি বেশি

ফোনটি চুরির সময় তালাবদ্ধ থাকলে শক্তিশালী গোপন নম্বর বা জৈবিক পরিচয় যাচাই কিছুটা নিরাপত্তা দেয়।

কিন্তু ফোন ব্যবহার করার সময় হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলে ঝুঁকি অনেক বেশি। তখন চোর সরাসরি খুদে বার্তা, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু আর্থিক সেবায় প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় সিম, আর্থিক হিসাব এবং গুগল বা অ্যাপল হিসাব দ্রুত সুরক্ষিত করা জরুরি।

ফোন ফেরত দেওয়ার নামে প্রতারণা হতে পারে

ফোন হারানোর কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর কেউ ফোন করে বলতে পারে, সেটি পাওয়া গেছে। এরপর গোপন নম্বর, পাসওয়ার্ড, যাচাইকরণ কোড বা অন্য কোনো নিরাপত্তা তথ্য চাইতে পারে।

আবার ভুয়া ওয়েব ঠিকানা পাঠিয়ে সেখানে গুগল বা অ্যাপল হিসাবে প্রবেশ করতে বলা হতে পারে। সেখানে তথ্য দিলে আসল পাসওয়ার্ড প্রতারকের হাতে চলে যেতে পারে।

অ্যাপলও সতর্ক করেছে, ফোন পাওয়া গেছে এমন দাবি করে কেউ যোগাযোগ করলে গোপন নম্বর, পাসওয়ার্ড বা যাচাইকরণ কোড দেওয়া যাবে না।

আগে থেকেই পাঁচটি প্রস্তুতি রাখুন

ফোন হারানোর পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা বেশি নিরাপদ।

প্রথমত, শক্তিশালী গোপন নম্বর বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। সহজ নম্বর বা অনুমান করা যায় এমন বিন্যাস এড়িয়ে চলুন।

দ্বিতীয়ত, অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ফাইন্ড হাব এবং আইফোনে ফাইন্ড মাই চালু রাখুন।

তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে দুই ধাপের নিরাপত্তা চালু রাখুন এবং পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় বিকল্প তথ্য নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করুন।

চতুর্থত, ফোনের আইএমইআই নম্বর আলাদা জায়গায় লিখে রাখুন।

পঞ্চমত, গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথির নিয়মিত মেঘভিত্তিক সংরক্ষণ রাখুন। এতে ফোনের তথ্য মুছে ফেলতে হলেও গুরুত্বপূর্ণ নথি হারানোর আশঙ্কা কমে।

ফোনের চেয়ে তথ্যের মূল্য বেশি

স্মার্টফোন হারালে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু এর চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো ফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক হিসাব, ছবি, পরিচয়সংক্রান্ত নথি ও কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্যের হাতে চলে যাওয়া।

তাই ফোন হারানোর পর প্রথম কাজ নতুন ফোন কেনা নয়। প্রথম কাজ হলো হারানো ফোনটিকে দ্রুত আপনার ডিজিটাল জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

সময় যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, ততই অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার সুযোগ বাড়বে।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে