পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দিগন্তবিস্তৃত নীলাদ্রি দেখার স্বপ্ন নিয়ে পর্যটকরা এখানে ছুটে আসেন, কিন্তু সেই পাহাড়ের বাসিন্দারাই আজ এক ফোঁটা সুপেয় পানির জন্য হাহাকার করছেন। শুষ্ক মৌসুম এলেই বান্দরবানের জনপদগুলোতে পানির সংকট যেন এক নিয়মিত অভিশাপে পরিণত হয়।
পাহাড়ের বুক চিরে যে ঝিরি আর ছড়াগুলো প্রবহমান থাকার কথা ছিল, সেগুলো আজ মৃতপ্রায়। এর পেছনে কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন অনিয়ন্ত্রিত বন নিধন এবং পরিবেশের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত সব স্থাপনাকে। পাহাড়ের ঢাল কেটে বসতি তৈরির ফলে মাটির নিচের পানির স্তর যে আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে, তা আজ খালি চোখেই দৃশ্যমান।
সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অতীতে বহুবার পানির প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, উদ্বোধনের কয়েক মাস পরেই প্রকল্পগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে—কারও কোনো খবর নেওয়ার সময় নেই। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা না থাকার কারণেই এমনটা ঘটছে।
পর্যটন ব্যবসার প্রসারে পানির চাহিদা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সেই অনুপাতে প্রাকৃতিক উৎসগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং সাধারণ বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তবে আশার আলোও আছে, যদি আমরা বাস্তুসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটি। অনেক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা মনে করেন, সমাধান আছে হাতের কাছেই—যেমন 'ভিলেজ কমন ফরেস্ট' বা গ্রামভিত্তিক বন রক্ষা করা, যা পানির প্রাকৃতিক আধার হিসেবে কাজ করবে।
এছাড়া প্রতিটি বাড়িতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার আধুনিক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এবং পাহাড়ি ছড়ায় ছোট ছোট চেকড্যাম তৈরি করে পানিপ্রবাহ ঠিক রাখার মতো উদ্যোগগুলো এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে জরুরি হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয়দের মালিকানা নিশ্চিত করা, যাতে করে কোনো কল বা পাম্প নষ্ট হলে তারা নিজেরাই তার যত্ন নিতে পারে।
কেবল অবকাঠামো দিয়ে পাহাড়ের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব নয়।
সরকারি নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় জেলা পরিষদের উচিত একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা, যেখানে পরিবেশের সুরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আমরা যদি আজ পাহাড়ের বুক থেকে বন আর ঝিরিগুলো বাঁচাতে না পারি, তবে ভবিষ্যতের বান্দরবান হবে এক বিশাল মরুভূমি।
পাহাড়ের এই নীরব কান্না কি নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছাবে? তৃষ্ণার্ত বান্দরবানের মানুষ আজ একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় চেয়ে আছে।