আব্দুল কুদ্দুস
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬। ০১:৪১ পিএম
আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬। ১৭:২০ পিএম
দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রবাল দ্বীপ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের এই অনন্য আবাসস্থলটি দীর্ঘকাল ধরে পরিবেশগত হুমকির মুখে রয়েছে। অথচ দেশের আইন ও আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী সেন্ট মার্টিনে সব ধরনের নতুন স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশে বৈরী আবহাওয়া কিংবা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে দ্বীপে আবারও শুরু হয়েছে অবৈধ রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের মহোৎসব। সম্প্রতি অন্তত ১২টি নতুন অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণের খবর আমাদের নাগরিক হিসেবে গভীরভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করে।
কেয়াবন কেটে অবৈধ অবকাঠামো
টেকনাফের সঙ্গে দ্বীপের যোগাযোগ যখন বিচ্ছিন্ন বা সীমিত থাকে, ঠিক তখনই স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এবং ঢাকার একটি অশুভ অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে দ্বীপকে রক্ষা করা কেয়াবন কেটে ফেলা হচ্ছে এবং সৈকতের প্রাকৃতিক বালু ও প্রবাল পাথর তুলে ব্যবহার করা হচ্ছে রিসোর্টের পিলারে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে সরকারের অনুমোদিত ইট, রড, বালু ও সিমেন্ট কালফর্মে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে অবৈধ রিসোর্ট তৈরিতে।
রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনের দায়
যেখানে পরিবেশ রক্ষায় সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জিরো টলারেন্স থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অন্য চিত্র। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও সেন্ট মার্টিনের ওপর ভূগর্ভস্থ লুটেরাদের থাবা বদলায়নি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে ঢাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পর্যটন মৌসুমের আগেই অবকাঠামো দাঁড় করানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
আদালতের সুস্পষ্ট রায় ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন থাকা সত্ত্বেও ‘ঘাট ম্যানেজ’ করে কীভাবে দিনের পর দিন ইট-বালু পৌঁছে যাচ্ছে? প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তর কেন শুধু পর্যটন মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করবে, যখন বর্ষার সুযোগ নিয়ে দ্বীপের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হচ্ছে?
নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি
সেন্ট মার্টিন কোনো কেবল রিসোর্ট ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মুনাফা লোটার জায়গা নয়; এটি দেশের জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ। এই দ্বীপ ধ্বংস হওয়া মানে আমাদের জীববৈচিত্র্যের মানচিত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি।
সেজন্য ‘মৌসুম শুরু হওয়া’র দোহাই না দিয়ে এখনই বিশেষ টিম পাঠিয়ে সমস্ত অবৈধ নির্মাণকাজ বন্ধ করতে হবে এবং আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
উন্নয়ন প্রকল্পের নামে দ্বীপে নেওয়া মালামালের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এতে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হবে।
দলমত নির্বিশেষে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিকদের অনুধাবন করতে হবে যে, সাময়িক ব্যবসার চেয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ রক্ষা পাওয়া অনেক বেশি জরুরি।
পরিবেশ রক্ষা কেবল কাগজের আইনের বিষয় নয়, এর জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও সর্বস্তরের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর হাত বাড়াতে হবে, তা না হলে মানচিত্র থেকে এই রত্নটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।