প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
বর্তমান বিশ্বে ব্যবসার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি,
বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন এবং ভোক্তাদের নতুন চাহিদা উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি করছে
নতুন নতুন সম্ভাবনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে এমন কিছু খাত থাকবে, যেখানে বিনিয়োগ
করলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো লাভের পাশাপাশি টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব।
১. এআই-ভিত্তিক সেবা ও অটোমেশন

বাংলাদেশে ব্যাংক, ই-কমার্স, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ
বিভিন্ন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে এআই-নির্ভর সেবা
এখন সম্ভাবনাময় ব্যবসার একটি বড় ক্ষেত্র।
কেন সম্ভাবনাময়
অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো হাতে-কলমে কাজ পরিচালনা করে। এআই ব্যবহারের
মাধ্যমে কম জনবলে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে কাজ করা সম্ভব। বিশেষ করে অনলাইন ব্যবসায় কাস্টমার
সাপোর্ট, ডেটা বিশ্লেষণ ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এআই চ্যাটবট সেবা
অনলাইন ব্যবসায় প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দিতে
হয়। বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি এআই চ্যাটবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে পণ্যের দাম, স্টক, ডেলিভারি
তথ্য ও অর্ডার লিংক সরবরাহ করতে পারে। ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বিজনেস বা ওয়েবসাইটে
এ সেবা যুক্ত করা যায়। প্রতিষ্ঠানভেদে মাসিক ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব।
প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিকস
আগের বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের চাহিদা অনুমান করা
যায়। এতে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য মজুত করতে পারেন এবং অতিরিক্ত স্টক বা ঘাটতির
ঝুঁকি কমে।
স্বয়ংক্রিয় ফাইন্যান্স টুল
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এমন সফটওয়্যার তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে
দৈনিক বিক্রি, খরচ ও বকেয়ার হিসাব রাখলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিপোর্ট তৈরি হবে।
মেশিন লার্নিংভিত্তিক ঝধধঝ প্ল্যাটফর্ম
স্কুল, কোচিং সেন্টার বা ক্লিনিক ব্যবস্থাপনার জন্য ক্লাউডভিত্তিক
সফটওয়্যার তৈরি করা যেতে পারে। একবার সফটওয়্যার তৈরি হলে তা বহু গ্রাহকের কাছে সাবস্ক্রিপশন
মডেলে বিক্রি করা সম্ভব।
২. টেকসই ও সবুজ জ্বালানি ব্যবসা

বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবেশ সচেতনতার
কারণে বিকল্প জ্বালানি খাতে ব্যবসার সুযোগ বাড়ছে।
সোলার প্যানেল স্থাপন
বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে
সোলার সিস্টেম স্থাপনের চাহিদা বাড়ছে। একটি মাঝারি প্রকল্প থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ
লাভ করা সম্ভব।
ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) চার্জিং স্টেশন
বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে।
চার্জিং স্টেশন বা ব্যাটারি সোয়াপিং সেবা ভবিষ্যতে বড় ব্যবসায় পরিণত হতে পারে।
পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং
প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, কাগজের প্যাকেট ও বায়োডিগ্রেডেবল
পণ্য উৎপাদনের চাহিদা বাড়ছে। ই-কমার্স ও খাদ্য ব্যবসাগুলো এ ধরনের প্যাকেজিং ব্যবহার
করতে আগ্রহী।
৩. হেলথটেক ও টেলিমেডিসিন স্টার্টআপ

মহামারির পর অনলাইন স্বাস্থ্যসেবার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়েছে।
ভিডিও কনসালটেশন, ই-প্রেসক্রিপশন ও ডিজিটাল মেডিক্যাল রেকর্ডভিত্তিক সেবা এখন সম্ভাবনাময়
ব্যবসা।
অনলাইন চিকিৎসা প্ল্যাটফর্ম
নির্দিষ্ট রোগ বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের রোগীদের জন্য বিশেষায়িত
টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। নিবন্ধিত চিকিৎসকদের মাধ্যমে ভিডিও পরামর্শ
সেবা দেওয়া হলে গ্রাহকের আস্থা বাড়বে।
পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্য ডিভাইস
স্মার্টওয়াচ ও ফিটনেস ট্র্যাকার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্লুকোজ
মনিটরিং, হার্ট রেট ট্র্যাকিং এবং চিকিৎসকের কাছে রিপোর্ট পাঠানোর মতো সেবার চাহিদাও
বাড়ছে। ডিভাইস বিক্রির পাশাপাশি সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সেবাও চালু করা যায়।
৪. ই-লার্নিং ও অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম

ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তারের কারণে অনলাইন শিক্ষা এখন দ্রুত জনপ্রিয়
হয়ে উঠছে। ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির প্রস্তুতি, ভাষা শিক্ষা ও প্রযুক্তি দক্ষতা উন্নয়নে
অনলাইন প্ল্যাটফর্মের চাহিদা বাড়ছে।
নির্দিষ্ট বিষয়ের লার্নিং অ্যাপ
আইইএলটিএস, ফ্রিল্যান্সিং, গণিত বা চাকরির প্রস্তুতির মতো নির্দিষ্ট
বিষয়ের ওপর অ্যাপ তৈরি করে সহজেই লক্ষ্যভিত্তিক বাজার তৈরি করা সম্ভব।
এআই-চালিত টিউটরিং
এ ধরনের অ্যাপে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাখ্যা
ও সমাধান পেতে পারে। ব্যক্তিগত দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা নির্দেশনাও
দেওয়া সম্ভব।
গেমিফায়েড লার্নিং
পয়েন্ট, ব্যাজ ও লেভেলভিত্তিক শিক্ষা শিশু ও কিশোরদের শেখার
আগ্রহ বাড়ায়। অ্যাপের ভেতরে প্রিমিয়াম কনটেন্ট বিক্রির মাধ্যমেও আয় করা যায়।
ভার্চ্যুয়াল ক্লাসরুম
লাইভ ক্লাস, রেকর্ডেড ভিডিও, মক টেস্ট ও নোট নিয়ে অনলাইন কোর্স
প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। একবার কোর্স তৈরি হলে তা বহুবার বিক্রি করা সম্ভব।
৫. কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং এজেন্সি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিপণন এখন ব্যবসার অন্যতম প্রধান
মাধ্যম। তাই কনটেন্ট তৈরি ও ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং সেবা একটি লাভজনক খাতে পরিণত হয়েছে।
শর্ট-ফর্ম ভিডিও প্রোডাকশন
ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস ও টিকটকের জন্য ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের
ভিডিও তৈরি করে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা যায়।
ব্র্যান্ড ও ইনফ্লুয়েন্সার সংযোগ
প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত ইনফ্লুয়েন্সার নির্বাচন, ক্যাম্পেইন
পরিচালনা ও ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে কমিশনভিত্তিক আয় করা সম্ভব।
এআই-চালিত কনটেন্ট অপটিমাইজেশন
এআই ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য আকর্ষণীয় ক্যাপশন, ট্রেন্ডিং
হ্যাশট্যাগ, পোস্টের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ এবং ভিডিও স্ক্রিপ্ট তৈরি করে ছোট ব্যবসাগুলোকে
সহায়তা করা যায়। এ সেবা মাসিক সাবস্ক্রিপশন মডেলেও পরিচালনা করা সম্ভব।
২০২৬ সালে প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং ডিজিটাল সেবাকেন্দ্রিক
ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে করা হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা এবং
বাজারের চাহিদা বুঝে এগোতে পারলে এসব খাত নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য লাভজনক ও টেকসই আয়ের
উৎস হয়ে উঠতে পারে।
