বিশ্বের অনেক দেশে কর্মসংস্থানের বাজারে একটি নীরব পরিবর্তন ঘটছে। এক সময় কর্মজীবনের ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সকে অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং পেশাগত পরিপক্বতার সেরা সময় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে অনেক চল্লিশোর্ধ পেশাজীবী নতুন চাকরি খুঁজতে গিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার প্রত্যাখ্যান এবং ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে শুধু বয়স নয়, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, করপোরেট সংস্কৃতির রূপান্তর এবং নিয়োগদাতাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
অভিজ্ঞতার চেয়ে তরুণ কর্মীর চাহিদা
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে তরুণ কর্মীদের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। নিয়োগদাতাদের একটি অংশ মনে করে, নতুন প্রযুক্তি শেখা, দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং দীর্ঘ সময় কাজ করার ক্ষেত্রে তরুণ কর্মীরা বেশি সুবিধাজনক। যদিও এই ধারণা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়, তবুও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এটি একটি প্রভাবশালী মনস্তাত্ত্বিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। ফলে অভিজ্ঞ প্রার্থীরাও অনেক সময় প্রাথমিক বাছাইপর্বেই বাদ পড়ে যান।
উচ্চ বেতন ও ব্যয়ের হিসাব
চল্লিশোর্ধ কর্মীদের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিষয় হলো বেতন। দীর্ঘ কর্মজীবনের কারণে তাঁদের বেতন প্রত্যাশা সাধারণত বেশি থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর কৌশল হিসেবে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কিন্তু কম খরচের কর্মী নিয়োগে আগ্রহী হয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা মন্দার সময় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনেক পেশাজীবী নতুন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের প্রভাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডেটা অ্যানালিটিকসের মতো প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার শ্রমবাজারের চাহিদা বদলে দিয়েছে। যেসব দক্ষতা এক দশক আগে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল, তার কিছু এখন আর আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে যেসব কর্মী নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জন করেননি, তাঁদের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা বয়স নয়; বরং দক্ষতার হালনাগাদ না হওয়া।
'ওভারকোয়ালিফায়েড' হওয়ার ফাঁদ
অনেক অভিজ্ঞ প্রার্থী চাকরির আবেদন করার সময় আরেকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন—‘ওভারকোয়ালিফায়েড’ তকমা। নিয়োগদাতারা প্রায়ই মনে করেন, অতিরিক্ত অভিজ্ঞ কর্মীরা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থাকবেন না বা তাঁদের পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রার্থী সাক্ষাৎকারের সুযোগ পান না। শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি অনেক ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক পক্ষপাতের একটি পরোক্ষ রূপ।
করপোরেট সংস্কৃতির পরিবর্তন
স্টার্টআপ সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের উত্থান কর্মক্ষেত্রের ধারণা বদলে দিয়েছে। ‘দ্রুত’, ‘নমনীয়’ এবং ‘তরুণ’ কর্মপরিবেশকে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্র্যান্ড পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। এই প্রবণতা কখনও কখনও অভিজ্ঞ কর্মীদের জন্য একটি অদৃশ্য বাধা তৈরি করে, যদিও তাঁদের দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্ব বাড়ছে
আধুনিক চাকরির বাজারে কেবল সিভি নয়, পেশাগত নেটওয়ার্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অনেক পেশাজীবী নতুন শিল্পখাত বা প্রযুক্তি-নির্ভর পেশাজীবী নেটওয়ার্কের সঙ্গে পর্যাপ্ত সংযোগ গড়ে তুলতে পারেন না। ফলে চাকরি পরিবর্তনের সময় তাঁরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়েন। অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্ম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং পেশাগত কমিউনিটির মাধ্যমে দ্রুত সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়।
অভিজ্ঞতার মূল্য কি কমে যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিজ্ঞতার মূল্য মোটেও কমে যায়নি। বরং নেতৃত্ব, কৌশল নির্ধারণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প পরিচালনা এবং জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কর্মীদের গুরুত্ব এখনও অপরিসীম। তবে বর্তমান শ্রমবাজারে অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং অভিযোজনক্ষমতার সমন্বয় ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জ
চল্লিশোর্ধ পেশাজীবীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা। নতুন প্রযুক্তি শেখা, পেশাগত নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা এবং দক্ষতাকে নিয়মিত হালনাগাদ করা এখন আর বিকল্প নয়, বরং প্রয়োজন। শ্রমবাজারের বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে বয়স নয়, শেখার সক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতাই একজন কর্মীর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।