সূর্য আগুনের গোলা নয়। এটা গ্যাসের এক বিশাল বল। এর ভেতরে প্রতি মুহূর্তে পারমাণবিক বিক্রিয়া চলছে। সেখান থেকেই আলো আর তাপ আসে। সূর্যের গ্যাস এত গরম যে তা প্লাজমায় পরিণত হয়েছে। প্লাজমা হলো বিদ্যুৎবাহী গরম গ্যাস। সূর্য আমাদের থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। তবু তার মেজাজের প্রভাব পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়।
সূর্যে বিস্ফোরণ কেন হয়
সূর্যের গায়ে মাঝে মাঝে কালচে দাগ দেখা যায়। এগুলোকে বলে সৌরকলঙ্ক। চারপাশের চেয়ে ঠান্ডা বলে দাগগুলো কালো দেখায়। এসব জায়গায় চুম্বকের টান খুব জোরালো। সেই টানের রেখাগুলো পেঁচিয়ে জট পাকিয়ে যায়। একসময় জট খুলে গিয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড শক্তি বেরিয়ে আসে। তখন সূর্যের গায়ে বিস্ফোরণ ঘটে। এর নাম সৌর শিখা। অনেক সময় সঙ্গে প্লাজমার এক বিশাল মেঘও মহাকাশে ছিটকে যায়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন করোনাল ম্যাস ইজেকশন। এই মেঘের ভেতরে থাকে কোটি কোটি টন কণা আর চুম্বকক্ষেত্র।
সূর্যের নিরন্তর নিঃশ্বাস
সূর্য থেকে সব সময় কণার একটা স্রোত বেরিয়ে আসে। এটা আসে সূর্যের বাইরের স্তর করোনা থেকে। এর নাম সৌর বায়ু। সৌর বায়ু সাধারণত সেকেন্ডে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বেগে ছোটে। তবে এটা আমাদের গায়ে লাগা বাতাস নয়। পৃথিবীর কাছে পৌঁছাতে এর দুই থেকে চার দিন লাগে। করোনাল ম্যাস ইজেকশন আরও দ্রুত আসে। সাধারণত এক থেকে তিন দিনে পৌঁছায়। সবচেয়ে বেগবান মেঘ এক দিনেরও কম সময়ে চলে আসতে পারে। অথচ সূর্যের আলো আসে মাত্র প্রায় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ডে।
পৃথিবীর অদৃশ্য ঢাল
পৃথিবী নিজেই একটা বিশাল চুম্বক। এর চারপাশে ছড়িয়ে আছে চুম্বকক্ষেত্র। একে বলে চুম্বকমণ্ডল। এটা পৃথিবীর অদৃশ্য ঢাল। সূর্যের বেশির ভাগ কণা এই ঢালে লেগে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তাই সৌর বায়ুতে আমাদের কোনো ক্ষতি হয় না।
ঝড়ের জন্ম
সমস্যা হয় যখন প্লাজমার মেঘ বেশি শক্তিশালী হয়। আরও বড় কথা, মেঘের চুম্বকক্ষেত্র তখন কোন দিকে মুখ করে আছে। সেটা যদি পৃথিবীর চুম্বকক্ষেত্রের উল্টো দিকে থাকে, তাহলে ঢালে ফাটল ধরে। সেই ফাটল দিয়ে সূর্যের শক্তি পৃথিবীর চুম্বকমণ্ডলে ঢুকে পড়ে। ফলে ঢালটা কাঁপতে থাকে। এই কাঁপুনিকেই বলে ভূচুম্বকীয় ঝড়, বা সৌর ঝড়। এটা বৃষ্টি-বাতাসের ঝড় নয়। এটা চুম্বকক্ষেত্রের ঝড়। মাটিতে দাঁড়িয়ে আমরা একে অনুভব করি না। বিজ্ঞানীরা ঝড়ের তীব্রতা মাপেন ‘জি১’ থেকে ‘জি৫’ পর্যন্ত। জি৫ সবচেয়ে ভয়ংকর।
আকাশে রঙের খেলা
সৌর ঝড়ের সবচেয়ে সুন্দর ফল হলো অরোরা। সূর্যের কণা বায়ুমণ্ডলের গ্যাসে ধাক্কা খেলে আলো জ্বলে ওঠে। অক্সিজেনের কারণে সবুজ বা লাল আলো দেখা যায়। নাইট্রোজেনের কারণে দেখা যায় নীল বা বেগুনি আলো। সাধারণত এই আলো দেখা যায় উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছে। তবে বড় ঝড় হলে তা অনেক দূর পর্যন্ত নেমে আসে। ২০২৪ সালের মে মাসে প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রবল ঝড় হয়। সেবার বহু দেশের আকাশে অরোরা ধরা পড়ে।
প্রযুক্তির জন্য বিপদ
ঝড়ের আরেকটা দিক আছে, আর সেটা সুখকর নয়। এতে স্যাটেলাইটের ক্ষতি হতে পারে। জিপিএস ও রেডিও সংকেত এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। বিদ্যুতের লাইনে অতিরিক্ত স্রোত ঢুকে পড়তে পারে। ১৯৮৯ সালে কানাডার কিউবেক প্রদেশে ঠিক এমনটাই হয়েছিল। প্রায় ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। অন্ধকারে ছিলেন প্রায় ৬০ লাখ মানুষ। মহাকাশচারীদের জন্যও এই সময় ঝুঁকি বাড়ে। তবে মাটির মানুষের শরীরের সরাসরি কোনো ক্ষতি হয় না। বায়ুমণ্ডল ও চুম্বকমণ্ডল আমাদের রক্ষা করে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঝড়
লিখিত ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সৌর ঝড় হয়েছিল ১৮৫৯ সালের সেপ্টেম্বরে। এর নাম ক্যারিংটন ঘটনা। তখন পৃথিবীর বহু জায়গায় টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা অচল হয়ে যায়। কিছু যন্ত্রে স্ফুলিঙ্গ ছোটে। কিছু জায়গায় আগুন ধরার খবরও মেলে। আকাশে এত উজ্জ্বল অরোরা দেখা যায় যে সূর্যের উপস্থিতি ছাড়াই অনেকে ভেবেছিলেন সকাল হয়ে গেছে। তখন বিদ্যুৎ ও স্যাটেলাইটের ওপর মানুষের নির্ভরতা ছিল সামান্য। আজ এমন ঝড় হলে ক্ষতি হতো বহু গুণ বেশি।
সতর্কতার ব্যবস্থা
এখন বিজ্ঞানীরা মহাকাশে বসানো স্যাটেলাইট দিয়ে সূর্যের ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখেন। যুক্তরাষ্ট্রের নোয়া ও নাসা এ কাজ করে। ভারতের আদিত্য-এল১ মিশনও এই কাজে যুক্ত। বিস্ফোরণ দেখা গেলে তাঁরা আগেভাগে সতর্কবার্তা দেন। এতে স্যাটেলাইট পরিচালক ও বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে পারে।
সহজে বললে
সূর্যের গায়ে চুম্বকের জট খুললে বিস্ফোরণ হয়। সেই বিস্ফোরণে প্লাজমার মেঘ ছুটে আসে। পৃথিবীর চুম্বকের ঢালে সেই মেঘ ধাক্কা দিলে ঢাল কেঁপে ওঠে। এটাই সৌর ঝড়।