প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
একটা সময় ইন্টারনেটে মিম ছিল বন্ধুদের গ্রুপ চ্যাটে মজা করার উপকরণ; কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ছবি অনেকটাই বদলে গেছে। এখন মিম শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ, যেখানে ব্র্যান্ড বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, ক্রিয়েটররা আয় করছেন, আর বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকছেন ‘মিমকয়েন’ নামের নতুন এক সম্পদশ্রেণির দিকে।
মিমকয়েন হলো এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি, যা মূলত ইন্টারনেটের নানা মজার ছবি, কৌতুক, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড কিংবা পপ-কালচারকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়। সাধারণ ক্রিপ্টোকারেন্সি যেমন বিটকয়েন বা ইথেরিয়াম কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান বা জটিল আর্থিক লেনদেনের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়, কিন্তু মিমকয়েনের মূল ভিত্তি হলো ইন্টারনেট ট্রোল, হিউমার আর অনলাইন কমিউনিটির আগ্রহ।
২০১৩ সালে জ্যাকসন পামার ও বিলি মার্কাস স্রেফ কৌতুক হিসেবে ‘ডজকয়েন’ তৈরি করার পর থেকেই মূলত এই ধারার সূচনা হয়। এরপর ‘শিবা ইনু’ কিংবা ‘পেপে’র মতো আরও অসংখ্য মিমকয়েন বাজারে এসেছে। বেশিরভাগ সময় ইলন মাস্কের মতো কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি টুইট বা সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ট্রেন্ডের ওপর ভিত্তি করেই এসব কয়েনের জনপ্রিয়তা ও দাম রাতারাতি বহু গুণ বেড়ে যায়।
তবে মিমকয়েনের জগতটা যতটা চমকপ্রদ, ঠিক ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কয়েনের সরবরাহ সাধারণত বিপুল পরিমাণে থাকে, যার ফলে এগুলোর একেকটার দাম থাকে এক সেন্টের ভগ্নাংশের মতো বেশ কম। বেশিরভাগ মিমকয়েনের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী ইকোসিস্টেম বা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যবহার না থাকায় এগুলোর দাম প্রচণ্ড ওঠানামা করে। কোনো একটা ট্রেন্ডের হাইপ শেষ হয়ে গেলে কয়েনের দাম কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ধসে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে না বুঝে বিনিয়োগ করার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই এখানে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এছাড়া প্রতিদিন অসংখ্য নতুন মিমকয়েন বাজারে আসার কারণে এর মধ্যে অনেক ভুয়া প্রজেক্ট বা স্ক্যাম থাকে, যেখানে কয়েন সৃষ্টিকারীরা সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের টাকা নিয়ে সটকে পড়ে।
বাজারের আকার
২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে মিম মার্কেটিংয়ের বাজার ছিল প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের মতো। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ বা ফরেস্টারের মতো বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে এই বাজার বেড়ে প্রায় ৭০০ থেকে ৯৮০ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকবে। এই খাতে প্রতি বছর প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ২০ শতাংশেরও বেশি। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়ার পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য থাকে, তাই এই সংখ্যাগুলোকে একদম হুবহু সত্য না ধরে বাজারের একটা সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি বা ধারণা হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
এখন কথা হলো, মিম কিন্তু এখন আর শুধু হাসাহাসির জিনিস বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই আটকে নেই। ১৩ থেকে ৩৬ বছর বয়সী তরুণদের বড় একটা অংশ প্রতিদিন নিয়মিত মিম শেয়ার করেন। কোম্পানিগুলোও বুঝতে পেরেছে যে গৎবাঁধা বিজ্ঞাপনের চেয়ে মিম বানিয়ে প্রচার চালালে মানুষ বেশি আগ্রহ দেখায় এবং প্রতিক্রিয়াও ভালো পাওয়া যায়।
আর এই মিম-সংস্কৃতির ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে গেছে ক্রিপ্টো জগতের ‘মিমকয়েন’। ডজকয়েন বা শিবা ইনুর মতো মিমকয়েনগুলোর দর প্রতিনিয়ত ওঠানামা করলেও পুরো মিমকয়েন বাজারের সাইজ এখন প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। এই অঙ্কটা টাকায় হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ কোটি থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বিশাল এক বাজার! সব মিলিয়ে, ইন্টারনেটের বিনোদন থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকার কারবার -সবখানেই এখন মিমের জয়জয়কার।
ব্র্যান্ডগুলো কেন মিমে বিনিয়োগ করছে
নেটফ্লিক্স, ডুয়োলিঙ্গোর মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে স্থানীয় স্টার্টআপ -সবাই এখন সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলে মিমকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দিচ্ছে। কারণ গতানুগতিক বিজ্ঞাপনের তুলনায় মিম-নির্ভর কনটেন্ট অনেক বেশি অর্গানিক রিচ ও এনগেজমেন্ট পায়, খরচ তুলনামূলক কম, আর তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করাও সহজ হয়। এ কারণেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন আলাদা ‘মিম মার্কেটিং এজেন্সি’ নিয়োগ করছে এবং এআই-চালিত মিম-জেনারেটর টুল ব্যবহার করে দ্রুত ট্রেন্ড অনুযায়ী কনটেন্ট বানাচ্ছে।
মিম থেকে যেভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে আয় হয়
মিমের আর্থিকীকরণের সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ পাওয়া যায় নন-ফাঞ্জিবল টোকেন (এনএফটি) বাজারে। ২০২১ সালে ‘ন্যান ক্যাট’ মিমের স্রষ্টা ক্রিস তোরেস তার তৈরি রংধনু-রঙা উড়ন্ত বিড়ালের একটি অ্যানিমেশন এনএফটি হিসেবে বিক্রি করে প্রায় ছয় লাখ ডলার পান, এবং পরবর্তীতে একই চরিত্রের আরও কিছু সংস্করণ বিক্রি করে তার মোট আয় আড়াই মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। তাকে অনুসরণ করে ‘সাকসেস কিড’, ‘গ্রাম্পি ক্যাট’, ‘ডিজাস্টার গার্ল’সহ বহু পরিচিত মিমের মূল স্রষ্টারাও নিজেদের সৃষ্টি এনএফটি হিসেবে বিক্রি করে হাজার হাজার থেকে লাখ লাখ ডলার আয় করেছেন। সবচেয়ে বড় চমক ছিল ‘ডোজ’ মিম, যা এনএফটি হিসেবে বিক্রি হয় প্রায় ৪০ লাখ ডলারে।
এই একই ‘ডোজ’ মিম আবার জন্ম দিয়েছে ডজকয়েন নামের এক ক্রিপ্টোকারেন্সিরও, যা এক পর্যায়ে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ও সর্বোচ্চ লেনদেন হওয়া মুদ্রায় পরিণত হয়। ইলন মাস্কের মতো তারকাদের সমর্থনও এই মুদ্রাকে আরও আলোচনায় এনেছে। এখান থেকেই তৈরি হয়েছে ‘মিমকয়েন’ নামের একটি পুরো ক্রিপ্টো বিভাগ, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য বিভিন্ন হিসাবে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে; যদিও এই খাত অত্যন্ত অনুমাননির্ভর ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন।
সাধারণ ক্রিয়েটরদের জন্য বাস্তবতা
তবে প্রতিটি মিম যে লাখ ডলারের এনএফটি হয়ে ওঠে না, বা প্রতিটি মিম-পেইজ যে রাতারাতি ধনী বানায় না -এটাও মনে রাখা জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ফেইসবুক বা ইনস্টাগ্রামে মিম-নির্ভর পেইজ চালিয়ে আয় করার প্রধান পথ হলো প্ল্যাটফর্মের ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপন ও রিলস বোনাস প্রোগ্রাম, যেখানে যোগ্যতা অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট ফলোয়ার সংখ্যা, ভিউ ও কনটেন্ট নীতিমালা মেনে চলতে হয়। দেশীয় দর্শকদের ভিউ থেকে সাধারণত তুলনামূলক কম আয় হয়; আনুমানিক প্রতি দশ লাখ ভিউয়ে কয়েক হাজার টাকার মতো; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের দর্শকদের ভিউ থেকে আয় হতে পারে কয়েকগুণ বেশি। অর্থাৎ মিম-কনটেন্ট থেকে টেকসই আয় করতে হলে প্রয়োজন হয় নিয়মিততা, অরিজিনাল কনটেন্ট এবং একটি প্রকৃত অনুসারী-ভিত্তি; নিছক ভাইরাল হওয়াই যথেষ্ট নয়।
মজা নাকি ব্যবসা?
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বলছে, মিম আসলে দুটো জিনিস একসঙ্গে; মানে এটি এখনও ইন্টারনেট সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত রসবোধের বাহন, আবার একই সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে একটি পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তিতেও। এটি বিজ্ঞাপন বাজেট, ক্রিপ্টো বিনিয়োগ ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর অর্থনীতি -তিন ক্ষেত্রকেই প্রভাবিত করছে। সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে যা নিছক একটা হাসির ছবি, ব্র্যান্ড ও বিনিয়োগকারীদের কাছে তা-ই হয়ে উঠছে মনোযোগ কেনা-বেচার এক নতুন বাজার।
তাই মিম মজা নাকি ব্যবসা -এই প্রশ্ন নয়; বরং এই দ্রুত বদলে যাওয়া, উচ্চ-ঝুঁকির বাজারে কে কতটা টেকসইভাবে টিকে থাকতে পারবে -সেই প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
তথ্যসূত্র: স্ট্যাটিস্টা, গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ, ফরেস্টার, এনএফটি ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম
