Logo
Logo
×

হুক ।  প্রশ্ন

প্লাস্টিকের পাত্রে গন্ধ থাকে, কাচে থাকে না কেন ?

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬। ০৬:১৯ পিএম

আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬। ১৮:১৬ পিএম

প্লাস্টিকের পাত্রে গন্ধ থাকে, কাচে থাকে না কেন ?

গত রাতে বেঁচে যাওয়া তরকারি প্লাস্টিকের পাত্রে রেখে ফ্রিজে দিয়েছিলেন। সকালে খাবার বের করে পাত্রটি সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেললেন। বাইরে থেকে দেখলে একেবারে পরিষ্কার। কিন্তু নাকের কাছে নিতেই হালকা তরকারির গন্ধ পাওয়া গেল।

একই খাবার যদি কাচের পাত্রে রাখা হয়, সাধারণত এমন সমস্যা দেখা যায় না। ভালোভাবে ধুয়ে ফেললে গন্ধ বা দাগের চিহ্নও থাকে না। প্লাস্টিক ও কাচের এই পার্থক্যের মূল কারণ লুকিয়ে আছে তাদের অণুগঠনে।

সাবান ও পানি মূলত পাত্রের পৃষ্ঠ পরিষ্কার করে। কিন্তু খাবারের গন্ধ বা রঙের অণু যদি প্লাস্টিকের ভেতরের স্তরে ঢুকে যায়, তখন শুধু সাবান-পানি দিয়ে সেগুলো পুরোপুরি সরানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই পাত্র দেখতে পরিষ্কার হলেও গন্ধ বা দাগ থেকে যেতে পারে।

প্লাস্টিকের ভেতরে কী ঘটে

অনেকের ধারণা, প্লাস্টিকের গায়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে এবং খাবারের গন্ধ ও রঙ সেই ছিদ্রের মধ্যে আটকে যায়। বিষয়টি আসলে ঠিক এমন নয়।

প্লাস্টিক তৈরি হয় মূলত পলিমার দিয়ে। পলিমার হলো অসংখ্য ছোট অণু পরপর যুক্ত হয়ে তৈরি দীর্ঘ শৃঙ্খল। এই শৃঙ্খলগুলোকে অনেকটা জট পাকানো নুডলসের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

প্লাস্টিকের কোনো কোনো জায়গায় এসব শৃঙ্খল বেশ শক্তভাবে পাশাপাশি থাকে। আবার কিছু জায়গায় সেগুলো তুলনামূলকভাবে আলগা ও এলোমেলো অবস্থায় থাকে।

এই আলগা অংশগুলোর মধ্য দিয়েই খাবারের কিছু অণু প্লাস্টিকের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ গন্ধ বা রঙ কোনো দৃশ্যমান ছিদ্রে আটকে থাকার বদলে প্লাস্টিকের অণুগঠনের মধ্যেই মিশে যায়।

এখানে রসায়নের একটি পরিচিত নিয়ম কাজ করে—সমধর্মী পদার্থ একে অপরের সঙ্গে তুলনামূলক সহজে মিশতে পারে।

খাবার রাখার বেশির ভাগ প্লাস্টিক পাত্র তৈরি হয় পলিইথিলিন বা পলিপ্রোপিলিনের মতো উপাদান দিয়ে। এগুলোর প্রকৃতি তুলনামূলকভাবে নন-পোলার বা তৈলাক্ত।

খাবারের গন্ধ ও রঙ তৈরি করা অনেক অণুও নন-পোলার প্রকৃতির। ফলে এসব অণু প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলে শুধু পাত্রের ওপরের অংশে পড়ে থাকে না, ধীরে ধীরে প্লাস্টিকের ভেতরেও প্রবেশ করতে পারে।

ধরা যাক, তরকারির গন্ধ তৈরি করা একটি অণু প্লাস্টিকের দেয়ালে এসে পৌঁছাল। প্রথমে সেটি পাত্রের পৃষ্ঠের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর পলিমার শৃঙ্খলের অপেক্ষাকৃত আলগা অংশ দিয়ে ভেতরের দিকে ঢুকতে শুরু করে।

পলিমারের শৃঙ্খলও পুরোপুরি স্থির থাকে না। অণু পর্যায়ে এগুলো ক্রমাগত সামান্য নড়াচড়া করে। সেই নড়াচড়ার সুযোগে খাবারের অণুটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে প্লাস্টিকের আরও ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

সমস্যা দেখা দেয় পাত্র ধোয়ার সময়। সাবান ও পানি পাত্রের ওপরে থাকা তেল, খাবারের অংশ ও গন্ধের অণু সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যেসব অণু ইতিমধ্যে প্লাস্টিকের ভেতরে ঢুকে গেছে, সেখানে সাবান সহজে পৌঁছাতে পারে না।

ফলে পরিষ্কার করার পরও গন্ধ থেকে যায়।

টমেটো সস ও হলুদের দাগ যায় না কেন

তরকারির গন্ধের মতো টমেটো সস কিংবা হলুদের দাগের ক্ষেত্রেও প্রায় একই প্রক্রিয়া ঘটে।

টমেটোর লাল রঙের জন্য দায়ী অন্যতম উপাদান লাইকোপিন। এটি তৈলাক্ত বা নন-পোলার প্রকৃতির একটি অণু।

প্লাস্টিকের সঙ্গে এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের মিল থাকায় লাইকোপিন পাত্রের ওপরের অংশ থেকে ধীরে ধীরে প্লাস্টিকের গঠনের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে।

এ কারণেই টমেটো সস বা টমেটোভিত্তিক তরকারি রাখার পর অনেক প্লাস্টিকের পাত্রে লাল বা কমলা রঙের দাগ দেখা যায়।

একই ঘটনা ঘটে হলুদের ক্ষেত্রেও। হলুদের উজ্জ্বল হলুদ রঙের জন্য মূলত কারকিউমিন নামের অণু দায়ী। এটিও প্লাস্টিকের সঙ্গে সহজে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে এবং পাত্রের ভেতরের অংশে ঢুকে যেতে পারে।

তখন শুধু শক্ত করে ঘষলেই দাগ উঠে যাবে—এমন নিশ্চয়তা থাকে না। কারণ রঙের কিছু অণু আর শুধু পৃষ্ঠে নেই; সেগুলো প্লাস্টিকের ভেতরেই ছড়িয়ে গেছে।

কাচের ক্ষেত্রে কেন এমন হয় না

কাচও একটি কঠিন পদার্থ। তাহলে খাবারের গন্ধ বা রঙের অণু কাচের ভেতরে একইভাবে ঢুকে যায় না কেন?

এর কারণ কাচের গঠন প্লাস্টিকের তুলনায় একেবারেই আলাদা।

কাচের প্রধান উপাদান সিলিকা। এতে সিলিকন ও অক্সিজেন পরমাণু শক্তভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ত্রিমাত্রিক জালের মতো কাঠামো তৈরি করে।

প্লাস্টিকের মতো কাচে লম্বা, নমনীয় ও নড়াচড়া করা পলিমার শৃঙ্খল নেই। এর গঠন অনেক বেশি শক্ত এবং ঘন।

ফলে খাবারের গন্ধ বা রঙ তৈরি করা অণুর কাচের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ খুবই কম।

এসব অণু সাধারণত কাচের পৃষ্ঠেই থেকে যায়। ফলে সাবান ও পানি দিয়ে ধোয়ার সময় সেগুলো সহজে সরানো সম্ভব হয়।

এই কারণেই কাচের পাত্রে টমেটো সস, হলুদযুক্ত তরকারি বা তীব্র গন্ধের খাবার রাখলেও প্লাস্টিকের মতো দীর্ঘস্থায়ী গন্ধ বা দাগ সাধারণত তৈরি হয় না।

স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রেও অনেকটা একই সুবিধা পাওয়া যায়। এর পৃষ্ঠ খাবারের গন্ধ ও রঙের অণুর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম মিথস্ক্রিয়া করে।

খাদ্যশিল্পেও এই সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ

প্লাস্টিকের এই বৈশিষ্ট্য শুধু বাসার রান্নাঘরের সমস্যা নয়। খাদ্য ও পানীয় শিল্পেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো খাবার বা পানীয়ের স্বাদ ও গন্ধ তৈরি করা অণুর একটি অংশ যদি প্লাস্টিকের প্যাকেজিংয়ের ভেতরে চলে যায়, তাহলে পণ্যের স্বাদ বা সুগন্ধ কিছুটা বদলে যেতে পারে।

এই ঘটনাকে বলা হয় ‘ফ্লেভার স্কাল্পিং’।

কমলার রস এর একটি ভালো উদাহরণ।

কমলার পরিচিত সুগন্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো লিমোনিন। এটি নন-পোলার প্রকৃতির অণু এবং নির্দিষ্ট ধরনের প্লাস্টিকের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে।

কমলার রস দীর্ঘ সময় প্লাস্টিকের পাত্র বা প্যাকেজিংয়ে থাকলে লিমোনিনের কিছু অংশ প্লাস্টিকের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে।

তখন রসে আগের তুলনায় সুগন্ধি অণুর পরিমাণ কমে যায়। ফলে স্বাদ বা ঘ্রাণ কিছুটা কম তীব্র মনে হতে পারে।

এ কারণে খাদ্যশিল্পে কোন খাবারের জন্য কী ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণের সময় শুধু পাত্রের শক্তি বা খরচ নয়, খাবারের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নিতে হয়।

গন্ধ ও দাগ কীভাবে কমানো যায়

একবার খাবারের গন্ধ বা রঙের অণু প্লাস্টিকের ভেতরে ঢুকে গেলে শুধু সাবান দিয়ে ধুয়ে পুরোপুরি দূর করা কঠিন হতে পারে।

তবে কিছু ক্ষেত্রে সময় সাহায্য করতে পারে। পাত্র খোলা অবস্থায় রেখে দিলে প্লাস্টিকের ভেতরে প্রবেশ করা কিছু অণু ধীরে ধীরে আবার বাইরে চলে আসতে পারে। এতে গন্ধ কমতে পারে।

টমেটো বা অন্য রঙিন খাবারের দাগের ক্ষেত্রে সূর্যের আলোও কাজে লাগতে পারে।

সূর্যের আলো রঙের জন্য দায়ী কিছু অণুর রাসায়নিক গঠন ধীরে ধীরে ভেঙে দিতে পারে। ফলে দাগটি ফিকে হয়ে আসে।

তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সূর্যের আলো সব সময় রঙের অণুকে প্লাস্টিকের ভেতর থেকে বের করে দেয় না। বরং আলো অণুগুলোকে রাসায়নিকভাবে পরিবর্তন করে, যার ফলে রঙ কম দৃশ্যমান হয়।

তীব্র গন্ধ বা গাঢ় রঙের খাবার দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাই কাচের পাত্র ব্যবহার করাই তুলনামূলক সহজ সমাধান।

বিশেষ করে টমেটোর সস, হলুদযুক্ত তরকারি কিংবা তেলসমৃদ্ধ খাবারের ক্ষেত্রে কাচের পাত্র ব্যবহার করলে গন্ধ ও দাগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

শেষ পর্যন্ত পার্থক্যটা কোথায়

প্লাস্টিক ও কাচের মধ্যে মূল পার্থক্য তাদের অণুগঠনে।

প্লাস্টিকের পলিমার শৃঙ্খলের অপেক্ষাকৃত আলগা অংশ দিয়ে খাবারের কিছু তৈলাক্ত গন্ধ ও রঙের অণু ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। তখন সাবান-পানি দিয়ে পাত্রের পৃষ্ঠ পরিষ্কার হলেও ভেতরে থাকা অণুগুলো সহজে বের হয় না।

অন্যদিকে কাচের শক্ত সিলিকা কাঠামোর মধ্যে খাবারের অণুর প্রবেশের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে গন্ধ বা রঙ সাধারণত কাচের পৃষ্ঠেই থাকে এবং ধোয়ার সময় সহজে চলে যায়।

তাই একই খাবার রাখার পর প্লাস্টিকের পাত্রে গন্ধ ও দাগ থেকে যেতে পারে, কিন্তু কাচের পাত্র বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আবার আগের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে