Logo
Logo
×

হুক ।  সৃষ্টি

যেভাবে এলো দুই চাকার সাইকেল

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬। ০৫:০৩ পিএম

আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬। ১৩:৩৬ পিএম

যেভাবে এলো দুই চাকার সাইকেল

যদি বলা হয়, বাইসাইকেলের জন্ম আর নেপোলিয়ন বোনাপোর্টের ওয়াটারলু যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্যে রয়েছে এক অদৃশ্য যোগসূত্র—তাহলে হয়তো অনেকেই অবাক হবেন। প্রথম শুনে মনে হতে পারে, এ যেন কল্পকাহিনি। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, দুটি ঘটনার মধ্যেই রয়েছে বিস্ময়কর সম্পর্ক।

অগ্ন্যুৎপাত থেকে ওয়াটারলুর যুদ্ধ

১৮১৫ সাল। ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ ওয়াটারলুর যুদ্ধ। একদিকে নেপোলিয়ন বোনাপোর্ট, অন্যদিকে ব্রিটিশ সেনাপতি ডিউক অব ওয়েলিংটন। কিন্তু যুদ্ধের ফল নির্ধারণে যে ঘটনাটি পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছিল, তা ঘটেছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় সাত হাজার মাইল দূরে, বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সুমবাওয়া দ্বীপে।

১৮১৫ সালের এপ্রিলে তামবোরা আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বিপুল পরিমাণ ছাই ও সালফারযুক্ত কণা বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এসব কণা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ওই অগ্ন্যুৎপাতের পর ইউরোপে অস্বাভাবিক আবহাওয়া তৈরি হয়। ওয়াটারলুর যুদ্ধের আগের রাতে প্রবল বৃষ্টি হয়। যুদ্ধক্ষেত্র কাদাময় হয়ে পড়ে। নেপোলিয়ন ভেবেছিলেন, মাটি শুকানোর জন্য কিছুটা অপেক্ষা করলে তাঁর কামান আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে। তাই তিনি আক্রমণ শুরু করতে দেরি করেন।

এই বিলম্ব ওয়েলিংটনের বাহিনীকে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার সময় দেয়। পরে প্রুশিয়ান সেনাবাহিনীও যুদ্ধে যোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়ন পরাজিত হন। শুধু একটি যুদ্ধ নয়, কার্যত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নও সেদিনের পর শেষ হয়ে যায়।

তবে নেপোলিয়নের গল্প এখানে মূল বিষয় নয়। এই গল্পের আসল সূত্র লুকিয়ে আছে তামবোরা অগ্ন্যুৎপাতের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে।

‘গ্রীষ্মহীন বছর’ এবং এক নতুন সংকট

তামবোরা অগ্ন্যুৎপাতের পর ১৮১৬ সাল ইতিহাসে পরিচিত হয় 'ইয়ার উইদাউট আ সামার', অর্থাৎ ‘গ্রীষ্মহীন বছর’ নামে।

বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া আগ্নেয় ছাই সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধা দেয়। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা কমে যায়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ফসল নষ্ট হয়, খাদ্য উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যায় এবং দেখা দেয় তীব্র দুর্ভিক্ষ।

সে সময় ইউরোপে যাতায়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন ছিল ঘোড়া। কিন্তু খাদ্যের সংকটে মানুষের পাশাপাশি ঘোড়ার খাবারেরও অভাব দেখা দেয়। অনেকেই আর ঘোড়া পালন করতে পারছিলেন না। ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে এমন একটি বাহনের, যেটি চলবে ঘোড়া ছাড়া। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন এক উদ্ভাবনের ইতিহাস।

কার্ল ভন ড্রেইস এবং প্রথম দুই চাকার যান

১৮১৭ সালে জার্মান উদ্ভাবক ব্যারন কার্ল ভন ড্রেইস ইতিহাসের প্রথম কার্যকর দুই চাকার যান তৈরি করেন। তিনি এর নাম দেন 'লাউফমেশিন', যার বাংলা অর্থ ‘ছুটন্ত যন্ত্র’। পরে সংবাদমাধ্যম তাঁর নাম অনুসারে এর নাম দেয় ড্রেইসিন।

এটি দেখতে অনেকটা সাইকেলের মতো হলেও এতে কোনো পেডাল ছিল না। চালককে মাটিতে পা ঠেলে ঠেলে এটিকে সামনে এগিয়ে নিতে হতো।

ড্রেইস এখানেই থেমে থাকেননি। পরের বছর তিনি আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করেন, যা ভেলোসিপেড নামে পরিচিত হয়। এতে স্টিয়ারিং ছিল এবং মানুষ আরও স্বাচ্ছন্দ্যে এটি চালাতে পারত। ১৮১৮ সালে তিনি এই নকশার পেটেন্টও গ্রহণ করেন। তখন অনেকে এটিকে আদর করে ডাকত ‘হবি হর্স’, অর্থাৎ ‘শখের ঘোড়া’ নামে।

ড্রেইসের জীবনীকার হ্যান্স-আর্হার্ড লেসিং লিখেছেন, ড্রেইসের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি বাহন তৈরি করা, যা ঘোড়ার বিকল্প হতে পারে কিন্তু যার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন হবে না। দুর্ভিক্ষের সময় এই ধারণা মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

১৩ কিলোমিটারের ঐতিহাসিক যাত্রা

ড্রেইসের তৈরি কাঠের ফ্রেমের এই বাহনের ওজন ছিল প্রায় ২২ কেজি। ১৮১৭ সালের ১২ জুন তিনি নিজেই এটি চালিয়ে এক ঘণ্টারও কম সময়ে প্রায় ১৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন। সে সময়ের জন্য এটি ছিল একটি অসাধারণ সাফল্য।

তবে এই বাহন খুব বেশি দিন জনপ্রিয় থাকতে পারেনি। কারণ, এতে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। অনেক শহরে এত দুর্ঘটনা ঘটতে শুরু করে যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এসব যান চলাচল নিষিদ্ধও করে দেয়।

তবুও ড্রেইসের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল, তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন—দুই চাকার ভারসাম্যপূর্ণ যান তৈরি করা সম্ভব। সেখান থেকেই শুরু হয় আধুনিক সাইকেলের দীর্ঘ যাত্রা।

‘বাইক’ শব্দের জন্ম

আজ 'বাইক' শব্দটি বললে অধিকাংশ মানুষের চোখে মোটরসাইকেলের ছবিই ভেসে ওঠে। কিন্তু 'বাইক' শব্দটির উৎপত্তি আসলে 'বাইসাইকেল' থেকে। যার আক্ষরিক অর্থ—দুই চাকার যান।

ড্রেইসের উদ্ভাবনের প্রায় চার দশক পর ইউরোপে আবারও নতুন উদ্যমে শুরু হয় দুই চাকার যান নিয়ে গবেষণা। এই সময় বিভিন্ন ধরনের তিন চাকার ও চার চাকার যানও তৈরি হয়। এদিকে কয়েকজন ফরাসি উদ্ভাবক আরও উন্নত সাইকেল তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

প্রথম 'বাইসাইকেল'

১৮৬৩ সালে পিয়েরে লালমেন্ট, পিয়েরে মিশোঁ এবং আর্নেস্ট মিশোঁ মিলে নতুন ধরনের একটি দুই চাকার যান তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় বাইসাইকেল। এই বাহনে কাঠের পরিবর্তে ধাতব ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছিল। এর পেডাল যুক্ত ছিল সামনের চাকার সঙ্গে।

প্রথম দিকের দ্বি-চাকার গাড়ি, কাঠের তৈরি (প্রায় ১৮২০ এর কাছাকাছি সময়ে)

তবে ধাতব চাকা ও শক্ত ফ্রেমের কারণে অসমান রাস্তায় এটি চালানো ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। চালানোর সময় পুরো শরীর কেঁপে উঠত। এ কারণেই ইউরোপে এর ডাকনাম হয়ে যায় 'বোন-শেকার', অর্থাৎ ‘হাড় কাঁপানো যান’।

আধুনিক সাইকেলের পথে

এরপর আসে বিশাল সামনের চাকা আর ছোট পেছনের চাকা নিয়ে তৈরি বিখ্যাত পেনি-ফার্দিং সাইকেল। পরে হাই-হুইলার সাইকেলে চড়ে ইংরেজ অভিযাত্রী টমাস স্টিভেন্স বিশ্বভ্রমণও করেন। তবে আধুনিক সাইকেলের প্রকৃত সূচনা হয় ১৮৮৫ সালে।

সে বছর ব্রিটিশ উদ্ভাবক জন কেম্প স্টার্লি তৈরি করেন সেফটি বাইসাইকেল। এটিকেই আধুনিক সাইকেলের পূর্বসূরি হিসেবে ধরা হয়। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, এতে প্রথমবারের মতো পেছনের চাকার সঙ্গে চেইন ড্রাইভ সিস্টেমে পেডাল যুক্ত করা হয়। ফলে চালানো সহজ হয় এবং গতি বাড়ে।

দুটি চাকাই ছিল সমান আকারের। তাই সিটও খুব উঁচুতে বসাতে হয়নি। এটি ছিল অনেক বেশি নিরাপদ, আরামদায়ক এবং নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। ধীরে ধীরে এই নকশাই বিশ্বের আধুনিক সাইকেলের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ছড়িয়ে পড়ে এই নতুন বাহন।

যুদ্ধক্ষেত্রেও ছিল সাইকেল

সাইকেলের ইতিহাসে আরেকটি চমকপ্রদ অধ্যায় রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সে সময় বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী বিপুল সংখ্যক সাইকেল ব্যবহার করত। এমনকি প্যারাট্রুপারদের জন্যও বিশেষ ধরনের ভাঁজ করা সাইকেল তৈরি করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান থেকে অনেক সময় এসব সাইকেল প্যারাসুটের মাধ্যমে নিচে ফেলে দেওয়া হতো। এ কারণেই এগুলোর একটি জনপ্রিয় নাম ছিল ‘বোম্বার বাইক’।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধে জাপান প্রায় ৫০ হাজার সাইকেল আরোহী সেনা ব্যবহার করেছিল।

সাইকেল যুদ্ধের বাহন নয়, বরং শান্তি বা পরিবেশ রক্ষার বাহন হিসেবে খ্যাত

আজকের সাইকেল

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাইকেলের ভূমিকা বদলে গেছে। একসময় এটি ছিল যুদ্ধের বাহন। পরে হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আর আজ সাইকেলকে পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাইকেলের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কারণ এটি চালাতে কোনো জ্বালানির প্রয়োজন হয় না এবং গ্রিনহাউস গ্যাসও নির্গত করে না।

তাই বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী, নগর পরিকল্পনাবিদ ও জলবায়ুকর্মী মনে করেন, পরিবেশ রক্ষায় ভবিষ্যতের অন্যতম কার্যকর পরিবহন হতে পারে এই সাধারণ দুই চাকার বাহন।

অদ্ভুত হলেও সত্য, যে তামবোরা অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাবে তৈরি হওয়া আবহাওয়া নেপোলিয়নের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছিল, সেই একই অগ্ন্যুৎপাতের কারণে সৃষ্টি হওয়া খাদ্যসংকটই মানুষকে ঘোড়ার বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করে। আর সেই প্রয়োজন থেকেই কার্ল ভন ড্রেইসের হাত ধরে শুরু হয় দুই চাকার সাইকেলের ইতিহাস যে উদ্ভাবন আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

সূত্র: ব্রাউন ইউনিভার্সিটি, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ও উইকিপিডিয়া।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে