Logo
Logo
×

লাইফস্কেপ ।  ভ্রমণ

আমাজন রক্ষায় পেরুর আদিবাসী নারীরা, বনই তাদের চিকিৎসক-শিক্ষক-আশ্রয়

বাংলাবাজার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ০৪:২৯ পিএম

আমাজন রক্ষায় পেরুর আদিবাসী নারীরা, বনই তাদের চিকিৎসক-শিক্ষক-আশ্রয়

পেরুর আমাজন অঞ্চলে আদিবাসী নারীরা তাঁদের সম্প্রদায়ের দরজা এখন দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দিচ্ছেন। শত শত বছর ধরে বৃষ্টিবনের সঙ্গে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা চিকিৎসা, কৃষি, আধ্যাত্মিকতা ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য তাঁরা ভাগ করে নিচ্ছেন বাইরের মানুষের সঙ্গে।

ঔষধি গাছ চাষ থেকে পবিত্র বৃক্ষকে ঘিরে বিশ্বাস, পূর্বপুরুষদের কৌশলে মৃৎশিল্প তৈরি থেকে বনকে জীবনধারণের শিক্ষক হিসেবে দেখা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁদের জীবনযাত্রায় আমাজন শুধু একটি বন নয়; এটি চিকিৎসক, শিক্ষক এবং আশ্রয়স্থল।

নুওয়াসে স্বাগত

পেরুর আমাজনের দীর্ঘ ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে নুওয়াসে পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে উজ্জ্বল লাল পোশাক পরা এক নারী। তাঁর নাম মার্গারিটা কুম্বিয়া সাওয়াও। তিনি স্থানীয় আওয়াজুন সম্প্রদায়ের একজন বয়োজ্যেষ্ঠা।

আওয়াজুন নারীরা এখন এই অঞ্চলের বৃষ্টি-অরণ্য রক্ষার অন্যতম মুখ। সান মার্টিন অঞ্চলের কয়েকটি আদিবাসী নারী গোষ্ঠীর মতো তাঁরাও পূর্বপুরুষদের জ্ঞান সংরক্ষণ করছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব গোষ্ঠীর কয়েকটি পর্যটকদের স্বাগত জানাতে শুরু করেছে। দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন, চিকিৎসা পদ্ধতি, বন ব্যবস্থাপনা ও ঐতিহ্য।

নুওয়াস একসময় খনিজসম্পদনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণ এবং অবৈধ বসতির কারণে হুমকির মুখে পড়েছিল। এখন এখানকার নারীরা স্থানীয় গাছপালা চাষের মাধ্যমে বন ও নিজেদের সংস্কৃতি দুটোই টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

চারপাশে পামগাছ ও ঝোপঝাড়ের মধ্যে ছড়িয়ে আছে ঔষধি উদ্ভিদ। বাতাসে অরিগানো ও লেমনগ্রাসের গন্ধ। স্থানীয়ভাবে এসব গাছ পেটের সমস্যা ও সর্দি-কাশির চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।

নারীদের হাতেই গড়ে ওঠা বসতি

মার্গারিটা প্রায় ৪০ বছর আগে আরও উত্তরের একটি আওয়াজুন গ্রাম থেকে এখানে এসেছিলেন।

তাঁর স্মৃতিতে, তখন চারপাশ ছিল কেবল জঙ্গল। সম্প্রদায় চেয়েছিল আরও আওয়াজুন পরিবার এখানে বসতি স্থাপন করুক, যাতে জমির ওপর তাদের আইনি অধিকার শক্তিশালী হয়।

মার্গারিটাসহ কয়েকজন নারী দূরের একটি জমিতে ঔষধি গাছ লাগানোর অনুমতি চান। প্রথমে তাঁদের পরিকল্পনা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়েননি।

ক্রমে ওই বুনো জমিতেই চাষ শুরু করেন তাঁরা। এখন সেখানে ২৬টি পরিবার বাস করে, আর সম্প্রদায়ের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন নারীরা।

ঔষধি উদ্ভিদের মাধ্যমে টাইফয়েড থেকে শুরু করে বিভিন্ন চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত পূর্বপুরুষদের জ্ঞানও তাঁরা ধরে রেখেছেন।

বছরে একদিন ফোটা ভ্যানিলা

মার্গারিটা একটি লম্বা সরু গাছ দেখান। এটি ভ্যানিলা অর্কিড। বছরে মাত্র একদিন ফুল ফোটে এবং হাতে পরাগায়ন করতে হয়।

আওয়াজুন সমাজে এই গাছ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সর্দি-কাশি কমানোর চায়ের সঙ্গে ভ্যানিলা ব্যবহার করা হয়।

তবে এর সামাজিক ভূমিকাও আছে। আওয়াজুন নারীরা উৎসবে এর সুগন্ধ ব্যবহার করেন। মার্গারিটার ভাষ্য অনুযায়ী, এই গন্ধ সম্পর্ক ও আকর্ষণের সঙ্গে জড়িত এক ধরনের সাংস্কৃতিক সংকেত হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

পবিত্র পথ

জঙ্গলের আরও গভীরে গেলে দেখা মেলে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা কয়েকজন আওয়াজুন নারীর।

তাঁদের একজন নিভিয়া কুম্বিয়া। তিনি দর্শনার্থীদের গলায় পরিয়ে দেন হুয়াইরুরো গাছের কালো ও লাল বীজ দিয়ে তৈরি মালা। আওয়াজুন সংস্কৃতিতে এই বীজ আধ্যাত্মিক সুরক্ষা ও সৌভাগ্যের প্রতীক।

এরপর স্থানীয় অ্যানাটো গাছের রঙ দিয়ে গালে ফোঁটা আঁকা হয়। আওয়াজুনদের বিভিন্ন সমাবেশে এই রীতি প্রচলিত, যেখানে ফোঁটার সংখ্যা কখনো কখনো ব্যক্তির বৈবাহিক অবস্থাও নির্দেশ করে।

সেখান থেকে শুরু হয় একটি পবিত্র পথ।

পথের শেষে রয়েছে বিশাল এক গাছ—আওয়াজুনদের কাছে যার নাম ‘সাইক’। তাঁরা একে ‘জীবনবৃক্ষ’ বলে মনে করেন।

গাছটির মাথা বনের মাটি থেকে প্রায় ৫০ মিটার ওপরে উঠে গেছে। বনে প্রবেশের আগে আওয়াজুনরা এই গাছকে জড়িয়ে ধরেন।

তাঁদের বিশ্বাস, সাইক গাছ নেতিবাচক শক্তি দূর করে। নিভিয়া দর্শনার্থীদের গাছের কাণ্ড জড়িয়ে গভীর শ্বাস নিতে এবং মনের ‘খারাপ কিছু’ ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন।

বনের আত্মাদের গাছ

পবিত্র পথ ধরে সামনে গেলে দেখা যায় গুয়াম্পু গাছ।

এর বিশাল ঠেস-শিকড়ে আঘাত করলে গভীর, ফাঁপা শব্দ হয়। আওয়াজুনদের বিশ্বাস, এই গাছে বনের আত্মারা বাস করে।

গাছ থেকে এমন শব্দ এলে তাঁরা মনে করেন, আত্মারা সন্তুষ্ট।

এই বিশ্বাসের সঙ্গে জঙ্গলের ব্যবহারিক জীবনও পাশাপাশি চলে। বন তাঁদের কাছে খাদ্য, ওষুধ, আধ্যাত্মিকতা ও নিরাপত্তার একই উৎস।

জঙ্গলেই পাওয়া যায় প্রয়োজনের সবকিছু

একটি খড়ের ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘরে দর্শনার্থীদের সামনে সাজানো হয় আমাজনের নানা ফল।

এর মধ্যে রয়েছে কোকো, আগুয়াহে এবং কোকোনা।

নুওয়াসে একাধিক প্রজাতির কোকো পাওয়া যায়। স্থানীয় আওয়াজুন নারীরাই কাছের একটি চকোলেট কারখানার মালিক ও পরিচালনাকারী।

আগুয়াহে ভিটামিনসমৃদ্ধ ফল। আর টমেটোর মতো দেখতে কোকোনা স্থানীয়ভাবে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

নিভিয়ার ভাষায়, মানুষের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই জঙ্গলের মধ্যে পাওয়া সম্ভব।

বিদায়ের আগে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী নাচ।

ফাঁপা গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি ‘তান্তুই’ ড্রামের ধীর ছন্দে একজন নারী স্বামীকে ঘিরে আকুলতার পুরোনো প্রেমের গান গেয়ে ওঠেন। অন্যরা বৃত্তাকারে নাচেন।

তাঁদের পোশাকের ঝনঝন শব্দ জলপ্রপাতের শব্দ অনুকরণ করে তৈরি—এমনটাই জানান স্থানীয় নারীরা।

কারুশিল্প রক্ষকদের কাছে

পরদিন যাত্রা হয় চাজুতা শহরের দিকে।

এটি পেরুর আমাজনের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। স্থানীয় আদিবাসী পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাটি দিয়ে পাত্র তৈরির কৌশল সংরক্ষণ করেছে।

শহরের সরু রাস্তায় ছুটে চলে তিন চাকার মোটোট্যাক্সি, নদীতে চলাচল করে কাঠের নৌকা। বাজারে বিক্রি হয় আমাজনের মাছ। রঙিন বাড়ি আর ধুলোমাখা উঠানে শিশুদের খেলায় শহরটির আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য।

সেখানেই দেখা হয় কনসুয়েলো রিওসের সঙ্গে।

তিনি ‘ইয়ানা রুমি’ নামের নারী কারুশিল্পী সংগঠনের সদস্য। চাজুতার ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণে কাজ করছে এই দল।

কনসুয়েলোর স্টুডিওজুড়ে বড় বড় মাটির ফুলদানি। তাঁর পরিবারের নারীরাও এই সংগঠনের সদস্য।

তাঁদের পোশাকে হাতে সেলাই করা জ্যামিতিক ফুলের নকশা রয়েছে। একই নকশা দেখা যায় তাঁদের তৈরি মৃৎপাত্রেও। পরিবারের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এসব নকশা পৌঁছে এসেছে।

পুরুষেরা চলে গেছেন, নারীরা ধরে রেখেছেন কাজ

ইয়ানা রুমি গঠিত হয় ২০১৯ সালে।

মূল লক্ষ্য ছিল চাজুতার বিভিন্ন কারুশিল্পীকে একত্র করে পূর্বপুরুষদের শিল্পকৌশল সংরক্ষণ করা।

শুরুর দিকে কয়েকজন পুরুষ সদস্যও ছিলেন। পরে তাঁরা সংগঠন ছেড়ে দেন। কনসুয়েলোর ভাষ্য, কাজটি তাঁদের কাছে খুব কঠিন মনে হয়েছিল।

এরপর নারীরাই এই উদ্যোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠেন।

তাঁরা তালপাতার আঁশ দিয়ে ঝুড়ি বোনেন, কাঁচা তুলা থেকে হাতে সুতা কাটেন এবং ঐতিহ্যবাহী তাঁতে নানা রঙের সুতো দিয়ে জটিল নকশা তৈরি করেন।

মাটির পাত্র তৈরিতেও পূর্বপুরুষের কৌশল

মৃৎশিল্প তৈরিতে প্রথমে পুরোনো পোড়ামাটির পাত্রের টুকরো গুঁড়ো করা হয়। স্থানীয়ভাবে এই গুঁড়োকে বলা হয় ‘শানিও’।

এরপর সেটি নতুন কাদামাটির সঙ্গে মিশিয়ে মাটিকে আরও দানাদার ও সহজে ব্যবহারযোগ্য করা হয়।

এই কাজেও ব্যবহৃত হয় পুরোনো সরঞ্জাম। কনসুয়েলো তাঁর দাদির কাছ থেকে পাওয়া বড় একটি শানপাথর দিয়ে পোড়ামাটির টুকরো গুঁড়ো করেন।

এরপর আসে মাটি মেশানোর পালা।

ঐতিহ্য অনুযায়ী, পা দিয়ে মাটি মেশানো হয়। স্থানীয় নদীর পাড় থেকে আনা মাটি ও গুঁড়ো পোড়ামাটি বড় পাত্রে রেখে পা দিয়ে চেপে ও নেচে মেশানো হয়।

পেছনে বাজে ‘পান্ডিলা’—আমাজনের একটি প্রাণবন্ত সংগীতধারা।

১৩ ঘণ্টা ধরে পাত্র পোড়ানো

মাটি প্রস্তুত হওয়ার পর হাতে পাত্রের আকার দেওয়া হয়।

প্রথমে মাটি চেপে এর ভেতরের বাতাস বের করা হয়। এরপর লম্বা সরু পাক তৈরি করে একটির ওপর আরেকটি বসিয়ে পাত্র তৈরি করা হয়।

পাত্র পোড়ানোর ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়াটির নাম ‘শুন্টু’।

এতে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। নারীরা কখনো ভোর দুইটা বা তিনটা থেকে কাজ শুরু করেন। বনের কাঠ ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে চুল্লির আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়।

পাত্র শক্ত হয়ে গেলে বৃষ্টিবনের উপকরণ থেকে তৈরি প্রাকৃতিক রং দিয়ে সাজানো হয়।

সাদা ও হলুদ মাটি থেকে হালকা রং তৈরি হয়। কালো রঙের জন্য ব্যবহৃত হয় ‘ইয়ানা রুমি’ নামের স্থানীয় একটি পাথর। এই পাথরের নাম থেকেই সংগঠনটির নাম এসেছে।

তৈরি পাত্রে আবারও ফিরে আসে পারিবারিক ফুলের নকশা।

কিছু পাত্রে মানুষের চুল দিয়ে তৈরি সূক্ষ্ম তুলি ব্যবহার করে আঁকা হয়। পাত্রের কিনারায় তিনটি রেখা ইয়ানা রুমির তিন প্রজন্মের নারী কারুশিল্পীকে প্রতিনিধিত্ব করে।

দিন শেষে সূর্যের সোনালি আলো যখন মাটির পাত্র, কাজ করে যাওয়া নারীদের মুখ এবং স্টুডিওর দেয়ালে পড়ে, তখন স্পষ্ট হয়—এই কারুশিল্প শুধু জীবিকা নয়।

এটি পূর্বপুরুষের স্মৃতি, বন থেকে পাওয়া সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংস্কৃতি সংরক্ষণের একটি মাধ্যম।

বন আর সংস্কৃতি—দুটোই রক্ষা করছেন নারীরা

নুওয়াসের ঔষধি বাগান থেকে চাজুতার মৃৎশিল্প—পেরুর আমাজনে এসব নারীর কাজ একই সূত্রে বাঁধা।

তাঁরা শুধু পুরোনো ঐতিহ্য সংরক্ষণ করছেন না; বনকে কেন্দ্র করে নতুন জীবিকা ও পর্যটনের সুযোগও তৈরি করছেন।

দর্শনার্থীদের কাছে নিজেদের জীবনধারা উন্মুক্ত করার মাধ্যমে তাঁরা দেখাচ্ছেন, আমাজনকে রক্ষা করা মানে কেবল গাছ বাঁচানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষা, বিশ্বাস, চিকিৎসাজ্ঞান, খাবার, শিল্প, পারিবারিক স্মৃতি এবং বহু প্রজন্মের জীবনযাপনের ইতিহাস।

যেকোনো বিষয়ে লিখতে বা বলতে চাইলে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠিয়ে দিন বাংলাবাজার ডাকবাক্সে