প্রিন্ট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
বাংলাবাজার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬। ০১:০৯ পিএম
আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬। ১২:৩২ পিএম
ইন্টারগভর্নমেন্টাল ফোরাম অন মাইনিং, মিনারেলস, মেটালস অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের (আইজিএফ) এবারের বার্ষিক বৈঠকের মূল প্রতিপাদ্য ‘পারস্পরিক নির্ভরতা’। ১২ থেকে ১৪ অক্টোবর জেনেভায় আয়োজিত এই বৈঠকে সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়। কারণ জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এখনো তীব্র।
এখানে ‘জ্বালানি রূপান্তরের খনিজ’ বলতে এমন খনিজ বোঝানো হচ্ছে, যেগুলো কয়লা, তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি থেকে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারিনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে প্রয়োজন। যেমন; নিকেল, লিথিয়াম, কোবাল্ট ও তামা।
এই খনিজ নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা খুব তীব্র। এতে পরিবেশ রক্ষার নিয়ম দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শ্রমিকদের অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খনিজ থেকে যে লাভ হবে, সেটিও সবার মধ্যে ন্যায্যভাবে ভাগ নাও হতে পারে। কিন্তু খনির দূষণ ও সামাজিক ক্ষতির বড় অংশ বহন করতে হয় উৎপাদনকারী দেশ ও স্থানীয় মানুষকে। তাই এই প্রতিযোগিতা তাদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব বলছে, বিশ্বকে ‘নেট-জিরো’ বা নিট-শূন্য কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা ২০৩০ সালের মধ্যে তিন গুণ ও ২০৪০ সালের মধ্যে চার গুণ হতে পারে।
‘নেট-জিরো’ বলতে এমন অবস্থা বোঝায়, যেখানে বায়ুমণ্ডলে যত গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়া হবে, বিভিন্ন উপায়ে প্রায় সমপরিমাণ গ্যাস আবার সরিয়ে নেওয়া হবে।
খনিজসমৃদ্ধ অনেক দেশ অতীতের ‘রিসোর্স কার্স’ বা ‘সম্পদ-অভিশাপ’ সম্পর্কে সচেতন। সম্পদ-অভিশাপ বলতে বোঝায় এমন পরিস্থিতি, যেখানে কোনো দেশ তেল, গ্যাস বা খনিজে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সেই সম্পদ থেকে সাধারণ মানুষ পর্যাপ্ত সুবিধা পায় না। বরং দুর্নীতি, বৈষম্য, সংঘাত বা দুর্বল অর্থনীতি তৈরি হতে পারে।
আর এই ঝুঁকি এড়াতে অনেক দেশ নিজেদের খনিজ মজুতের ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইছে। একই সঙ্গে তারা চায় কাঁচামাল সরাসরি বিদেশে পাঠিয়ে না দিয়ে দেশের ভেতরেই সেটি প্রক্রিয়াজাত করতে, যাতে বাড়তি মূল্য ও কর্মসংস্থান দেশের মধ্যেই থাকে। এটিই ‘ডমেস্টিক ভ্যালু অ্যাডিশন’ বা দেশের ভেতরে মূল্য সংযোজন। এই লক্ষ্যেই অনেক খনিজসমৃদ্ধ দেশ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথে হাঁটছে।
কিন্তু এ ধরনের নীতি প্রথম দিকেই গ্রহণ করা দেশগুলোর একটি হলো ইন্দোনেশিয়া। দেশটির অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু ‘ডাউনস্ট্রিম শিল্পায়ন’ সব সমস্যার সমাধান নয়।
ডাউনস্ট্রিম শিল্পায়ন বলতে বোঝায়, শুধু কাঁচা খনিজ উত্তোলন করে রপ্তানি না করে দেশে সেগুলো গলানো, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্যাটারি বা অন্য শিল্পপণ্যে রূপান্তরের সক্ষমতা তৈরি করা। এই শিল্পায়নের সঙ্গে বড় ধরনের পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যয়ও যুক্ত হতে পারে।
বিশেষ করে যে স্থানীয় জনগোষ্ঠী খনি, গলন কারখানা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে, তারা প্রায়ই দূষণ, ভূমি হারানো, পানির সংকট বা জীবিকার ক্ষতির মতো সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করে। কিন্তু সেই একই জনগোষ্ঠী সবসময় অর্থনৈতিক লাভের ন্যায্য অংশ পায় না।
ইন্দোনেশিয়ার নিকেলসমৃদ্ধ তিন প্রদেশে খনিজ উত্তোলন, গলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে। তবে জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর সঙ্গে জড়িত আরেকটি ধারণা হলো ‘ফ্রন্টিয়ার-মেকিং’। এর অর্থ, আগে তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক বা কম উন্নত কোনো অঞ্চলকে হঠাৎ বড় খনি, শিল্পাঞ্চল বা সম্পদ আহরণের কেন্দ্রে পরিণত করা।
আর এমন পরিবর্তনের সঙ্গে শক্তিশালী আইন, পরিবেশগত সুরক্ষা ও গণতান্ত্রিক নজরদারি না থাকলে নতুন ‘স্যাক্রিফাইস জোন’ তৈরি হতে পারে। এখানে ‘স্যাক্রিফাইস জোন’ বলতে এমন এলাকা বোঝায়, যেখানে জাতীয় উন্নয়ন বা শিল্পায়নের নামে স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়।
টেকসই খননের দাবি বাড়ছে
বৈশ্বিক পর্যায়ে ‘সাসটেইনেবল মাইনিং’ বা টেকসই খননের ওপর গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। টেকসই খনন বলতে এমনভাবে খনিজ উত্তোলন বোঝায়, যাতে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশ, শ্রমিক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থও রক্ষা করা হয়।
২০২৪ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের ক্রিটিক্যাল এনার্জি ট্রানজিশন মিনারেলস বিষয়ক প্যানেল একটি নীতিমালা প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ আহরণে নতুন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যার ভিত্তি হবে ন্যায়বিচার ও সমতা। অর্থাৎ শুধু খনিজের চাহিদা মেটানো নয়, খনির লাভ স্বাগতিক দেশ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাতে হবে।
আঞ্চলিক বিভিন্ন কাঠামোতেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়নের আফ্রিকা মাইনিং ভিশন, এর পরবর্তী নির্দেশিকা ও নীতিকাঠামো এবং আসিয়ানের প্রিন্সিপলস ফর সাসটেইনেবল মিনারেলস ডেভেলপমেন্ট।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন দেশগুলো ‘বাইল্যাটারাল এগ্রিমেন্ট’ বা দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে প্রবেশ করে এবং সেখানে পরিবেশ বা সামাজিক সুরক্ষার চেয়ে বাজারে প্রবেশাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বলতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি করা চুক্তিকে বোঝায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইন্দোনেশিয়ার কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টে নিকেল ও পাম অয়েলের প্রতি ভিন্ন আচরণ এর একটি উদাহরণ। পাম অয়েলের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর টেকসই মানদণ্ড রয়েছে। কিন্তু নিকেলের ক্ষেত্রে তেমন কঠোরতা নেই। অথচ পাম অয়েল ও নিকেল; দুই খাতই বড় ধরনের সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে।

বৈশ্বিক পর্যায়ে ‘সাসটেইনেবল মাইনিং’ বা টেকসই খননের ওপর গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ছবি: বাংলাবাজার ক্রিয়েটিভ
নীতির কথা বাস্তবে কীভাবে মানবে
উচ্চপর্যায়ের নীতিগত ঘোষণাকে বাস্তবে কার্যকর করার সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর একটি হলো গ্লোবাল সাউথের নীতি ও অধিকারভিত্তিক নেটওয়ার্কগুলোকে আরও শক্তিশালী করা। ‘গ্লোবাল সাউথ’ বলতে সাধারণত এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য উন্নয়নশীল বা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে বোঝানো হয়।
এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নীতিনির্ধারক, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারে। একই সঙ্গে খনিজ খাতকে কীভাবে আরও ন্যায়সংগত ও পরিবেশবান্ধব করা যায়, সে বিষয়ে নিজেদের প্রস্তাবও বিনিময় করতে পারে।
গ্লোবাল সাউথের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সাফল্য ও ব্যর্থতা; দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই ভাগ করার বাস্তব আগ্রহ রয়েছে।
ন্যাচারাল রিসোর্স গভর্ন্যান্স ইনস্টিটিউটের সাউথ-সাউথ ট্রানজিশন মিনারেলস লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ইন্দোনেশিয়া, চিলি, জাম্বিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে নীতিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ে সহায়তা করেছে।
‘সাউথ-সাউথ সহযোগিতা’ বলতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি বা নীতিগত শিক্ষা বিনিময়কে বোঝায়। এসব দেশের সবার লক্ষ্য মোটামুটি একই; খনিজ সম্পদ ব্যবহার করে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা।
তবে এই প্ল্যাটফর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। সব দেশের জন্য একই নীতি কার্যকর হয় না। খনিজের ধরন, দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক ‘ভ্যালু চেইন’ বা মূল্যশৃঙ্খলে সেই দেশের অবস্থান; সবকিছু ভিন্ন হতে পারে।
মূল্যশৃঙ্খল বলতে কাঁচামাল উত্তোলন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, উৎপাদন, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত পণ্য বিক্রি হওয়া পর্যন্ত পুরো অর্থনৈতিক ধারাকে বোঝায়। তাই একটি দেশের জন্য যে নীতি কার্যকর, অন্য দেশের জন্য তা নাও হতে পারে। অর্থাৎ ‘ওয়ান-সাইজ-ফিটস-অল’ বা সবার জন্য একই সমাধানের বদলে দেশভেদে আলাদা কৌশল দরকার।
সীমান্তের বাইরে নাগরিক সমাজের জোট
সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন আন্তঃদেশীয় বা বহুস্তরীয় অধিকারভিত্তিক নেটওয়ার্ক, যা গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে যুক্ত করে। ‘ট্রান্সন্যাশনাল’ বলতে একাধিক দেশের সীমানা পেরিয়ে কাজ করা বোঝায়।
‘ট্রান্সস্কেলার’ বলতে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্তরের সংগঠনকে একই আন্দোলন বা নেটওয়ার্কে যুক্ত করাকে বোঝানো হয়। এই ধরনের নেটওয়ার্ক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাগাভাগির সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে এগুলো সম্মিলিত চাপ বাড়ায় এবং একটি দেশের সীমানার বাইরেও কোম্পানি বা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি করে।
খনিজ উত্তোলন, গলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতির বিস্তৃত প্রমাণ সংগ্রহ করে স্থানীয় অধিকারকর্মীরা এমন সরকার বা কোম্পানিকে পাশ কাটাতে পারেন, যারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোগ যথাযথভাবে গুরুত্ব দেয় না। এরপর তারা আন্তর্জাতিক সংগঠন, বিনিয়োগকারী বা বিদেশি অংশীদারদের কাছে গিয়ে বাইরের চাপ তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
আর এ ক্ষেত্রেও ইন্দোনেশিয়া গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটির পরিচিত বেসরকারি সংস্থা ওয়ালহি, ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ জাপানের সঙ্গে মিলে শতাধিক সংগঠনকে একত্রিত করে ভালে ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে সোরোওয়াকো নিকেল প্রকল্পে কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়।
সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে ভালে, সুমিতোমো মেটাল মাইনিং এবং মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানিসহ কয়েকটি শেয়ারহোল্ডার কোম্পানিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
একইভাবে মাইটি আর্থ, ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনাল এবং গ্লোবাল উইটনেসের প্রচারকরা ইন্দোনেশিয়ার নিকেল উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও গাড়ি নির্মাতাদের সামাজিক ও পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলা ও ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ করার আহ্বান জানান।
ডিউ ডিলিজেন্স বলতে কোনো কোম্পানি কাঁচামাল কেনার আগে যথাযথ যাচাই করে দেখা বোঝায়। সেই কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে কি না, পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে কি না কিংবা শ্রমিকদের অধিকার মানা হয়েছে কি না।
এরপর ওয়েদা বে নিকেল ইনিশিয়েটিভ ফর রেসপনসিবল মাইনিং অ্যাস্যুরেন্স বা আইআরএমএ এর মানদণ্ড মেনে চলার আগ্রহ প্রকাশ করে।
আইআরএমএ হলো দায়িত্বশীল খনন কার্যক্রম যাচাইয়ের একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। এতে পরিবেশ, শ্রম অধিকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সুশাসনের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়।
কিছু গাড়ি নির্মাতাও নিকেল সরবরাহকারীদের জন্য আরও কঠোর শর্ত আরোপ করেছে।
আন্তর্জাতিক চাপের প্রভাব
বৈশ্বিক চাপের আরেকটি উদাহরণ হলো পাবলিশ হোয়াট ইউ পে ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকা। সংগঠনটি ২০২৫ সালের ওইসিডি ফোরাম অন রেসপনসিবল মিনারেল সাপ্লাই চেইনসে ইন্দোনেশিয়ার নিকেল খাতের শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তোলে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ শেষ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া সরকারকেও ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছে।
নিজস্ব আইন ও নীতিকাঠামোর সঙ্গে তিনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পার্থক্য মূল্যায়নের পর সরকার এখন ইএসজি নির্দেশিকা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইএসজি অর্থ ‘এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স’ বাংলায় পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন।
সহজভাবে বললে, কোনো কোম্পানি শুধু মুনাফা করছে কি না, তা নয়; পরিবেশের ক্ষতি করছে কি না, শ্রমিক ও স্থানীয় মানুষের অধিকার মানছে কি না এবং স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, এসবও ইএসজির অংশ।
ইন্দোনেশিয়ার পরিকল্পিত নির্দেশিকার লক্ষ্য হলো কোম্পানিগুলোকে বুঝতে সাহায্য করা, দেশটির কোন আইন বা বিধি নিকেল সরবরাহশৃঙ্খলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে।
শুধু ঘোষণা নয়, দরকার বাস্তব ব্যবস্থা
জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজের সরবরাহশৃঙ্খলকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করাই আইজিএফ বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সরবরাহশৃঙ্খল’ বলতে এমন ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে শুধু খনি কোম্পানি, সরকার বা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শ্রমিক এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বার্থও বিবেচনায় রাখা হয়।
কিন্তু বড় বড় আন্তর্জাতিক ঘোষণা দিলেই সেই লক্ষ্য পূরণ হবে না। ঘোষণাকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার কার্যকর কৌশল দরকার। এর একটি পথ হলো গ্লোবাল সাউথের নীতিগত ও অধিকারভিত্তিক নেটওয়ার্কগুলোকে একত্র করে আরও শক্তিশালী করা।
বিদ্যমান সাউথ-সাউথ সহযোগিতা ব্যবস্থার পরিধি বাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে নীতিগত শিক্ষা বিনিময় করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আরও গভীর করতে পারে।
এর ফলে খনি ও খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত পরিবেশ ধ্বংস, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং স্থানীয় মানুষের ক্ষতির বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। সমাধানের প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান এরই মধ্যে রয়েছে।
মূল কাজ হলো; সেগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না রেখে এক জায়গায় এনে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো।

