দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা ৪০ মিনিটে চুক্তিটি সই হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিপত্রে সই করেন।
চুক্তিটির লেনদেনসংক্রান্ত পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)।
এনসিটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড পরিচালনা করছিল। গত বছরের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। পরদিন থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাই ডক কোম্পানি টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
এনসিটিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। পরে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কাঠামোর আওতায় একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে ২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উদ্যোগটি আবার গতি পায় এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সম্ভাব্য অপারেটর হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিরোধিতা এবং চলতি বছরের শুরুতে শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে প্রক্রিয়াটি আবার থমকে যায়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করে। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় এবার ১৫ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি সই হলো।
প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালগুলোর একটি। এখানে পাঁচটি জেটি রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মোট ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই এনসিটিতে ব্যবহৃত হয়। বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার ৪০ শতাংশের বেশি এই টার্মিনালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমে এনসিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি। চুক্তির প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে সংগঠনটি বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছে।
অন্যদিকে সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হলে টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বাড়বে। বিশেষ করে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম এবং বন্দরে কনটেইনার পড়ে থাকার সময় বা ডুয়েল টাইম কমানো সম্ভব হবে।
এতে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য দ্রুত খালাস করা গেলে ব্যবসায়ীদের লজিস্টিকস ব্যয়ও কমতে পারে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো রপ্তানিনির্ভর খাত এ সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছে সরকার।
তবে চুক্তি বাস্তবায়নের পর বন্দরের দক্ষতা, ব্যয় ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন বড় বিষয় হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পক্ষগুলোর আপত্তি ও শ্রমিকদের উদ্বেগ কীভাবে সামাল দেওয়া হয়, সেটিও থাকবে নজরে।